EN ☀️
×

Follow Us

ভ্রমণ

খুলনা বিভাগীয় জাদুঘর যেন সমৃদ্ধ এক তথ্যভাণ্ডার

বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম জাদুঘরে গুপ্ত, পাল, মোঘল ও ব্রিটিশ আমলের দূর্লভ পুরাকীর্তি, যুদ্ধের স্মৃতি ও স্থাপত্যের সৌন্দর্য

গাজী মনিরুজ্জামান, খুলনা

প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫, ০৪:৪২ পিএম

খুলনা বিভাগীয় জাদুঘর যেন সমৃদ্ধ এক তথ্যভাণ্ডার

খুলনা বিভাগীয় জাদুঘর। ছবি: গাজী মনিরুজ্জামান

অ অ

খুলনায় বেড়াতে আসলে অন্তত একবার ঘুরে যান খুলনা বিভাগীয় জাদুঘরে। প্রশস্থ সিড়ি বেয়ে দোতলায় ওঠার পথে চোখ আটকে যাবে থরে থরে সাজানো মহান মুক্তিযুদ্ধের অসংখ্য দুর্লভ ছবি দেখে।

বিশেষভাবে তৈরী অষ্টভুজাকৃতি জাদুঘর ভবনের ভিতরে ৬টি প্রদর্শণী গ্যালারী, ৬টি উইং আকারে রয়েছে। ভিতরে ঢুকে ১নং গ্যালারী থেকে ৬নং গ্যালারী পর্যন্ত রাখা হাজার বছরের পুরাতন নিদর্শনে চোখ বোলাতে বোলাতে যেকোনো দর্শকই যেন এক ভিন্ন জগতে হারিয়ে যাবেন, ক্লান্তি ভুলে যাবেন ইতিহাসের গভীরে। বিগত দুই যুগে প্রতিষ্ঠানটি খুলনাবাসীর বিনোদন ও জ্ঞান অর্জনের জন্য বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছে। 

খুলনা বিভাগীয় জাদুঘরের সহকারী পরিচালক মো. মহিদুল ইসলাম জানান, জাদুঘরটি খুলনা মহানগরীর সোনাডাঙ্গা থানাধীন শিববাড়ী ট্রাফিক মোড় সংলগ্ন খুলনা পাবলিক হলের পাশে মজিদ সরনী সড়কে এক একর জমির উপর অবস্থিত। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ৪ কোটি ৯৫ লাখ ৮৬ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত জাদুঘর ভবনটি উদ্বোধন করেন।

আয়তনের দিক থেকে এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম জাদুঘর। জাদুঘর ভবনে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর খুলনা বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালকের দপ্তর রয়েছে। এছাড়া এখানে দুইশত আসন বিশিষ্ট একটি সুন্দর সেমিনার কক্ষও রয়েছে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণে এই জাদুঘরে গুপ্ত, পাল, সেন, মোঘল ও ব্রিটিশ আমলের নানা ধরনের পুরাকীর্তির নিদর্শন উপস্থাপিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- পোড়ামাটি, কষ্টি পাথর ও কালো পাথরের মূর্তি, মোঘল আমলের স্বর্ণ ও রূপার মুদ্রা, তামা, লোহা, পিতল, মাটি ও কাচের তৈজসপত্র, বিভিন্ন ধাতুর তৈরি খেলনা, অস্ত্র ও ব্যবহার সামগ্রী, ক্যালিগ্রাফি এবং খুলনা বিভাগের বিভিন্ন অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রাচীন সংস্কৃতির নানা নিদর্শন।

জাদুঘরের প্রদর্শনীর সূচনা হয়েছে ১নং গ্যালারী থেকে। এই গ্যালারীতে স্থান পেয়েছে খুলনার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগৃহীত বিভিন্ন প্রত্নসম্পদ। যেমন- যশোরের ভরত ভায়না বৌদ্ধ মন্দির, পীরপুকুর মসজিদ, গলাকাটা মসজিদ, জোড়বাংলা মসজিদ, সাতগাছিয়া মসজিদ, জাহাজঘাটা, দমদম পীরস্থান ঢিবি, বাগেরহাটের খানজাহান আলী (র.)-এর বসতভিটায় প্রাপ্ত নিদর্শন। এছাড়া রয়েছে খুলনা আর্ট কলেজ থেকে প্রাপ্ত ১২-১৩ শতকের শক্তি মূর্তি, বাগেরহাটের কচুয়া থেকে প্রাপ্ত মারিচী মূর্তি, খুলনার কপিলমুনি ঢিবি গুচ্ছ থেকে সংগৃহীত পোড়ামাটির সামগ্রী, গুপ্ত যুগের মুদ্রা ইত্যাদি।

