জাপানের ইতিহাসে প্রথমবার শতবর্ষী মানুষের সংখ্যা লাখ পেরোলো
ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:০৩ এএম
ছবি: সংগৃহীত
জাপানের ইতিহাসে প্রথমবার দেশটিতে এক লাখের বেশি মানুষ শতবর্ষ পার করেছে। নতুন এ মাইলফলকটি প্রকাশ করেছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। দীর্ঘ আয়ুর দেশ হিসেবে জাপানে শতবর্ষী মানুষ বেশি। বর্তমানে জাপানে ১ লাখ ৭ হাজারের বেশি মানুষ রয়েছেন। যাদের বয়স ১০০ বছর বা তার চেয়ে বেশি। যা বিশ্বজুড়েও এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
জাপান সরকারের তথ্যমতে, মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮৮ শতাংশই নারীর মধ্যে এই শতবর্ষী জনগোষ্ঠীর সিংহভাগই তারা দখল করেছে। নতুন প্রকাশিত উপাত্ত অনুযায়ী, জাপানের বর্তমান বয়োবৃদ্ধ নারীদের মধ্যে সবচেয়ে প্রবীণ হলেন কিয়োটো শহরের ১১৪ বছর বয়সী কিশিমোতো ফুয়ো এবং পুরুষদের মধ্যে সর্বজ্যেষ্ঠ স্থানটি দখল করে আছেন কুমামোতো অঞ্চলের ১১২ বছর বয়সী কাটো হিকারু।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী কেনইচিরো উয়েনো নতুন এই তথ্যকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেছেন, দেশটির চিকিৎসা খাতের ব্যাপক অগ্রগতি ও প্রযুক্তির উন্নয়নের কল্যাণে নাগরিকেরা দীর্ঘ ও সক্রিয় জীবন উপভোগ করতে পারছেন। তবে এ অর্জনের উল্টো পিঠে দেশটির সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে যে কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে সতর্কবার্তাও দিয়েছেন তিনি।
জাপানিদের এই দীর্ঘায়ুর পেছনে অন্যতম মূল ভূমিকা পালন করছে তাদের দৈনন্দিন স্বাস্থ্যকর খাদ্যঅভ্যাস ও সক্রিয় জীবনযাত্রা। তাদের প্রধান খাবারের তালিকায় মূলত থাকে মাছ, শাকসবজি এবং ভাত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যা পশ্চিমা দেশগুলোর খাবারের তুলনায় অনেক কম সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত। পাশাপাশি, বয়োজ্যেষ্ঠরা নিয়মিত হাঁটাচলা করা, গণপরিবহন ব্যবহার, বাইসাইকেল চালানো এবং দৈনন্দিন কায়িক ব্যায়ামের মাধ্যমে নিজেদের শরীরকে কর্মক্ষম রাখেন।
কিন্তু এই দীর্ঘায়ুর পেছনের সুসংবাদের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে একটি বড় জনসংখ্যাগত সংকট। বছরের পর বছর ধরে জাপানের জনসংখ্যা বয়োবৃদ্ধের সংখ্যা বাড়তে থাকার ১টি জলন্ত উদাহরণ রয়েছে। সেটি হলো, গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশটিতে শিশুদের চেয়ে বয়স্কদের ডায়াপার বেশি বিক্রি হচ্ছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ও বয়স্কদের দৈনন্দিন চলাফেরা সহজ করতে বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো নানা ধরনের উদ্ভাবনী পণ্য বাজারে আনছে, যার মধ্যে শরীর নড়াচড়ায় সহায়তাকারী শক্তিশালী পাওয়ারড এক্সোস্কেলেটন এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফোকাস পরিবর্তনকারী বিশেষ ধরনের চশমা অন্যতম।
তবে দীর্ঘায়ুর এই চিত্রের বিপরীতে দেশটির জন্মহারের ভয়াবহ পতন জাতীয় উদ্বেগের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি দেশের জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে নারীপ্রতি গড়ে ২.১ জন সন্তান জন্ম দেওয়া প্রয়োজন হলেও, জাপানে গত বছর সেই হার ইতিহাসের সর্বনিম্নে নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১.১৪-এ।
জাতীয় জনসংখ্যা ও সামাজিক নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালের সর্বোচ্চ ১২ কোটি ৮০ লাখ থেকে দেশটির মোট জনসংখ্যা ২০৭০ সাল নাগাদ প্রায় ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৮ কোটি ৭০ লাখে নেমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে দেশে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ, যা ২০৭০ সালের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জাপানি কর্তৃপক্ষ একে দেশের জন্য একটি 'অস্তিত্বের সংকট' হিসেবে অভিহিত করেছে এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানাই তাকাইচি এই পরিস্থিতিকে একটি 'নীরব জরুরি অবস্থা' হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। দেশের প্রায় সমস্ত প্রশাসনিক অঞ্চলে জনসংখ্যা হ্রাসের মাত্রা দিন দিন ত্বরান্বিত হচ্ছে।
তরুণদের সন্তান গ্রহণে উৎসাহিত করতে সরকারের বিভিন্ন ভর্তুকি ও কল্যাণমূলক নীতি রয়েছে। তবুও জন্মহার বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিয়ে করার প্রবণতা কমে যাওয়া, কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং সন্তান লালন-পালনের বিপুল ব্যয়ের মতো একাধিক জটিল বিষয় এর পেছনে কাজ করছে।
অন্যদিকে, অভিবাসীর সংখ্যা সামান্য বাড়লেও দেশটির মোট জনসংখ্যার মাত্র তিন শতাংশ বিদেশি নাগরিক, এবং নতুন করে অভিবাসী গ্রহণ করার ক্ষেত্রেও সাধারণ জনগণের মধ্যে তীব্র বিরোধিতা রয়েছে।
১৯৬৩ সালে যখন জাপান সরকার প্রথম শতবর্ষী মানুষের জরিপ শুরু করে, তখন সারা দেশে মাত্র ১৫৩ জন ১০০ বছর বয়সের মানুষ ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৮১ সালে এই সংখ্যা হাজারে পৌঁছায় এবং ১৯৯৮ সালে তা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায়।
মূলত দেশটির ঐতিহ্যবাহী প্রবীণ সম্মাননা দিবস-এর আগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করে থাকে, যেখানে ১০০ বছর পূর্ণ করা নাগরিকদের সম্মান জানাতে সরকার প্রধানের পক্ষ থেকে ব্যক্তিগত চিঠি এবং প্রথাগত মদের পাত্র প্রদান করা হয়।
তবে জন্মনিবন্ধন ও অন্যান্য নথিপত্রের বিভ্রান্তির কারণে এই জরিপ নিয়ে মাঝে মাঝে বিতর্কও তৈরি হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১০ সালের একটি সরকারি অডিটে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার মানুষের নথিপত্রে অসঙ্গতি ধরা পড়েছিল, যাদের মধ্যে অনেকেরই বহু বছর আগে মৃত্যু হয়েছিল কিন্তু স্বজনেরা পেনশন সংক্রান্ত সুবিধার জন্য বিষয়টি গোপন রেখেছিল।
সূত্র : বিবিসি