আইসিএপিপির ভাইস চেয়ারপারসন হলেন বিএনপির ইসমাইল জবিউল্লাহ
বিশ্বব্যাপী আস্থা পুনর্গঠনে গণতন্ত্র, সুশাসন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:০৮ পিএম
ইসমাইল জবিউল্লাহ/ ছবি সংগৃহীত
দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে এশিয়ার রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অব এশিয়ান পলিটিক্যাল পার্টিজের (আইসিএপিপি) ১৩তম সাধারণ অধিবেশন উদ্বোধন হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) স্থানীয় সময় সকাল ৯টায় সিউলের দ্য শিলা সিউল হোটেলে এ সম্মেলনের উদ্বোধন করা হয়। সম্মেলনে বিএনপির প্রতিনিধিদলের নেতা, দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ ভাইস চেয়ারপারসন নির্বাচিত হয়েছেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং ভিডিওবার্তার মাধ্যমে বক্তব্য দেন। এ ছাড়া দেশটির জাতীয় পরিষদের স্পিকার চো জং-সিক, আইসিএপিপির স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান চুং উই-ইয়ং, সম্মেলনের আয়োজক কমিটির কো-চেয়ারপারসন ও ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা কিম মিন-সক এবং বিরোধী দল পিপল পাওয়ার পার্টির নেতা সং সিওক-জুন বক্তব্য দেন।

উদ্বোধনী অধিবেশনে আইসিএপিপির মহাসচিব ওহ সং ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সংগঠনের কার্যক্রমের প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। এ সময় সংগঠনের সনদ সংশোধন এবং ১৩তম সাধারণ অধিবেশনের ব্যুরো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে এশিয়ার ৩৬টি দেশের ৮৩টি রাজনৈতিক দলের ২২৭ জন প্রতিনিধি এবং আইসিএপিপির ২৮০ জন অংশগ্রহণ করছেন বলে জানানো হয়েছে।
বৈশ্বিক আস্থা পুনর্গঠনে গণতন্ত্র ও সুশাসনের আহ্বান
সম্মেলনের প্রথম দিনের প্রথম প্ল্যানারি অধিবেশনে বক্তব্য দেন নবনির্বাচিত ভাইস চেয়ারপারসন ইসমাইল জবিউল্লাহ। বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক অস্থিরতা, সংঘাত ও আস্থার সংকট মোকাবিলায় গণতন্ত্র, সুশাসন, আইনের শাসন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানান তিনি।
সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘পরিবর্তনশীল বিশ্বে আস্থা পুনর্গঠন’ অত্যন্ত সময়োপযোগী উল্লেখ করে ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, বৈশ্বিক শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারস্পরিক আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি জনগণ ও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে একটি সামাজিক চুক্তি। এ চুক্তির ভিত্তি হতে হবে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, আইনের শাসন এবং মৌলিক অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেটকে শুধু ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ হিসেবে নয়, বরং জনগণের সেবা করার দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করে। বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাসী।
ফিলিস্তিনসহ মধ্যপ্রাচ্যের মানবিক বিপর্যয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ভূরাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে মানবজীবনের মর্যাদাকে স্থান দিতে হবে। আন্তর্জাতিক নীতি ও আদর্শ কোনো ধরনের বৈষম্য ছাড়াই সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা জরুরি।

আন্তমহাদেশীয় রাজনৈতিক সংলাপের গুরুত্ব তুলে ধরে ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, বর্তমান অস্থির বিশ্বে বিভিন্ন মহাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ইউরোপের অস্থিরতা থেকে এশিয়া বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না, একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের প্রভাব থেকেও ইউরোপ মুক্ত থাকতে পারে না। বিএনপি এ ধরনের আন্তমহাদেশীয় রাজনৈতিক সংলাপে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে আগ্রহী।
অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে তিনি বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের এমনভাবে অন্য দেশের রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করা উচিত নয়, যাতে সংশ্লিষ্ট দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হয়। আন্তসীমান্ত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ প্রতিরোধে আইসিএপিপির কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন তিনি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সম্ভাবনা ও ঝুঁকি প্রসঙ্গে বিএনপির এই নেতা বলেন, এআই উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি করলেও লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে। আধুনিক যুদ্ধব্যবস্থায় এ প্রযুক্তির ব্যবহারও উদ্বেগের কারণ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আইসিএপিপির উদ্যোগে একটি অভিন্ন কৌশলগত নীতিপত্র প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় জাতীয় জিডিপির উপযুক্ত অংশ বরাদ্দ এবং জলবায়ু অর্থায়নে ন্যায্যতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন ইসমাইল জবিউল্লাহ।