২নং গ্যালারীতে প্রদর্শিত হচ্ছে পোড়ামাটি ও শামুকের তৈরী চুড়ি, লোহার শাবল, পেরেক ও কব্জা, পশুর হাড় ও দাত। আদি মধ্যযুগীয় প্রতœস্থান যশোরের ভরত ভায়না থেকে প্রাপ্ত পোড়ামাটির অলংকৃত ইট, পোড়ামাটির খেলনা, ওজন, পিরিচ ও থালা ইত্যাদি। এছাড়া রয়েছে খ্রিষ্টীয় ১০ম-১১শ শতকের গণেশ, বিষ্ণু, গরুড়, নন্দীসহ বিভিন্ন ধরনের প্রস্তর নির্মিত মূর্তি।

৩নং গ্যালারীতে দেখানো হচ্ছে উত্তরবঙ্গের প্রত্নস্থান মহাস্থানগড় ও মঙ্গলকাটি থেকে সংগৃহীত বিভিন্ন প্রত্ননিদর্শন; যেমন- পোড়ামাটির ফলকচিত্র, তামার তৈরি মৃৎপাত্র, স্বল্প মূল্যবান পাথরের পুতি, ছাপাঙ্কিত রৌপ্যমুদ্রা, মসৃণ কালো মৃৎপাত্র এবং আনুমানিক খ্রিস্টীয় ১১শ-১২শ শতকের মহিষমর্দিনী দুর্গা।

৪নং গ্যালারীতে প্রদর্শিত হয়েছে লালমাই ময়নামতি অঞ্চলে অবস্থিত শালবন বিহার, আনন্দ বিহার, ভোজ বিহার থেকে সংগৃহীত প্রত্নসম্পদ। এরমধ্যে রয়েছে পোড়ামাটির ফলকচিত্র, বিভিন্ন ধরনের মৃৎপাত্র, ছাপাঙ্কিত মুদ্রা ও ছাঁচে ঢালা মুদ্রা, নব্য পাথর যুগের জীবাশ্ম কাঠের দ্বারা নির্মিত অস্ত্র। মৌর্য, গুপ্ত, সুলতানি ও মোঘল যুগের বিভিন্ন মুদ্রা এবং ১২শ-১৫শ শতকের কালো পাথরের উপর খোদিত আরবী ও ফারসি উৎকীর্ণ লিপি।

৫নং গ্যালারীতে শোভা পাচ্ছে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের প্রত্ননিদর্শন; জীব-জন্তু, গাছ-পালার ছবি অঙ্কিত বিভিন্ন ধরনের মানব প্রতিকৃতি পোড়ামাটির ফলক।

আর ৬ নং গ্যালারীতে প্রদর্শিত হচ্ছে গৌড়, লালবাগ কেল্লা, সাভার ও রোয়াইল বাড়ী থেকে সংগৃহীত প্রত্নবস্তু; পোড়ামাটির নকশাকৃত ইট, শিলালিপি, বিভিন্ন ধরনের মৃৎপাত্র, ছাপাঙ্কিত মুদ্রা, চকচকে রঙিন প্রলেপযুক্ত টাইলস, ১৭শ-১৯শ শতকের আরবী ও ফারসি হস্তাক্ষর লিপি, একশত বছরের পুরনো কাঠের খাট। ১৮শ-১৯শ শতকের বিভিন্ন ধাতব ধরন ও পাথরের তৈরী তৈজসপত্র প্রভৃতি।

অফিস তত্বাবধায়কের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিজয় কুমার ঘোষ জানান, জাদুঘর গ্রীষ্মকালে ১ এপ্রিল থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে। আর শীতকালে ১ অক্টোবর থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। আর শুক্রবার নামাজের বিরতি ছাড়া বাকী সময় খোলা থাকে। রবিবার পূর্ণদিন সাপ্তাহিক ছুটি। সোমবার অর্ধদিবস অর্থাৎ দুপুর ২টার পর খোলা থাকে। এছাড়া অন্যান্য সরকারী ছুটির দিন জাদুঘর বন্ধ থাকে। 

বিজয় কুমার ঘোষ আরও জানান, জাদুঘরের গেটের পাশেই রয়েছে টিকেট কাউন্টার। প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য প্রবেশ মূল্য ২০টাকা। শিশু ও ছাত্র-ছাত্রী ৫ম থেকে ১১শ শ্রেণি টিকেটের মূল্য ১০টাকা। এছাড়া সার্কভুক্ত দেশের দর্শনার্থীর জন্য প্রবেশ মূল্য ১০০টাকা ও বিশ্বের অন্য সব দেশের দর্শনার্থীর জন্য টিকেটের মূল্য ৩০০টাকা। 

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর খুলনা বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক লাভলী ইয়াসমিন জানান, দর্শণার্থী বৃদ্ধির জন্য বিনামূল্যে ব্রোশিওর বিলি করা ছাড়াও অনলাইনে ফেসবুক পাতা খোলা হয়েছে। যেখানে খুলনা বিভাগীয় জাদুঘরের বিভিন্ন তথ্য ও ছবি নিয়মিত আপলোড করা হয়। যাতে নবীন-প্রবীন, তরুণ-তরুণীসহ স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা জাদুঘর পরিদর্শনে আগ্রহী হয়। 

 

আরও পড়ুন