এলডিসি থেকে উত্তরণে বৈশ্বিক সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান
জাতিসংঘে এলডিসি গ্রুপের পক্ষে ৫ দফা অগ্রাধিকার প্রস্তাব পেশ করেন ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর
বাসস
প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬, ০১:৩৮ এএম
জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ইকোসকের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে এলডিসি গ্রুপের পক্ষে বক্তব্য রাখছেন ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। ছবি: বাসস
স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় মসৃণ ও টেকসই উত্তরণ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহায়তা আরও জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছে এলডিসি গ্রুপ। একই সঙ্গে স্বল্পসুদে পর্যাপ্ত অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কার, সহজপ্রাপ্য জলবায়ু অর্থায়ন, বাজারে প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল বৈষম্য দূর করতে বৈশ্বিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
সোমবার জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে এলডিসি গ্রুপের পক্ষে এই আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
এলডিসি গ্রুপের মতে, এসব পদক্ষেপ ছাড়া ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) এবং দোহা কর্মসূচির লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।
সাধারণ বিতর্কে দেওয়া বক্তব্যে ড. তিতুমীর টেকসই উন্নয়নের জন্য ‘২০৩০ এজেন্ডা’ এবং ‘দোহা কর্মসূচি’র প্রতি এলডিসি গ্রুপের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘এই দুটি বৈশ্বিক কাঠামো স্বল্পোন্নত দেশগুলোর টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহনশীল উন্নয়ন এবং সুষ্ঠু উত্তরণের প্রধান পথনির্দেশক। তবে ২০৩০ সালের সময়সীমা যতই ঘনিয়ে আসছে, এলডিসিগুলোর এসডিজি অর্জনের অগ্রগতি ততই নির্ধারিত পথ থেকে সরে যাচ্ছে।’
তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র প্রভাব, ঋণের বাড়তি বোঝা, বৈদেশিক উন্নয়ন সহায়তা (ওডিএ) কমে যাওয়া এবং সাশ্রয়ী অর্থায়নের সীমিত সুযোগ এলডিসিগুলোর উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করছে। এসব সংকট শুধু ২০৩০ এজেন্ডা বাস্তবায়নকে বাধাগ্রস্ত করছে না, বরং দোহা কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য-২০৩১ সালের মধ্যে আরও বেশি এলডিসিকে টেকসই ও অপরিবর্তনীয়ভাবে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উত্তরণ-সেটিকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
বক্তব্যে তিনি জানান, বর্তমানে ১৪টি এলডিসি বিভিন্ন পর্যায়ে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে এবং এ দেশগুলোর ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখা জরুরি। নজিরবিহীন রাজনৈতিক, সামষ্টিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত এবং বহিরাগত অভিঘাতের কারণে বাংলাদেশ ও নেপাল তাদের উত্তরণ-প্রস্তুতি পর্ব ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত তিন বছর বাড়ানোর আবেদন করেছে।
ড. তিতুমীর বলেন, ‘দেশীয় ও বৈশ্বিক জটিল পরিস্থিতিতে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পথে থাকা দেশগুলোর জন্য এই অতিরিক্ত সময় কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, বরং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, ‘স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি’ (এসটিএস) বাস্তবায়ন এবং প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার জন্য এটি একটি কৌশলগত প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘এ বাস্তবতায় দোহা কর্মসূচির কার্যকর বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। এর মাধ্যমে এলডিসিগুলোর কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করা, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, অভিঘাত মোকাবিলার সক্ষমতা জোরদার এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।’
ড. তিতুমীর বলেন, ‘আগামী বছর কাতারের দোহায় অনুষ্ঠেয় দোহা কর্মসূচির মধ্য মেয়াদি পর্যালোচনা বৈশ্বিক অংশীদারিত্বকে নতুন করে শক্তিশালী করার এবং গৃহীত প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে গতি আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।’
তিনি রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান, মন্ত্রী, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান, যাতে এই পর্যালোচনা বাস্তবসম্মত, রূপান্তরমুখী এবং কার্যকর ফলাফল দিতে পারে।
এলডিসি গ্রুপের পক্ষ থেকে তিনি জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের জন্য পাঁচটি অগ্রাধিকারমূলক প্রস্তাব তুলে ধরেন-
প্রথমত: ক্রমবর্ধমান ঋণঝুঁকি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত, পূর্বানুমেয় এবং সহজ শর্তে উন্নয়ন অর্থায়নের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দারিদ্র্য বিমোচনের মতো মৌলিক খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
দ্বিতীয়ত: এলডিসিগুলোর কাঠামোগত দুর্বলতাকে যথাযথভাবে প্রতিফলিত করতে আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কার জরুরি। এ জন্য সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ, ঋণ পরিশোধে সাময়িক স্থগিতাদেশ, টেকসই ঋণ সমাধান এবং আরও ন্যায্য বৈশ্বিক অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
তৃতীয়ত: জলবায়ু অর্থায়ন হতে হবে সহজপ্রাপ্য, পূর্বানুমেয় এবং ঝুঁকির মাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অভিযোজন, জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি, জ্বালানি রূপান্তর এবং ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিলের জন্য অতিরিক্ত, পর্যাপ্ত ও দ্রুত প্রাপ্তিযোগ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও সহনশীল অবকাঠামোয় বিনিয়োগের মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপরও জোর দেন তিনি।
চতুর্থত: সুরক্ষাবাদী প্রবণতা থেকে সরে এসে এলডিসিগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে স্বচ্ছ, সহজ এবং উন্নয়নবান্ধব ‘রুলস অব অরিজিন’ নিশ্চিত করতে হবে।
পঞ্চমত: প্রযুক্তি হস্তান্তর, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে ডিজিটাল ও প্রযুক্তিগত বৈষম্য কমাতে আরও শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গড়ে তুলতে হবে। এর মাধ্যমে এলডিসিগুলো উদ্ভাবনকে কাজে লাগিয়ে টেকসই উন্নয়নের গতি আরও ত্বরান্বিত করতে পারবে।
বক্তব্যের শেষাংশে ড. তিতুমীর বলেন, এলডিসিগুলোর সামনে থাকা চ্যালেঞ্জ আন্তর্জাতিক সংহতি এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার একটি বড় পরীক্ষা। তিনি বলেন, দোহা কর্মসূচির মধ্য মেয়াদি পর্যালোচনাকে এমন একটি মোড় পরিবর্তনের সুযোগে পরিণত করতে হবে, যা টেকসই উন্নয়নের গতি পুনরুদ্ধার করবে, পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন করবে এবং কাউকে পেছনে না রেখে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে নতুন গতি সৃষ্টি করবে।
তিনি বলেন, এ লক্ষ্য অর্জনে এলডিসি গ্রুপ সব অংশীদারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে প্রস্তুত।