একজন নারীর একা দাঁড়িয়ে থাকার সাহস: আত্মমর্যাদা, নেতৃত্ব ও নিজের পরিচয় নির্মাণের গল্প
ডা. উম্মে হানি পৃথ্বী
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১৫ পিএম
ডা. উম্মে হানি পৃথ্বী। ছবি: সংগৃহীত
জীবনের সব পথ ভিড়ের মধ্যে হাঁটা যায় না। কিছু সিদ্ধান্ত এমনভাবে আসে, যখন পাশে পরিচিত কণ্ঠ থাকে না, হাততালি থাকে না, এমনকি নিজের পছন্দকে ব্যাখ্যা করার সুযোগও সব সময় মেলে না। সেই মুহূর্তগুলোতেই মানুষ বুঝতে শেখে—নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের দায় শেষ পর্যন্ত নিজেকেই নিতে হয়।
একজন নারীর ‘একা দাঁড়ানোর সাহস’ বলতে আমি এই শক্তিকেই বুঝি। এটি নিঃসঙ্গ হওয়ার ঘোষণা নয়, পরিবার বা সম্পর্ককে অস্বীকার করার কথাও নয়। বরং এটি এমন এক আত্মবিশ্বাস, যেখানে একজন নারী সহায়তা গ্রহণ করতে পারেন, পরামর্শ শুনতে পারেন, ভুল হলে তা স্বীকার করতে পারেন—তবুও নিজের মূল্যবোধ, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার অন্যের হাতে সমর্পণ করেন না।
আমাদের সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হচ্ছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ, রাজনীতি ও নেতৃত্বে নারীর অগ্রগতি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ক্ষমতায়নের সবচেয়ে ব্যক্তিগত ও মৌলিক স্তরটি হলো—নিজের জীবন সম্পর্কে নিজের কণ্ঠ থাকা। একজন নারী কী হতে চান, কোন পথে এগোতে চান, কোন পরিবেশে কাজ করতে চান, কোন সীমারেখা টানতে চান—এসব প্রশ্নে তাঁর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি তাঁর ব্যক্তি-স্বাধীনতা ও মর্যাদার স্বাভাবিক অংশ।
নিজের পাশে প্রথম মানুষটি নিজেই
একজন নারী নিজের মতামত প্রকাশ করলে তাঁকে যেন তাঁর যুক্তির ভিত্তিতে বিচার করা হয়। তিনি নেতৃত্ব দিতে চাইলে তাঁর দক্ষতা, সততা ও কাজের ধারাবাহিকতা মূল্যায়িত হোক। তিনি কোনো বিষয়ে দ্বিমত করলে সেটিকে অবাধ্যতা, অহংকার বা ব্যক্তিগত বিদ্বেষ হিসেবে ব্যাখ্যা করার আগে তাঁর বক্তব্যটি শোনা হোক। কারণ আত্মবিশ্বাস আর অহংকার এক জিনিস নয়; নিজের সীমা ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা আর অন্যকে অসম্মান করা এক জিনিস নয়।
নিজের পাশে দাঁড়ানোর প্রথম ধাপ হলো নিজের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা—দুটিই চেনা। আমি কী পারি, কোথায় উন্নতি দরকার, কোন সিদ্ধান্ত আমার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যকে এগিয়ে নেবে, আর কোন আপস আমাকে নিজের কাছেই ছোট করে দেবে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে নেওয়া জরুরি। আত্মপরিচয়ের এই ভিত্তি যত শক্ত হয়, বাইরের প্রশংসা কিংবা সমালোচনা তত কম আমাদের চলার দিকনির্দেশ ঠিক করে দেয়।
তবে নিজের ওপর আস্থা মানে সব সময় নিজেকেই সঠিক ভাবা নয়। বরং পরিণত আত্মবিশ্বাসের একটি বড় লক্ষণ হলো—ভুল হলে ফিরে তাকানোর সাহস। নিজের সিদ্ধান্তের দায়িত্ব নেওয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রয়োজন হলে সিদ্ধান্ত সংশোধন করাও গুরুত্বপূর্ণ। যে মানুষ ভুল স্বীকার করতে পারেন না, তিনি আত্মবিশ্বাসী নন; অনেক সময় তিনি কেবল নিজের অবস্থান রক্ষা করতে ব্যস্ত থাকেন।
ব্যক্তিগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে নিজের সক্ষমতা
