বাজেটে মূল্য সংযোজন শর্ত শিথিলে চাপে সংযোগ শিল্প
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৯:৪৬ এএম
ছবি: সংগৃহীত
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি করে রপ্তানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান স্থানীয় মূল্য সংযোজনের বাধ্যবাধকতা শিথিল করার উদ্যোগে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বস্ত্র, অ্যাকসেসরিজ ও প্যাকেজিং খাতের উদ্যোক্তারা। তাঁদের আশঙ্কা, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় কাঁচামালের ব্যবহার কমে যাবে, আমদানিনির্ভরতা বাড়বে এবং দীর্ঘদিনে গড়ে ওঠা দেশের সংযোগ শিল্প (ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ) বড় ধরনের চাপে পড়বে।
বর্তমানে ব্যাংক গ্যারান্টির আওতায় শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি করে রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত রয়েছে। তবে প্রস্তাবিত বাজেটে এই বাধ্যবাধকতা কার্যত তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন বিধান অনুযায়ী, আমদানীকৃত কাঁচামালের বিপরীতে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হবে, রপ্তানি থেকে অর্জিত আয় তার চেয়ে বেশি হলেই শর্ত পূরণ হয়েছে বলে বিবেচিত হবে।
উদ্যোক্তারা বলছেন, মূল্য সংযোজনের ন্যূনতম শর্ত না থাকলে অনেক রপ্তানিকারক স্থানীয় উৎস থেকে কাঁচামাল সংগ্রহের পরিবর্তে আমদানীকৃত উপকরণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন।
এতে সুতা, কাপড়, ডায়িং, অ্যাকসেসরিজ, প্যাকেজিংসহ বিভিন্ন সহায়ক শিল্পের চাহিদা কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে দেশীয় শিল্পে নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহ হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
সম্প্রতি ঘোষিত খসড়া আমদানি নীতিতে মূল্য সংযোজনের ন্যূনতম হার ৩০ শতাংশ নির্ধারণ করা হলেও বাজেটে তা আরো শিথিল করার উদ্যোগকে পরস্পরবিরোধী বলে মনে করছেন শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, দেশের শিল্পায়ন ও স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করার পরিবর্তে এ ধরনের নীতি আমদানিনির্ভরতা বাড়াতে পারে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) নেতারা বলেন, দেশের তৈরি পোশাক খাতের শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে তুলতে সরকার অতীতে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত নগদ প্রণোদনা দিয়েছে। দীর্ঘদিনের সেই নীতিগত সহায়তার ফলেই বর্তমানে একটি শক্তিশালী দেশীয় কাঁচামাল ও সংযোগ শিল্প গড়ে উঠেছে। কিন্তু এখন মূল্য সংযোজনের শর্ত শিথিলের মাধ্যমে সরকার উল্টো পথে হাঁটছে।
তাঁদের আশঙ্কা, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সুতা, কাপড় ও অন্যান্য উপকরণের পরিবর্তে আমদানীকৃত কাঁচামালের ব্যবহার বাড়বে। ফলে দেশের প্রকৃত রপ্তানি আয় কমার পাশাপাশি বাংলাদেশ ধীরে ধীরে তৃতীয় দেশের পণ্যের পুনঃ রপ্তানি কেন্দ্র বা ‘রপ্তানি হাব’-এ পরিণত হতে পারে।
এতে দেশের রপ্তানি সক্ষমতা ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে।
বিটিএমএ নেতাদের মতে, বর্তমানে প্রায় ১৯-২০ বিলিয়ন ডলারের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বা সংযোগ শিল্প সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়বে। হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং ব্যাংকঋণনির্ভর শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর টিকে থাকাও কঠিন হয়ে যেতে পারে।
এই প্রস্তাবের প্রতিবাদ এবং বিদ্যমান মূল্য সংযোজনের শর্ত বহাল রাখার দাবিতে আগামী ২০ জুন সংবাদ সম্মেলন করবে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)। সংগঠনটির সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে এলডিসি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে স্থানীয় মূল্য সংযোজনের গুরুত্ব আরো বাড়বে। বাংলাদেশ স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস সুবিধা পেতে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ মূল্য সংযোজন নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে কানাডার বাজারে ৬০ শতাংশ, যুক্তরাজ্যে ৫০ শতাংশ এবং ভারতের বাজারে ৪০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত রয়েছে।
এনজেড টেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সাবেক সহসভাপতি মো. সালেহুদ্দিন জামান খান বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে নীতিগত সহায়তা এবং মূল্য সংযোজনের শর্তের মাধ্যমে দেশে শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে উঠেছে। এসব শর্ত তুলে দিলে সেই অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।’ [সূত্র: কালের কণ্ঠ]