EN ☀️
×

Follow Us

অর্থনীতি

এই দায় কার?

ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১০:০৫ এএম

এই দায় কার?

ছবি: এআই

অ অ

অপরাধ করলে শাস্তি হবে। অনিয়ম হলে তদন্ত হবে। রাষ্ট্র চাইলে একটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবের খাতা খুলে উল্টেপাল্টে প্রতিটি পৃষ্ঠা দেখতে পারে। আইনের ব্যত্যয় ঘটলে ব্যবস্থা নেবে—এটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু একান্তই ব্যক্তিগত ক্ষোভ ঝাড়তে গিয়ে একেবারে পুরো প্রতিষ্ঠানকে গলা টিপে মারার চেষ্টা কতটা ন্যায়সংগত? একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ আর তাঁর প্রতিষ্ঠানে কর্মরত লাখো মানুষের ভবিষ্যৎ কি এক পাল্লায় মাপা যায়? একটি শিল্পগোষ্ঠীর মালিকদের ওপর রাগ থাকলে তার খেসারত কি একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে দিতে হবে? দেশের অর্থনীতিকেও দিতে হবে?

সাফওয়ান বসুন্ধরা গ্লোবালের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ‘বসুন্ধরা মাল্টি স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ’ ঘুরে আসার পর এই প্রশ্নগুলোই বারবার মাথায় ঘুরছে। চোখের সামনে বিশাল একটি শিল্প উদ্যোগ অবহেলায় পড়ে আছে।

মেশিন, শেড, লোকবল, কাঁচামাল—কী নেই? সব থাকার ভিড়ে দরকারি জিনিসটিই নেই। তা হলো উৎপাদন। যে এলাকাটি মেশিন আর মানুষে গমগম করার কথা, সেখানে যেন পিনপতন নীরবতা। যে যন্ত্রটি বিরামহীন চলার কথা, সেটি পড়ে আছে অলস।

রোদ-বৃষ্টিতে পড়ে থাকা যন্ত্রের গায়ে আগাছা আর লতাগুল্ম বেয়ে উঠেছে। এটি কি কেবলই একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক খতিয়ানের কথা বলে? না, এটি তো হারিয়ে যাওয়া সময় আর সম্ভাবনার কথাও বলে।

কিন্তু কেন এমন হলো?

এই প্রশ্নের উত্তর ‘অন্তর্বর্তীর রোষাণলে ৭০০০ কোটির শিল্প’ ও ‘অলস ফেলে রাখা যন্ত্রপাতির কান্না’ শিরোনামে প্রতিবেদন দুটিতে সবিস্তারে তুলে ধরা হয়েছে। সেসব তথ্য এখানে আর পুনরাবৃত্তি করতে চাই না। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগের পাশাপাশি নথিপত্র ঘাঁটাঘাঁটি কিংবা সরেজমিন ঘুরে স্পষ্টই  দেখতে পেয়েছি, এই মহাবিপর্যয় একটি সংঘবদ্ধ সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের ফসল।

আর এর মূলে ঘুরেফিরে দুটি নাম উঠে আসে। অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। 

একজন উদ্যোক্তা যখন হাজার হাজার কোটি টাকা ঢেলে একটি কারখানা করেন, রাষ্ট্র তাঁর কাছ থেকে কর নেবে। নিয়ম বানাবে, নিয়ম মানাবে। পরিবেশের শর্ত দেবে। প্রয়োজনে জবাবদিহির মুখোমুখি করবে। এ সবকিছুর সঙ্গে সন্দেহাতীতভাবে তাঁর বিনিয়োগের নিরাপত্তা দেবে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো দেবে। এটি কোনো অনুগ্রহ নয়, দায়িত্ব।

বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যই তো ছিল বিনিয়োগের পথ সহজ করা। উদ্যোক্তাকে এমন একটি পরিবেশ দেওয়া, যেখানে তাঁকে গ্যাসের জন্য এক দপ্তর, বিদ্যুতের জন্য আরেক দপ্তর, পানির জন্য অন্য দপ্তরে ঢুস মারতে হবে না। বছরের পর বছর টেবিলের পর টেবিল ঘুরে সময় নষ্ট করতে হবে না।

অথচ চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে প্রতিষ্ঠিত দেশের সর্ববৃহৎ জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ঠিক উল্টো চিত্রটাই দেখেছি। যেসব ইউটিলিটি নিশ্চিত করার কথা ছিল, তার জন্য অর্থ দিয়েও অপেক্ষা করতে হয়েছে বিএসএমআইএলকে। শেষ পর্যন্ত নিজেদের অর্থে নিজস্ব দায়িত্বে তা করতে হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, বসুন্ধরার অর্থে তৈরি সেসব ইউটিলিটি সুবিধা পরে অন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানও ভোগ করেছে।

অর্থাৎ যে কাজটি রাষ্ট্রেরই করার কথা, সেই দায়িত্বভার নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছেন একজন দেশীয় উদ্যোক্তা।

বিনিময়ে কী পেলেন?

