EN ☀️
×

Follow Us

বাংলাদেশ

শ্রমিকদের আন্দোলনে ইন্ধন দিচ্ছে কারা!

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৩৫ পিএম

শ্রমিকদের আন্দোলনে ইন্ধন দিচ্ছে কারা!

ছবি: সংগৃহীত

অ অ

গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলনে রাজনৈতিক ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী-এমপি, দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যবসায়ী এবং ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। সরকারের একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে বলে জানিয়েছে দেশের অন্যতম একটা সংবাদমাধ্যম।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও দাবি করেছেন, আন্দোলনের আড়ালে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছেন নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাবেক জনপ্রতিনিধি ও কিছু শিল্প মালিক।

তবে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি ন্যায্য বলে মনে করছেন শ্রমিক ও শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের অভিযোগ, শুরুতে মজুরি বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলন হলেও পরে এর মধ্যে তৃতীয় পক্ষ ঢুকে পড়েছে। কোথাও কোথাও শ্রমিকদের জোর করে রাস্তায় নামানো হচ্ছে বলেও দাবি করেছেন তাঁরা।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গতকাল সোমবার সচিবালয়ে পোশাকশিল্প মালিকদের দুটি সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলন ও অস্থিরতার পেছনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের ইন্ধন রয়েছে। কিছু শিল্প মালিকও এতে জড়িত বলে সরকারের কাছে তথ্য ও প্রমাণ রয়েছে। 

তিনি বলেন, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে মজুরি বোর্ড গঠনের আলোচনা চলার মধ্যে পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা হচ্ছে বলে সরকার মনে করছে। এ ঘটনায় জড়িত শিল্প মালিক, শ্রমিক সংগঠন ও নেতাদের চিহ্নিত করা হয়েছে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে যেসব প্রতিষ্ঠানের নাম

সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার একটি প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, শ্রমিক আন্দোলনে ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগে আওয়ামী লীগের প্রায় ডজনখানেক নেতা ও দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মালিকানাধীন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে।

প্রতিবেদনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপ, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির সেপাল গ্রুপ এবং সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুস সালাম মুর্শেদীর এনভয় গ্রুপের নাম রয়েছে।

এ ছাড়া সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের রেনেসাঁ গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ইন্টারস্টফ অ্যাপারেল, সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর হামিদ গ্রুপের হামিদ সোয়েটার্স লিমিটেড এবং সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলামের ফেবিয়ান গ্রুপের ফেবিয়ান গার্মেন্টস লিমিটেডের নামও রয়েছে।

আওয়ামী লীগপন্থি হিসেবে পরিচিত কয়েকজন গার্মেন্টস ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠানের নামও এসেছে ওই প্রতিবেদনে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন তুসুকা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়জুর রহমান বাদল, ওয়েল গ্রুপের আব্দুস সালাম, নিপা গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. খসরু চৌধুরী, মানিকগঞ্জ-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও অ্যাক্সিস নিটওয়্যার্স লিমিটেডের মালিক জাহিদ আহমেদ টুলু এবং গিভেন্সি গ্রুপের মাসুমা খাতুন লিপা।

সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তালিকায় থাকা কয়েকজন প্রতিষ্ঠানের মালিক পলাতক, আবার কেউ কারাগারে রয়েছেন। পলাতক ব্যক্তিরা ফোনে নির্দেশনা দিচ্ছেন এবং কারাগারে থাকা ব্যক্তিদের প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা শ্রমিকদের উসকানি দিচ্ছেন বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। 

আন্দোলনে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের তৎপরতার দাবি

শ্রমিক আন্দোলনকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তৎপর হয়েছেন বলে দাবি করেছে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র। এ ঘটনায় কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীকে আটকের খবরও পাওয়া গেছে।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন ছবি ও ভিডিওতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতাকর্মীকে শ্রমিক আন্দোলনে দেখা গেছে।