তরুণ প্রজন্মের ওপর ভুল তথ্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপতথ্যের নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী বিষণ্নতা ও মানসিক স্বাস্থ্যসংকটও নীরব চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আইসিএপিপিকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বের পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততা বাড়ানো প্রয়োজন।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, বিশ্বের ভবিষ্যৎ শুধু জবরদস্তি কিংবা সম্পদের ওপর নির্ভর করবে না; আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস ধরে রাখতে কতটা সক্ষম, তার ওপরও তা নির্ভরশীল।
বাংলাদেশ ও বিএনপির পক্ষ থেকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, আইনের শাসন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘আস্থা পুনর্গঠনকে শুধু রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং আমাদের অভিন্ন ভবিষ্যতের প্রতি স্থায়ী অঙ্গীকার হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।’
বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য
সম্মেলনের প্রথম দিনের প্রথম ও দ্বিতীয় অধিবেশনে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা বক্তব্য দেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার পিপল পাওয়ার পার্টির সিন সুং-বুম, নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দেশটির কমিউনিস্ট পার্টির সমন্বয়কারী মাধব কুমার, পাকিস্তানের সাবেক মন্ত্রী ও পাকিস্তান মুসলিম লীগের নেতা মুশাহিদ হুসাইন, পূর্ব তিমুরের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আলিকসো মারিয়া ডা সিলভা, কম্বোডিয়ান পিপলস পার্টির নেতা সুয়াস ইয়াবা, উজবেকিস্তান লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির চেয়ারম্যান আকতাম খাইতভ এবং ভিয়েতনামের পররাষ্ট্রবিষয়ক ভাইস মিনিস্টার জো লি ভান।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন নিউ আজারবাইজান পার্টির ডেপুটি চেয়ারম্যান তাহির বুডাগভ, জাপানের কনস্টিটিউশনাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট সুনিচি মিজুওকা, ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টির ব্যুরো সদস্য আন্দ্রে ক্লিমোভ, নেপালের রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির মহাসচিব বিহিন কুমার আচারিয়া, শ্রীলঙ্কার সড়ক পরিবহন ও নগর উন্নয়নমন্ত্রী বিমল রাঠানায়াক, প্যান-মালয়েশিয়ান ইসলামিক পার্টির নেতা শাহিদার বিন কাসিম এবং ইন্দোনেশিয়ার সাবেক মন্ত্রী ড. দেও সামবুয়াগা।
অধিবেশনে আরও বক্তব্য দেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের ভাইস মিনিস্টার সান হাইয়ান, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহী, জাপান কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারপারসন কাজুও শিই, থাইল্যান্ডের থাই পার্টির ড. নালিনী টাভিসীন, পাপুয়া নিউগিনির ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স পার্টির প্রেসিডেন্ট জয়েস ইসোবেল গ্রান্ট, পাকিস্তান পিপলস পার্টির নারী শাখার প্রধান সমন্বয়কারী মাহিস শেখ এবং ভুটানের পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মহাসচিব কুয়েঙ্গা টাশহি।
এ ছাড়া বক্তব্য রাখেন নেপালি কংগ্রেসের ভাইস প্রেসিডেন্ট বিনোদ কুমার চৌধুরী, মিয়ানমারের ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) উ মাইন্ট কো কো, ফিজির সাবেক ডেপুটি স্পিকার রূপিনী নাডালো এবং তুরস্কের জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির পররাষ্ট্রবিষয়ক ভাইস চেয়ারম্যান এমির ইয়াসীন।
সম্মেলনে বাংলাদেশের পাঁচ দলের ১৬ প্রতিনিধি
আইসিএপিপির ১৩তম সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশ থেকে বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জাতীয় পার্টির প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। পাঁচটি দলের মোট ১৬ জন প্রতিনিধি সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন।
বিএনপির প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ। প্রতিনিধিদলের অপর সদস্য দলের যুগ্ম মহাসচিব ও ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের প্রশাসক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধিদলে রয়েছেন ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহী এমপি ও সালাহউদ্দিন আইয়ুবী এমপি।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রতিনিধিদলে রয়েছেন মুহাম্মদ নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, মনিরা শারমিন ও মো. আলাউদ্দিন।
জাতীয় পার্টির প্রতিনিধিদলে রয়েছেন মো. মমতাজ উদ্দিন ও মো. আলাহান উদ্দিন। অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলে রয়েছেন কে এম বিল্লাল ও মো. রাজন সিকদার।
উল্লেখ্য, দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক পার্টি ও বিরোধী দল পিপল পাওয়ার পার্টির যৌথ আয়োজনে সিউলের দ্য শিলা সিউল হোটেলে আইসিএপিপির ১৩তম সাধারণ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এশিয়ার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন জোরদারের লক্ষ্যে আয়োজিত এ সম্মেলন আগামী ৬ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে। ৭ নভেম্বর প্রতিনিধিদের জন্য সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শনের কর্মসূচি রয়েছে।