একজন চিকিৎসক হিসেবে আমার পেশা আমাকে খুব কাছ থেকে একটি বিষয় শিখিয়েছে—সংকটের মুহূর্তে পরিচয়ের চেয়ে দায়িত্ব বড় হয়ে ওঠে। রোগীর সামনে দাঁড়ালে তাঁর পরিচয়, আমার পরিচয় কিংবা বাইরে কে কী ভাবছেন—এসবের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সঠিক সিদ্ধান্ত, সময়মতো পদক্ষেপ এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা। জীবনের অন্য ক্ষেত্রেও আমি একই নীতিকে মূল্যবান মনে করি।
একজন নারীর পরিচয় তাঁর পারিবারিক পরিচয়, বৈবাহিক অবস্থা, সামাজিক সম্পর্ক কিংবা পেশার একটি মাত্র পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি একই সঙ্গে একজন পেশাজীবী, নাগরিক, চিন্তাশীল মানুষ, লেখক, সংগঠক, গবেষক, উদ্যোক্তা বা জনসেবায় আগ্রহী একজন কর্মী হতে পারেন। জীবনের প্রতিটি পরিসরে তাঁর নিজস্ব কণ্ঠ ও সক্ষমতার জায়গা থাকা উচিত।
আমার নিজের পথচলায় চিকিৎসাসেবা, লেখালেখি ও সামাজিক কর্মকাণ্ড আমাকে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে—পরিচয় পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু পরিচয়ের চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সেই পরিচয় দিয়ে আমি কী করছি। একটি পদ, একটি উপাধি কিংবা সাময়িক স্বীকৃতি যত দ্রুত দৃশ্যমান হয়, মানুষের জন্য ধারাবাহিক কাজের মূল্য তত দ্রুত বোঝা যায় না। অথচ দীর্ঘমেয়াদে মানুষের আস্থা তৈরি হয় কাজ, দায়িত্ববোধ এবং আচরণের মধ্য দিয়েই।
তাই আমি এমন একটি জীবনদর্শনে বিশ্বাস করি, যেখানে স্বীকৃতির চেয়ে সক্ষমতা, কথার চেয়ে কাজ এবং ব্যক্তিগত অবস্থানের চেয়ে সমাজে ইতিবাচক অবদান বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নিজের পরিচয় নির্মাণ মানে অন্য সব পরিচয় মুছে ফেলা নয়; বরং নিজের কাজের মাধ্যমে এমন একটি অবস্থান তৈরি করা, যা শুধু সম্পর্কের সূত্রে নয়, নিজের যোগ্যতায়ও পরিচিত হয়।
নেতৃত্ব: পদ নয়, দায়বদ্ধতার পরীক্ষা
নেতৃত্বকে আমরা অনেক সময় পদ, মঞ্চ বা দৃশ্যমান ক্ষমতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখি। কিন্তু প্রকৃত নেতৃত্ব আরও গভীর। নেতৃত্ব হলো দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতা, কথা শোনার ধৈর্য, কঠিন সিদ্ধান্তের দায় নিজের ওপর নেওয়ার মানসিকতা এবং প্রয়োজন হলে জনপ্রিয়তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে ন্যায্য কথা বলার সাহস।
নারীর নেতৃত্ব নিয়েও তাই শুধু সংখ্যার আলোচনা যথেষ্ট নয়। সামাজিক, পেশাগত ও রাজনৈতিক পরিসরে নারীর উপস্থিতি বাড়া জরুরি, কিন্তু সেই উপস্থিতি যেন সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাস্তব ক্ষমতায় রূপ নেয়। একজন নারী সভায় উপস্থিত থাকলেন, কিন্তু তাঁর মতামত শোনা হলো না; পদ পেলেন, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পেলেন না; দায়িত্ব পেলেন, কিন্তু প্রয়োজনীয় সম্পদ বা সহযোগিতা পেলেন না—তাহলে সেটি দৃশ্যমান প্রতিনিধিত্ব হতে পারে, কার্যকর নেতৃত্ব নয়।