এ বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজিবুল ইসলামের ফেসবুক পোস্টের বিষয়টিও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। গত রোববার দুপুর ২টা ১৭ মিনিটে একটি ছবি প্রকাশ করে তিনি লেখেন, ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কারও ওপর ভর করে ক্ষমতায় আসবে না। আমরা জনগণের শক্তি সঙ্গে নিয়ে কর্মসূচি দেব।’

এর ৫১ মিনিট আগে একটি ভিডিও পোস্ট করেন তিনি। এ ছাড়া দুপুর ১২টা ৫১ মিনিটে আরেকটি ভিডিও এবং সকাল ১০টা ৬ মিনিটে শ্রমিক আন্দোলন নিয়ে একটি পোস্ট দেন সাজিবুল। সেখানে তিনি লেখেন, ‘শ্রমিকের বেতন ৩০ হাজার টাকার বৃদ্ধির দাবিতে টানা চতুর্থ দিনের মতো আজকেও শ্রমিক আন্দোলন চলছে।’

এর আগে গত শনিবার সন্ধ্যা ৬টা ২৪ মিনিটে আগুন জ্বালানোর একটি ভিডিও প্রকাশ করেন তিনি। ওই ভিডিওতে ‘৩০ হাজার বেতন দে, নইলে গদি ছেড়ে দে’ স্লোগান শোনা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

শ্রমিক আন্দোলন ছিনতাইয়ের অভিযোগ

শ্রমিক নেতারা বলছেন, মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন শুরু হলেও পরে এর মধ্যে তৃতীয় কোনো পক্ষ ঢুকে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের জোর করে রাস্তায় নামানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাঁদের।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য পরিষদের চেয়ারম্যান মো. তৌহিদুর রহমান বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলন একটি পক্ষ ছিনতাই করেছে। সহিংস আন্দোলনের সঙ্গে প্রকৃত শ্রমিকেরা জড়িত নন বলে তাঁর দাবি।

তিনি বলেন, ‘দিনভর আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক করেছি। সেসব জায়গায় আমরা বলেছি, শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলন একটি পক্ষ ছিনতাই করেছে। এই সহিংস আন্দোলনের সঙ্গে প্রকৃত শ্রমিকরা জড়িত না। এ জন্য আমরা শ্রমিকদের কারও উসকানিতে পা না দিয়ে আন্দোলন ছেড়ে দ্রুত শান্তিপূর্ণভাবে কাজে ফেরার নির্দেশনা দিচ্ছি।’

বিজিএমইএর পরিচালক ও নতুন গঠিত মজুরি বোর্ডে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি এবিএম সামছুদ্দিন বলেন, কোনো কারখানার মালিক শ্রমিক আন্দোলনে ইন্ধন দিচ্ছেন কি না, সে বিষয়ে তাঁদের কাছে তথ্য নেই। তবে এমন অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কারখানাকে বিজিএমইএর পক্ষ থেকে সব ধরনের সেবা দেওয়া বন্ধ করা হবে। 

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে কয়েকটি কারখানার মালিকের ইন্ধনের কথা বলা হলেও তাঁরা এখনো কোনো তালিকা পাননি। এ বিষয়ে সরকারের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন তাঁরা।

কারখানা বন্ধের তালিকা চেয়েছে সরকার

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে যেসব কারখানা বন্ধ রাখা হয়েছে, সেগুলোর মালিকদের তালিকা চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অস্থিরতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখা শ্রমিক সংগঠন ও নেতাদের নামও দিতে বলা হয়েছে।

তিনি বলেন, সরকার কোনো শিল্প-কারখানা বন্ধ হোক, তা চায় না। শ্রমিকদের ন্যায্য স্বার্থ রক্ষা এবং শিল্পের উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা জরুরি। শ্রমিক আন্দোলনের নামে যারা সহিংসতা বা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থান নেবে।

সীমান্তের ওপার থেকে কেউ রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে দেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করলে তা প্রতিহত করা হবে বলেও জানান তিনি।

সূত্র: সময়ের আলো

আরও পড়ুন