পোষা প্রাণীর সুস্থতায় নতুন অধ্যায়: পাওসিটিভ ভেটেরিনারী ক্লিনিক
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৮:২৩ পিএম
Courtesy
বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ পেট ক্লিনিক পাওসিটিভ ভেটেরিনারী ক্লিনিক এর শুভ উদ্বোধন দেশীয় পশুপ্রেমীদের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বাংলাদেশের প্রাণী স্বাস্থ্যসেবা খাতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো। পশুপাখিপ্রেমীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা এবং প্রয়োজনীয়তা পূরণের লক্ষ্যে, সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫ তারিখে, ঢাকার ধানমন্ডিতে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উদ্বোধন করা হলো দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ এবং অত্যাধুনিক পেট ক্লিনিক পাওসিটিভ ভেটেরিনারী ক্লিনিক। এই কেন্দ্রটি এখন থেকে পোষা প্রাণীদের জন্য প্রয়োজনীয় সকল ধরনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা ও উন্নত পরিচর্যা নিশ্চিত করবে, যা এতদিন দেশের প্রাণিস্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি বড় ঘাটতি ছিল।
উক্ত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান জনাব সাকিফ শামীম, ম্যানেজিং ডিরেক্টর ইঞ্জিনিয়ার মাসতুরা ফারজানা মোহনা, ল্যাবএইড গ্রুপের পরিচালকবৃন্দ, দেশের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, প্রাণী চিকিৎসকগণ এবং পশুপ্রেমিকরা। এছাড়াও ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল, নার্স ও অন্যান্য নিবেদিতপ্রাণ কর্মীরাও এই বিশেষ আয়োজনে যোগ দেন, যারা বাংলাদেশের প্রাণীদের জন্য সর্বোচ্চ মানের সেবা প্রদানে অঙ্গীকারবদ্ধ।
পাওসিটিভ ভেটেরিনারী ক্লিনিককে বাংলাদেশের ভেটেরিনারি খাতে একটি 'গেম চেঞ্জার' হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলে অভিমত দেন প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার সাকিফ শামীম ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর ইঞ্জিনিয়ার মাসতুরা ফারজানা মোহনা। ক্লিনিকটির নকশা ও সুযোগ-সুবিধা বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে একটি আন্তর্জাতিক মানের ভেটেরিনারি সেন্টারের সমস্ত বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। প্রাণীপ্রেমীরা তাদের পোষা প্রাণীর জটিল রোগ থেকে শুরু করে নিয়মিত স্বাস্থ্য-পরীক্ষা, প্রতিরোধমূলক টিকাদান এবং উন্নত পরিচর্যার জন্য এক ছাদের নিচে সব ধরনের সমাধান খুঁজে পাবেন। এই কেন্দ্রের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে: উচ্চ প্রশিক্ষিত এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ভেটেরিনারিয়ানদের (পশুচিকিৎসক) দ্বারা সার্বক্ষণিক কনসালটেশন সার্ভিস, আধুনিক রোগ নির্ণয় ক্ষমতাসম্পন্ন একটি অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি, যেখানে রক্ত পরীক্ষা, ইসিজি, বায়োকেমিস্ট্রি বিশ্লেষণ, এক্স-রে এবং রুটিন আল্ট্রাসনোগ্রাফি সুবিধা বিদ্যমান; যেকোনো জটিল অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সমৃদ্ধ একটি সুসজ্জিত সার্জারি ইউনিটও রয়েছে।
ক্লিনিকের চেয়ারম্যান, জনাব সাকিফ শামীম, তাঁর বক্তব্যে পাওসিটিভ ভেটেরিনারী ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার মূল দর্শন তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত বাড়ছে, জীবনযাত্রার মান উন্নত হচ্ছে এবং একই সাথে মানুষের মধ্যে পোষা প্রাণীর প্রতি ভালবাসা ও দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের পশুপাখিরা আমাদের পরিবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। পাওসিটিভ ভেটেরিনারী ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমরা শুধু একটি ক্লিনিক চালু করছি না, আমরা দেশের প্রতিটি পোষা প্রাণীর জন্য উন্নত চিকিৎসা এবং একটি স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ ভবিষ্যতের অঙ্গীকার করছি। এটি হবে দেশের প্রাণী চিকিৎসায় আস্থা ও যত্নের প্রতীক।