একজন নারী চিকিৎসক জনস্বাস্থ্য নিয়ে কথা বললে তিনি শুধু নিজের পেশার কথা বলেন না; তিনি একটি জনগোষ্ঠীর সুস্বাস্থ্য, প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা, মাতৃস্বাস্থ্য বা শিশুস্বাস্থ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেন। একজন নারী কন্যাশিশুর নিরাপত্তা ও শিক্ষার পক্ষে দাঁড়ালে তিনি কেবল একটি সামাজিক ইস্যু নিয়ে কথা বলেন না; তিনি একটি প্রজন্মের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন। আর একজন নারী যখন সামাজিক বা রাজনৈতিক নেতৃত্বে অংশ নেন, তখন তাঁর সামনে মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানে আরও বিস্তৃত ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি হয়।
তবে একজন নারী নেতা হলেই তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভালো নেতা হয়ে যান না—যেমন একজন পুরুষ নেতা হলেই তিনি যোগ্য হয়ে যান না। নেতৃত্বের মানদণ্ড হওয়া উচিত সততা, দক্ষতা, জবাবদিহি, মানবিকতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিকতা। সমান সুযোগের দাবি কোনো বিশেষ ছাড়ের দাবি নয়; এটি একই মানদণ্ডে ন্যায্যভাবে মূল্যায়িত হওয়ার দাবি।
একা দাঁড়ানো মানে একা হয়ে যাওয়া নয়
‘আমি একাই পারব’—এই বাক্যটি সব সময় শক্তির পরিচয় নয়। মানুষ সামাজিক প্রাণী; পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী, শিক্ষক, সহযোদ্ধা এবং প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা আমাদের অগ্রগতিকে সহজ করে। প্রয়োজনের সময় সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়। বরং কখন সাহায্য নিতে হবে, কার পরামর্শ শুনতে হবে এবং কোন সহায়তা গ্রহণ করেও নিজের সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা বজায় রাখা যায়—এটি পরিণত হওয়ারই অংশ।
একা দাঁড়ানোর সাহস মানে হলো, সমর্থন না পেলেও নিজের মূল্যবোধকে পুরোপুরি ছেড়ে না দেওয়া। আবার সমর্থন পাওয়া মানে নিজের বিচারবোধ বন্ধ করে দেওয়া নয়। সম্পর্কের প্রতি সম্মান এবং নিজের প্রতি সম্মান—দুটিই পাশাপাশি থাকতে পারে।
কখনো কখনো ‘না’ বলা আত্মমর্যাদার গুরুত্বপূর্ণ ভাষা। এমন কোনো সিদ্ধান্ত, সম্পর্ক, কর্মপরিবেশ বা সামাজিক প্রত্যাশা যদি একজন মানুষের আত্মসম্মান, নিরাপত্তা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তাহলে সীমারেখা টানা প্রয়োজন হতে পারে। তবে সেই সীমারেখা যেন রাগ, প্রতিশোধ বা অহংকার থেকে নয়; বরং স্পষ্ট চিন্তা, মর্যাদা এবং নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দায়িত্বশীলতার জায়গা থেকে আসে।
একজন নারীকে শক্তিশালী হতে হলে পৃথিবীর সবার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয় না। তাঁকে নিজের ন্যায্য অধিকার, মূল্যবোধ ও লক্ষ্য সম্পর্কে পরিষ্কার থাকতে হয়। কখন কথা বলতে হবে, কখন অপেক্ষা করতে হবে, কখন আপস করা যায়, আর কোন জায়গায় আপস করলে নিজেকেই হারিয়ে ফেলতে হয়—এই বোধই আত্মনির্ভরতার বড় অংশ।
সমালোচনা, ব্যর্থতা ও আবার শুরু করার সাহস
জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে সবাই একমত হবেন না। নতুন কাজ শুরু করলে প্রশ্ন আসবে, ভুল হলে সমালোচনা হবে, কখনো কোনো পরিকল্পনা ব্যর্থও হতে পারে। কিন্তু একটি ব্যর্থতা একজন মানুষের সামগ্রিক সক্ষমতার রায় নয়। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে সামাজিক বিচার অনেক সময় দ্রুত ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে—একটি ভুল সিদ্ধান্তকে তাঁদের পুরো চরিত্র, যোগ্যতা বা ভবিষ্যতের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। এই প্রবণতা বদলানো প্রয়োজন।