এই প্রশ্নটি অবশ্য এখন অস্বস্তিকরই শোনাতে পারে। কিন্তু সত্য কখনো পাথরচাপা থাকে না। যে শিল্পগোষ্ঠী রাষ্ট্রের ঘাটতি পূরণে নিজের গাঁটের অর্থ ব্যয় করল, সেই শিল্পগোষ্ঠীরই একটি মেগাপ্রকল্প নীতির জালে আটকে দেওয়া হলো। এমনই নীতি, যেটি ব্যক্তিগত ঝাল মেটাতেই বানানো। ব্যাংকিং জটিলতা তৈরি করে অর্থায়ন আটকে দেওয়া হলো। দীর্ঘদিন ধরে বন্দরে যন্ত্রপাতি পড়ে রইল। ব্যয় বাড়তে থাকল প্রতি সেকেন্ডে।

বিস্ময়কর হলো, যে সিদ্ধান্তের কারণে বড় জটিলতা তৈরি হয়েছিল, ১৩ মাস পর সরকার বদলের সঙ্গে সেই অবস্থান থেকেই সরে আসে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাহলে এই ১৩ মাসের মূল্য কে দেবে?

এটি শুধু টাকার প্রশ্ন নয়। টাকার হিসাব করা সহজ। ড্যামারেজ কত, সুদ কত, প্রকল্প ব্যয় কত বেড়েছে, ক্যালকুলেটরে ডিজিট বসালেই উত্তর পাওয়া যায়। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া সময়ের হিসাব কোন ক্যালকুলেটরে হবে?

একটি কারখানা দুই বা তিন বছর উৎপাদনে যেতে না পারলে শুধু উদ্যোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হন না। সেখানে যে মানুষগুলোর চাকরি হওয়ার কথা ছিল, তাঁরা বেকারই থেকে যান। যে পণ্য দেশে উৎপাদনের কথা ছিল, সেটি হয় না। সরকারের যে রাজস্ব পাওয়ার কথা, সেটিও আসে না। আমদানির বিকল্প তৈরি হয় না। বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হয় না।

তাহলে এই ক্ষতি কি শুধু বিএসএমআইএলের? আমাদের দেশে বড় শিল্পগোষ্ঠী নিয়ে অনেক সমালোচনা আছে। থাকাটাও স্বাভাবিক। বড় প্রতিষ্ঠান মানেই বড় দায়। তাদের স্বচ্ছতা আরো বেশি হওয়া উচিত। জবাবদিহিও বেশি হওয়া উচিত। আইন ভাঙলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের আরো কঠোর হওয়া উচিত।

কিন্তু কঠোরতা আর প্রতিহিংসা এক জিনিস নয়। আইনের প্রয়োগ আর একটি শিল্পের টুঁটি চেপে ধরা ভিন্ন বিষয়। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্ত হবে। অপরাধ প্রমাণ হলে শাস্তি হবে। কিন্তু সেই অভিযোগকে সামনে রেখে যদি একটি উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রমই বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই, শাস্তিটা আসলে কাকে দেওয়া হলো?

মালিককে, নাকি শ্রমিককে? নাকি রাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনীতিকে?

বসুন্ধরা বড় শিল্পগোষ্ঠী। তাদের আর্থিক সক্ষমতা আছে। ফলে এত আঘাতের পরও তারা টিকে থাকার চেষ্টা করেছে। পরম মমতায় আগলে রেখেছে কর্মীদের। হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প পড়ে থাকার পরও হাল ছেড়ে দেয়নি।

কিন্তু একই ঘটনা যদি মাঝারি কোনো উদ্যোক্তার সঙ্গে ঘটত, তাহলে পরিস্থিতিটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াত?

একজন উদ্যোক্তা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে, নিজের সঞ্চয় ঢেলে কিংবা পারিবারিক সম্পদ বন্ধক রেখে একটি কারখানা গড়লেন। উৎপাদনে যাওয়ার ঠিক আগে তাঁর অর্থায়ন আটকে দেওয়া হলো। যন্ত্রপাতি বন্দরে পড়ে থাকল। একদিকে প্রতিদিন বাড়ল ব্যাংকের সুদ, অন্যদিকে ড্যামারেজ। তিনি কত দিন টিকতেন?

