EN ☀️
×

Follow Us

বাংলাদেশ

গোষ্ঠীস্বার্থে গাজীপুর-বিমানবন্দর বিআরটি প্রকল্প বাতিল অগ্রহণযোগ্য, চালুর দাবি আইপিডির

ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা

প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৯ পিএম

গোষ্ঠীস্বার্থে গাজীপুর-বিমানবন্দর বিআরটি প্রকল্প বাতিল অগ্রহণযোগ্য, চালুর দাবি আইপিডির
অ অ

গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। সংস্থাটি বলেছে, প্রকল্পটির প্রায় ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এক যুগের বেশি সময় ধরে মানুষ ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। এ পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা সরকারি অর্থ ব্যয় হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রকল্পটি বাতিল না করে অবশিষ্ট কাজ শেষ করে চালু করা অধিকতর যৌক্তিক ও জনস্বার্থসম্মত।

আইপিডির মতে, বেসরকারি বাসমালিক ও ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারীদের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বিআরটি প্রকল্প বাতিল করে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের উদ্যোগ রাষ্ট্রীয় সম্পদের কার্যকর ব্যবহার, টেকসই পরিবহন পরিকল্পনা ও গণপরিবহনবান্ধব নগরায়ণের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। পরিকল্পনাবিদদের দাবি ও গাজীপুরবাসীর চাহিদা উপেক্ষা করে প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্ত সরকারের গণপরিবহনভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার অঙ্গীকারকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

আইপিডি এক বিবৃতিতে বলেছে, বর্তমান সরকার একদিকে বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজিংয়ের মাধ্যমে ঢাকায় বাসভিত্তিক গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। অন্যদিকে বিপুল অর্থ ব্যয়ে প্রায় সম্পন্ন একটি বিআরটি প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের এই দুই সিদ্ধান্তের মধ্যে নীতিগত বৈপরীত্য রয়েছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে। অথচ আরও এক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করলে বিআরটি প্রকল্পটি চালু করা যেত বলে মনে করে আইপিডি। মেট্রোরেলের তুলনায় বিআরটি প্রকল্পে বিনিয়োগও অনেক কম। তাই তুলনামূলক কম ব্যয়ে চালু করা সম্ভব এমন একটি বিদ্যমান গণপরিবহন প্রকল্প বাতিলের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি।

পান্থকুঞ্জ পার্ক ও হাতিরঝিলের ক্ষতি করে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের একটি র‍্যাম্প নির্মাণের প্রসঙ্গও তুলে ধরেছে আইপিডি। সংস্থাটির অভিযোগ, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব চুক্তির দোহাই দিয়ে পরিবেশকর্মী, পেশাজীবী ও নাগরিকদের দীর্ঘদিনের প্রতিবাদ উপেক্ষা করা হয়েছে। অথচ গাজীপুর-এয়ারপোর্ট বিআরটি প্রকল্প বাতিলের ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি যৌথ অর্থায়ন কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

আইপিডির দাবি, অবকাঠামো প্রকল্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনস্বার্থ, পরিকল্পনা ও পরিবেশগত বিষয়গুলোর চেয়ে কিছু আমলা ও স্বার্থান্বেষী মহলের স্বার্থ প্রাধান্য পাচ্ছে। একদিকে চুক্তি ও প্রকল্পের ধারাবাহিকতার যুক্তিতে পরিবেশগত উদ্বেগ সত্ত্বেও নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে বিপুল অর্থ ব্যয়ে প্রায় সম্পন্ন গণপরিবহন অবকাঠামো বাতিল করা হচ্ছে। সংস্থাটির মতে, এ ধরনের বৈপরীত্য গ্রহণযোগ্য নয়।

বিআরটি প্রকল্পের নির্মাণকাজের কারণে গত প্রায় এক দশক ধরে গাজীপুর ও আশপাশের এলাকার মানুষ যানজট, যাতায়াতে দুর্ভোগ, সময়ের অপচয় ও অর্থনৈতিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন বলে উল্লেখ করেছে আইপিডি। প্রকল্পটি বাতিল করা হলে তাঁদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি অর্থহীন হয়ে পড়বে। গাজীপুর থেকে ঢাকায় প্রতিদিন যাতায়াতকারী বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য দ্রুত, নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী গণপরিবহন নিশ্চিত করতে প্রকল্পটি চালু করা প্রয়োজন বলে মনে করে সংস্থাটি।

আইপিডি বলেছে, বিআরটি প্রকল্পের নকশা, পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থাপনায় থাকা ত্রুটি ও ব্যর্থতা নিরপেক্ষ কারিগরি মূল্যায়নের মাধ্যমে চিহ্নিত করতে হবে। এরপর প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে হবে। সরকারি অর্থের অপচয়, দীর্ঘসূত্রতা ও জনদুর্ভোগের জন্য দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা তদন্ত করে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

সংস্থাটির মতে, প্রকল্পের ব্যর্থতার দায় এড়িয়ে প্রকল্পটিই বাতিল করে দেওয়া হলে ভবিষ্যতের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও অপচয় নিরুৎসাহিত হবে না। বরং দায়মুক্তির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

বিআরটি প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্তে কার স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আইপিডি। সংস্থাটির আশঙ্কা, বিদ্যমান বাস পরিচালনাব্যবস্থার সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত এবং ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভর পরিবহনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ঝুঁকি গণপরিবহনের জন্য নির্ধারিত অবকাঠামো বাতিলের মাধ্যমে আরও বাড়তে পারে। এতে সামগ্রিক জনস্বার্থ ও জনকল্যাণ ব্যাহত হবে।

এ পরিস্থিতিতে বিআরটি প্রকল্প চালুর লক্ষ্যে পাঁচটি সুপারিশ করেছে আইপিডি।

১. গাজীপুর-এয়ারপোর্ট বিআরটি প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত অবিলম্বে প্রত্যাহার করে প্রকল্পটি চালুর উদ্যোগ নিতে হবে।

২. অবশিষ্ট কাজ শেষ করা, নকশাগত ত্রুটি সংশোধন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও প্রয়োজনীয় কারিগরি সংস্কারের জন্য বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে প্রকল্পটি চালু করতে হবে।

৩. প্রকল্পের নকশা, বাস্তবায়ন, ব্যয় বৃদ্ধি ও দীর্ঘসূত্রতার কারণ অনুসন্ধানে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

৪. প্রকল্পের ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পরও তা বাতিলের পেছনে সক্রিয় সরকারি কর্মকর্তা ও স্বার্থান্বেষী মহলকে চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

৫. গণপরিবহনকে অগ্রাধিকার দিয়ে ঢাকা-গাজীপুর করিডরে বিআরটি, কমিউটার রেল, পদচারীবান্ধব অবকাঠামো ও অন্যান্য পরিবহনব্যবস্থার মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে হবে।

আইপিডির মতে, ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর গণপরিবহন প্রকল্প বাতিল করা উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে। রাষ্ট্রীয় অর্থে নির্মিত অবকাঠামো পরিত্যক্ত বা অকার্যকর হতে দেওয়া নয়, বরং প্রয়োজনীয় সংশোধনের মাধ্যমে জনস্বার্থে ব্যবহার নিশ্চিত করাই সরকারের দায়িত্ব।

গাজীপুরবাসীর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ও গণপরিবহনভিত্তিক টেকসই নগরায়ণের স্বার্থে বিআরটি প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে দ্রুত প্রকল্পটি চালুর কার্যকর উদ্যোগ নিতে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।

আরও পড়ুন