সমালোচনারও মূল্য আছে, যদি তা আমাদের অন্ধ জায়গাগুলো দেখায়। তাই সব সমালোচনা এড়িয়ে যাওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি সব সমালোচনাকে সত্য ধরে নেওয়াও ঠিক নয়। কোন মন্তব্যটি উন্নতির সুযোগ দিচ্ছে, আর কোনটি শুধু নিরুৎসাহিত করছে—এই পার্থক্য বুঝতে শেখা দরকার।
একজন নারীর আত্মমর্যাদার প্রকৃত পরীক্ষা অনেক সময় সাফল্যের দিনে নয়, বরং ব্যর্থতার পরের দিনে হয়। তিনি কি নিজের ভুল থেকে শিখে আবার শুরু করতে পারবেন? তিনি কি অন্যের নেতিবাচক মন্তব্যকে নিজের পরিচয়ের স্থায়ী সংজ্ঞা বানাবেন, নাকি অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও প্রস্তুত হয়ে সামনে এগোবেন? নেতৃত্বের জন্য এই মানসিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নারীর ক্ষমতায়ন: ব্যক্তিগত অর্জন থেকে সামাজিক পরিবর্তন
নারীর অগ্রগতিকে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের তালিকায় সীমাবদ্ধ রাখলে এর বৃহত্তর অর্থটি ধরা পড়ে না। একজন মেয়ের শিক্ষা, একজন নারীর কর্মসংস্থান, একজন উদ্যোক্তার আর্থিক স্বাধীনতা কিংবা একজন পেশাজীবীর নেতৃত্ব—প্রতিটি অর্জন পরবর্তী নারীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার উদাহরণ তৈরি করতে পারে। কিন্তু ব্যক্তিগত সাহসকে বাস্তব সুযোগে রূপ দিতে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা জরুরি।
নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য ও হয়রানি প্রতিরোধ করা, সমান সুযোগ তৈরি করা, অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা রাখা এবং পেশাগত বিকাশের সুযোগ বাড়ানো—এসবই ক্ষমতায়নের অংশ। একই সঙ্গে আর্থিক স্বাধীনতার গুরুত্বও গভীর। নিজের আয়, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, আর্থিক সিদ্ধান্ত ও পেশাগত দক্ষতার ওপর নিয়ন্ত্রণ একজন নারীর জীবনের বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে বাস্তব স্বাধীনতা তৈরি করে।
শুধু নারীদের ‘সাহসী হও’ বলা তাই যথেষ্ট নয়। এমন একটি পরিবেশও তৈরি করতে হবে, যেখানে সাহস দেখানোর মূল্য অনিরাপত্তা, অপমান বা সুযোগ হারানো না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন, রাষ্ট্র এবং নাগরিক সমাজ—সবারই এখানে দায়িত্ব আছে।
নারীর ক্ষমতায়নকে নারী বনাম পুরুষের প্রতিযোগিতা হিসেবেও দেখা উচিত নয়। একজন নারীর সুযোগ বৃদ্ধি একজন পুরুষের মর্যাদা কমায় না। বরং যোগ্য মানুষের অংশগ্রহণের পরিসর বড় হলে প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয়, সিদ্ধান্তের বৈচিত্র্য বাড়ে এবং সমাজের সামগ্রিক সক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়।
আমার প্রত্যাশা: পরিচয়ের চেয়ে বড় হোক অবদান
আমি চাই, একজন চিকিৎসক হিসেবে আমার পেশাগত দায়িত্ব, একজন লেখক হিসেবে আমার চিন্তা এবং একজন নাগরিক হিসেবে আমার সামাজিক দায়বদ্ধতা একটি অর্থবহ উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকুক। স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা, সামাজিক সচেতনতা, তরুণদের অংশগ্রহণ এবং জনকল্যাণের মতো বিষয়গুলো নিয়ে শুধু কথা বলাই নয়, বাস্তবসম্মত উদ্যোগের অংশ হওয়াও জরুরি বলে আমি মনে করি।