ক্লিনিকটির ম্যানেজিং ডিরেক্টর ইঞ্জিনিয়ার মাসতুরা ফারজানা মোহনা বলেন, পশুপালন ও পোষা প্রাণীর যত্ন বাংলাদেশে দ্রুত বাড়ছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও ন্যাশনাল গাইডলাইন ফর অ্যানিমেল বাইট ম্যানেজমেন্টের তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রায় ১৭ লাখ কুকুর রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ২৮৯,০০০ পোষা কুকুর, আর বিশ্বজোড়া/ACI রিপোর্ট অনুসারে প্রায় ৪০ লাখ বিড়াল রয়েছে, যার প্রায় ৫৬৪,৮৪৮ পোষা বিড়াল। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকা এবং গোটা দেশে বেসরকারি পশু চিকিৎসা ক্লিনিকের সংখ্যা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে: ২০১৭ সালে মাত্র কয়েকটি ক্লিনিক থাকলেও এখন দেশের মধ্যে ২২৫টিরও বেশি প্রাইভেট পেট ক্লিনিক কার্যক্রম চালাচ্ছে এবং এই সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। শুধু ঢাকাতেই পোষা প্রাণীর চিকিৎসা ও প্রিভেন্টিভ কেয়ার–এর জন্য ৫০টি ক্লিনিক রয়েছে এবং এই সেক্টরটি প্রতিনিয়ত বর্ধমান। বিশ্বব্যাপীও ভেটেরিনারি সেবা বাজারটি ২০২৪ সালে প্রায় ৬৫.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার–এর মূল্য ছাড়িয়ে গেছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এটি ১৪৯.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার–এ পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে, যা পরিষেবাগুলোর গুরুত্ব ও চাহিদা আরও বৃদ্ধি পাবে তা প্রমাণ করে।
অনেকের মনেই প্রশ্ন আসতে পারে, ঢাকা শহরসহ দেশে যখন ইতোমধ্যেই এতগুলো পেট ক্লিনিক আছে, তখন নতুন করে পাওসিটিভ ভেটেরিনারী ক্লিনিক কেন? এর উত্তরে বলা যায়, সংখ্যায় ক্লিনিক বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু সমন্বিত, স্ট্যান্ডার্ডাইজড এবং আন্তর্জাতিক মানের পূর্ণাঙ্গ ভেটেরিনারি কেয়ার এখনও বিরল। অধিকাংশ ক্লিনিক এখনো সীমিত পরিসরে কাজ করে—কোথাও ডায়াগনস্টিক নেই, কোথাও সার্জারি সুবিধা নেই, আবার কোথাও জরুরি সেবার অভাব। অনেক ক্ষেত্রেই পোষা প্রাণীর মালিককে একাধিক জায়গায় দৌড়াতে হয় সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য। আমরা যখন ফিল্ড ওয়ার্ক করেছি, তখন দেখেছি—একই রোগের জন্য ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ হচ্ছে, অথচ এভিডেন্স-বেইসড মেডিসিনের ধারাবাহিকতা নেই। ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশন ফর এনিমেল হেলথ এবং ওয়ার্ল্ড ভেরেনারী অ্যাসোসিয়েশন–এর গাইডলাইন অনুযায়ী, আধুনিক ভেটেরিনারি সেবায় মাল্টিডিসিপ্লিনারি অ্যাপ্রোচ, প্রিভেন্টিভ কেয়ার এবং স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রোটোকল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—যা আমাদের দেশে এখনও পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এই শূন্যস্থান থেকেই পাওসিটিভ ভেটেরিনারী ক্লিনিক–এর জন্ম।
আমাদের লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে ২৪/৭ জরুরি চিকিৎসা, উন্নত ডায়াগনস্টিক সুবিধা ও প্রফেশনাল গ্রুমিং সেবা প্রদান করা, যাতে প্রাণী এবং তাদের মালিক উভয়ের মানসিক প্রশান্তি নিশ্চিত হয়। ভবিষ্যতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই সেবার বিস্তার ঘটানোর পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।
পাওসিটিভ ভেটেরিনারী ক্লিনিক দেশের প্রাণী স্বাস্থ্যসেবা খাতে একটি উদাহরণ সৃষ্টি করবে। এটি শুধু ঢাকার নয়, বরং সারা দেশের প্রাণীপ্রেমীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে বলে আমরা আশাবাদী। দেশের ভেটেরিনারি শিক্ষানবিশদের জন্য হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি করে এটি ভবিষ্যৎ বিশেষজ্ঞ তৈরিতেও সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী। পশুপাখির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এই যুগান্তকারী নতুন উদ্যোগ নিঃসন্দেহে দেশের ভেটেরিনারি পরিষেবাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়ে প্রাণীকল্যাণে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।