সম্ভবত কারখানার চাকা ঘোরার আগেই তাঁর জীবনের সব অর্জন শেষ হয়ে যেত।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আমরা বেসরকারি খাতকে এগিয়ে নিতে বড় কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখিনি। অথচ দেশের অর্থনীতির বড় অংশই দাঁড়িয়ে আছে এই বেসরকারি খাতের ওপর। কর্মসংস্থানের বড় ক্ষেত্রও তৈরি করে তারা। সরকারের রাজস্বের বড় উৎসও বেসরকারি শিল্প খাত।

একটি সরকার রাজনৈতিকভাবে কারো পক্ষে বা বিপক্ষে থাকতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র কি কোনো শিল্পের পক্ষে বা বিপক্ষে দাঁড়াতে পারে?

রাষ্ট্রের কাছে উদ্যোক্তার রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে তাঁর বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা। তাঁর কারখানায় কত মানুষ কাজ করছে, কত রাজস্ব আসছে, কত বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে; সেটিই বিবেচ্য হওয়ার কথা।

কারণ সরকার পাঁচ বছর থাকে। শিল্প থাকে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ।

আরো বড় উদ্বেগ বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে। আমরা প্রায়ই বলি, বিদেশি বিনিয়োগ দরকার। বিদেশিদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহবান জানাই। নানা সম্মেলন করি। সুযোগ-সুবিধার কথা বলি।

কিন্তু একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রথমে কী দেখবেন? আমার ধারণা, তিনি আগে দেখবেন এই রাষ্ট্র তার নিজের বিনিয়োগকারীর সঙ্গে কেমন আচরণ করে।

দেশের একজন উদ্যোক্তা হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করার পর যদি সরকারের নীতিগত অবস্থান বদলের কারণে অনিশ্চয়তায় পড়েন, বিদেশি উদ্যোক্তা সেটি অবশ্যই হিসাব করবেন। কারণ তাঁর কাছে বাংলাদেশের কোনো সরকার স্থায়ী নয়। তাঁর কাছে স্থায়ী হলো রাষ্ট্র এবং তার নীতি।

তাই বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় শর্ত করছাড় নয়। সস্তা জমিও নয়। বড় শর্তটি হলো আস্থা।

আর একবার সেই আস্থা ভেঙে গেলে ঢাকঢোল পিটিয়ে তা ফেরানো যায় না। এ কারণেই বসুন্ধরা মাল্টি স্টিলের ঘটনা নিয়ে একটি নিরপেক্ষ পর্যালোচনা দরকার। কার সিদ্ধান্তে কী হয়েছিল? সিদ্ধান্তগুলোর আইনি ও অর্থনৈতিক ভিত্তি কী ছিল? একটি সিদ্ধান্ত পরে বদলাতে হলে তার আগের সিদ্ধান্তে যে ক্ষতি হয়েছে, তার দায় কিভাবে নির্ধারিত হবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু বসুন্ধরার জন্য প্রয়োজন নয়। প্রয়োজন ভবিষ্যতের জন্য। কারণ আজ বসুন্ধরা, তো কাল অন্য কেউ। রাজনৈতিক হাওয়া বদলের সঙ্গে যদি শিল্পনীতির আচরণও পাল্টে যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করবে কে? হাজার কোটি টাকা নিয়ে একজন উদ্যোক্তা তখন কোন নিশ্চয়তায় কারখানা গড়বেন?

মিরসরাই থেকে ফেরার সময় একটি কথাই বারবার মনে হয়েছে। একটি শিল্প গড়তে বছরের পর বছর লাগে। হাজার হাজার মানুষের শ্রম-ঘাম লাগে। প্রকৌশল লাগে। অর্থ লাগে। সাহস লাগে। কিন্তু সেটি থামিয়ে দিতে লাগে একটিমাত্র সিদ্ধান্ত।

আর সে কারণেই বসুন্ধরা মাল্টি স্টিলের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা শুধু একটি কম্পানির জন্য করতে ইচ্ছা করে না, প্রশ্নটা দেশের শিল্পের জন্য, উদ্যোক্তার জন্য, ভবিষ্যতের বিনিয়োগকারীদের জন্য। এই দায় কার?

সূত্র: কালের কণ্ঠ

আরও পড়ুন