সমাজে পরিবর্তন আনতে হলে সমস্যার কথা বলা প্রয়োজন, কিন্তু সেখানেই থেমে গেলে চলে না। সমস্যার কারণ বুঝতে হবে, তথ্য ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সমাধান খুঁজতে হবে এবং নিজের অবস্থান থেকে যতটুকু সম্ভব দায়িত্ব নিতে হবে। একটি ভালো ধারণার মূল্য তখনই বাড়ে, যখন তা মানুষের জীবনে বাস্তব কোনো উপকার তৈরি করে।
আমার কাছে সাফল্যের অর্থ শুধু নিজের জন্য একটি পরিচিত অবস্থান তৈরি করা নয়। সেই অবস্থানকে মানুষের কাজে লাগাতে পারা—এটাই বড়। আমি চাই, আমার পরিচয়ের আগে আমার কাজ কথা বলুক; আমার বক্তব্যে আবেগ থাকলেও তার ভিত্তি হোক যুক্তি; এবং আমার সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতাও থাকুক।
নিজের পথ নিজে নির্মাণ করার অর্থ আমার কাছে তাই কারও ছায়া থেকে পালানো নয়; বরং নিজের আলো তৈরি করা। সেই আলো যতটা নিজের পথ দেখাবে, ততটাই যদি অন্য কারও পথও কিছুটা পরিষ্কার করে—তবেই ব্যক্তিগত অর্জন বৃহত্তর অর্থ পায়।
শেষ কথা
একজন নারীর একা দাঁড়িয়ে থাকার সাহসের গল্প আসলে বিচ্ছিন্নতার গল্প নয়। এটি আত্মমর্যাদা, আত্মনির্ভরতা, শেখার বিনয়, সিদ্ধান্তের দায় এবং আবার শুরু করার সাহসের গল্প।
আমি এমন একটি সমাজ দেখতে চাই, যেখানে একজন নারী নিজের স্বপ্ন সম্পর্কে সচেতন হতে পারবেন, নিজের যোগ্যতা বিকাশের সুযোগ পাবেন এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাঁর কণ্ঠকে সম্মান করা হবে। তাঁর পেশাগত পরিচয়, সামাজিক অবদান বা নেতৃত্বের মূল্যায়ন হবে তাঁর কাজের ভিত্তিতে—প্রচলিত ধারণা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা অযৌক্তিক সামাজিক প্রত্যাশার ভিত্তিতে নয়।
আমি নিজের পথ নিজেই নির্মাণ করতে চাই—নিজের যোগ্যতায় নিজের অবস্থান তৈরি করতে চাই এবং সেই অবস্থানকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাতে চাই। কারণ একজন নারীর পথচলার সাফল্য শুধু তিনি কত দূর এগোলেন, তাতে নয়; তাঁর এগিয়ে যাওয়া অন্যদের জন্য কতটা সম্ভাবনা, সাহস এবং সুযোগ তৈরি করল—সেখানেও তার মূল্য।
বাংলাদেশের প্রতিটি নারী যেন চিকিৎসা, শিক্ষা, গবেষণা, রাজনীতি, ব্যবসা, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি কিংবা যেকোনো পেশায় নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান। তাঁরা যেন নিরাপদে মত প্রকাশ করতে পারেন, প্রয়োজন হলে ‘না’ বলতে পারেন, আবার প্রয়োজন হলে সহযোগিতার হাতও গ্রহণ করতে পারেন—নিজের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে।
আমার কাছে একা দাঁড়ানোর সাহস মানে নিজের শক্তিকে চিনে নেওয়া, নিজের সিদ্ধান্তের দায় গ্রহণ করা এবং নিজের পরিচয়কে নিজের কাজের মাধ্যমে নির্মাণ করার প্রত্যয়। আর সেই সাহস যখন জ্ঞান, মানবিকতা, যোগ্যতা ও জনকল্যাণের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন একজন নারীর ব্যক্তিগত পথচলা আর শুধু তাঁর নিজের গল্প থাকে না—তা হয়ে ওঠে একটি আরও ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও সম্ভাবনাময় সমাজ নির্মাণের অংশ।
ডা. উম্মে হানি পৃথ্বী
স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক, বগুড়া জেলা ছাত্রদল
সহসভাপতি, বাংলাদেশ ইয়ুথ থিংক ট্যাংক (BYTT)
ই-মেইল: [email protected]