EN ☀️
×

Follow Us

বাংলাদেশ

সুন্দরবনে এলএনজি টার্মিনাল ভাবনা, হুমকিতে বনাঞ্চল, জলজ প্রাণী

ডেইলি সান রিপোর্ট, খুলনা

প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:৩৩ পিএম

সুন্দরবনে এলএনজি টার্মিনাল ভাবনা, হুমকিতে বনাঞ্চল, জলজ প্রাণী

প্রচলিত ওপেন কাট পদ্ধতিতে পাইপলাইন বসালে মাটির নিচে থাকা ম্যানগ্রোভের শ্বাসমূল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে মত বন বিশেষজ্ঞদের। ছবি: সংগৃহীত

অ অ

‎দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগের মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে সুন্দরবনসংলগ্ন আকরাম পয়েন্টে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাবনা। প্রস্তাবিত টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাবনা ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য নিয়ে।

টার্মিনাল, পাইপলাইন ও বাড়তি জাহাজ চলাচলের প্রভাব কতটা হবে, তা এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে স্পষ্ট নয়। তাই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জ্বালানি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্ভাবনা বিবেচনার পাশাপাশি সুন্দরবনের পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

‎‎শিবসা ও পশুর নদের মিলনস্থলের কাছে আকরাম পয়েন্টের দুই কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে সুন্দরবনের দক্ষিণ ও পূর্ব বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য। দুটি অভয়ারণ্যই ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ।

অন্য সম্ভাব্য স্থান নলিয়ান গ্রাম সুন্দরবনের অংশ না হলেও বনসংলগ্ন প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার মধ্যে অবস্থিত। ফলে সম্ভাব্য প্রকল্পের প্রভাব মূল্যায়নে টার্মিনালের নির্দিষ্ট স্থান ছাড়াও পাইপলাইন, জাহাজ চলাচল ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

‎‎গত আগস্টে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল আকরাম পয়েন্ট, শিবসা নদী, সুন্দরবন ও মোংলা বন্দর পরিদর্শন করে। পরে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, আকরাম পয়েন্টে ভাসমান এলএনজি স্টেশন স্থাপন করে প্রায় ২৩ কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস মোংলায় নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া খুলনার হিরণ পয়েন্ট, মোংলা ও পায়রায় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে সরকার।

‎‎দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শিল্পায়ন, মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ। এ অঞ্চলে গ্যাসের প্রাপ্যতা বাড়লে শিল্পকারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে এসব সম্ভাব্য সুবিধা বাস্তবে কতটা অর্জিত হবে, তা নির্ভর করবে প্রকল্পের ব্যয়, গ্যাস পরিবহনের সক্ষমতা, চাহিদা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতার ওপর।

‎‎বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নে শিল্পায়ন প্রয়োজন। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই ও পরিবেশগত সমীক্ষা করা হবে। সবকিছু অনুকূলে থাকলেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, এ অবস্থায় প্রকল্পটির অর্থনৈতিক সুবিধা ও পরিবেশগত ব্যয় একই কাঠামোয় মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি আকরাম পয়েন্টের বাইরে অন্য স্থানগুলোতে টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাবনা, ব্যয় ও পরিবেশগত প্রভাব তুলনা করলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হতে পারে।

‎‎সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ, নদী, কাদাচর ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থল পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। টার্মিনাল নির্মাণ, পাইপলাইন স্থাপন, নদী খনন ও বড় জাহাজের চলাচল এসব পরিবেশগত উপাদানের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন বন ও পরিবেশবিশেষজ্ঞরা।

‎‎নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বনবিশেষজ্ঞের মতে, প্রচলিত ওপেন কাট পদ্ধতিতে পাইপলাইন বসালে মাটির নিচে থাকা ম্যানগ্রোভের শ্বাসমূল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে প্রকৃত ঝুঁকি নির্ভর করবে পাইপলাইনের সুনির্দিষ্ট পথ, নির্মাণপদ্ধতি ও ক্ষতি কমানোর ব্যবস্থার ওপর। বিকল্প প্রযুক্তির ব্যয় ও কার্যকারিতাও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

‎‎বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এম ফিরোজ আহমেদ মনে করেন, বনের মধ্যে অবকাঠামো নির্মাণের কিছু পরিবেশগত প্রভাব থাকবেই। তাঁর মতে, সুন্দরবনের বিশ্ব ঐতিহ্যগত গুরুত্ব বিবেচনায় প্রকল্পের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত।

‎‎বড় জাহাজ চলাচল বাড়লে তেল নিঃসরণ, শব্দ ও কম্পন, দুর্ঘটনা এবং জলজ প্রাণীর আবাসস্থলে ব্যাঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। টার্মিনালের কার্যক্রমে নদীর পানির তাপমাত্রা পরিবর্তন বা দূষণ ঘটলে মাছের ডিম ও পোনা এবং অন্যান্য জলজ প্রাণীও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে এসব প্রভাবের মাত্রা নির্ধারণে প্রকল্পভিত্তিক বৈজ্ঞানিক তথ্য, মৌসুমি উপাত্ত ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

‎‎খুলনা বন সংরক্ষকের কার্যালয় থেকে বন অধিদপ্তরে পাঠানো এক চিঠিতে সম্ভাব্য টার্মিনাল নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। চিঠিতে ম্যানগ্রোভের শ্বাসমূল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, নদীর তলদেশ খননের কারণে দূষিত পদার্থ ছড়িয়ে পড়া, ডলফিনের আবাসস্থলে ব্যাঘাত এবং বাঘ, হরিণসহ বন্য প্রাণীর স্বাভাবিক বিচরণ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তুলে ধরা হয়েছে।

জ্বালানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক উন্নয়ন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সুন্দরবনের পরিবেশগত সুরক্ষা ও বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা রক্ষাও জাতীয় স্বার্থের অংশ। তাই প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে একদিকে উন্নয়নের সম্ভাবনা, অন্যদিকে পরিবেশগত ঝুঁকি— দুটিকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়াই হবে সবচেয়ে দায়িত্বশীল পথ।

‎বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী জানিয়েছেন, টার্মিনাল নির্মাণ বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে তাঁদের কিছু জানানো হয়নি। এই অবস্থায় প্রকল্পের পরবর্তী পর্যায়ে বন অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর, জ্বালানি বিভাগ, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত মতামত নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এতে শুধু সম্ভাব্য ক্ষতি চিহ্নিত করাই নয়, প্রয়োজন হলে ক্ষতি কমানোর প্রযুক্তি, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং পরিবেশগত পর্যবেক্ষণের শর্তও নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।

‎‎সুন্দরবনকে ঘিরে বৃহৎ শিল্পায়নের প্রভাব নিয়ে ইউনেসকো আগে থেকেই উদ্বেগ জানিয়েছে।

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে ২০১৬ সালে ইউনেসকো ও প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএনের মূল্যায়নে প্রকল্পটিকে সুন্দরবনের জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল।

২০১৮ সালেও সুন্দরবনের কৌশলগত পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের আগে নতুন শিল্পকারখানার অনুমোদন না দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করা হয়।

আরও পড়ুন