গণপিটুনিতে হতাহতের পরিসংখ্যান
পুলিশ বলছে কমেছে, মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে ৪ গুণ বেড়েছে
মাহবুব আলম ও শামসুল আরিফিন খান সানি, ঢাকা
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
• পুলিশের হিসাবে গত ৯ মাসে নিহত ৪০, আসকের তথ্যে ১৭১ ও এইচআরএসএসের ১৮৭ জন
• সরকার মোট অপরাধের ২৭ শতাংশ প্রকাশ করে, আড়ালে থেকে যায় ৭৩ শতাংশ
গণপিটুনিতে (মব ভায়োলেন্স) হতাহতের সংখ্যা নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তর ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাবে বড় ধরনের অসঙ্গতি দেখা গেছে। পুলিশের হিসাবে, চলতি বছরের (২০২৬) প্রথম নয় মাসে সারা দেশে গণপিটুনিতে ৪০ জন নিহত হয়েছেন। তবে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে এ সংখ্যা ১৭১। আর হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) হিসাবে নিহত হয়েছেন ১৮৭ জন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পুলিশ সদর দপ্তরের (পিএইচকিউ) তৈরি পরিসংখ্যান পাঠায়। এতে বলা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে সারা দেশে ৬৩টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪০ জন।
অন্যদিকে আসকের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে গণপিটুনিতে অন্তত ১৭১ জন নিহত হয়েছেন। এইচআরএসএসের হিসাবে, এ সময়ে ৩৯৮টি গণপিটুনির ঘটনায় অন্তত ১৮৭ জন নিহত ও ৪০১ জন আহত হয়েছেন।
এইচআরএসএসের তথ্য বলছে, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বিবাদ, আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, ধর্ম অবমাননা, ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টাসহ বিভিন্ন অভিযোগে এসব গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে।
পিএইচকিউর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১০৭টি ঘটনায় ৬৩ জন নিহত ও ৮২ জন আহত হয়েছিলেন। সেই তুলনায় চলতি বছরে ঘটনা কমেছে ৪৪টি, মৃত্যু ২৩ ও আহতের সংখ্যা কমেছে ১৭টি।
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। আসকের হিসাবে, গত বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গণপিটুনিতে অন্তত ১৫২ জন নিহত হয়েছিলেন। এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে ২৩৯টি ঘটনায় অন্তত ১৩০ জন নিহত ও ২১২ জন আহত হয়েছিলেন।
আসক জানিয়েছে, ১০টি জাতীয় দৈনিক, কয়েকটি অনলাইন পোর্টাল ও নিজস্ব সূত্রের ভিত্তিতে তারা এসব তথ্য সংগ্রহ করেছে।
পুলিশের তথ্য শুধু মামলা ও অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে তৈরি নয়। সংশ্লিষ্ট সব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়। এ তথ্যে ভুলের কোনো সুযোগ নেইএআইজি কামারুম মুনিরা
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম ডেইলি সানকে বলেন, ১৬টি জাতীয় দৈনিকের সংবাদ এবং স্বেচ্ছাসেবকদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাদের পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়েছে।
পুলিশ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যের এই বড় ব্যবধান প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পুলিশের মুখপাত্র ও সহকারী মহাপুলিশ পরিদর্শক (এআইজি) কামারুম মুনিরা বলেন, ‘আমরা যে তথ্য দিয়েছি, সেটিই নির্ভরযোগ্য; এর বাইরে অন্য কোনো তথ্য নেই। অন্য সংস্থাগুলো কোথা থেকে তাদের তথ্য পেয়েছে, সেটি তাদের বিষয়। তারাই ভালো ব্যাখ্যা দিতে পারবে, কীভাবে তারা তথ্য সংগ্রহ করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের তথ্য শুধু মামলা ও অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে তৈরি নয়। সংশ্লিষ্ট সব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই আমরা পরিসংখ্যান তৈরি করেছি। আমাদের তথ্যে ভুলের কোনো সুযোগ নেই।’
সরকার মোট অপরাধের মাত্র ২৭ শতাংশ প্রকাশ করে, বাকি ৭৩ শতাংশ সরকারি হিসাবের বাইরে থেকে যায়অপরাধ বিশ্লেষক ড. ওমর ফারুক
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. ওমর ফারুক ডেইলি সানকে বলেন, ‘সরকার সাধারণত প্রকৃত অপরাধের চেয়ে কম সংখ্যা প্রকাশ করে থাকে।’
তিনি বলেন, ‘এ চর্চা নতুন নয়; দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে, শুধু বাংলাদেশে নয়, অন্যান্য দেশেও। আমাদের একটি গবেষণায় আমরা দেখেছি, সরকার মোট অপরাধের মাত্র ২৭ শতাংশ প্রকাশ করে, বাকি ৭৩ শতাংশ সরকারি হিসাবের বাইরে থেকে যায়।’
‘গণপিটুনি এমন একটি বিষয়, যা সরাসরি সরকারের কার্যক্ষমতা ও জবাবদিহির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই সরকারের পক্ষ থেকে কম সংখ্যা দেখানো স্বাভাবিক। আমি মনে করি, অন্য মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সংকলিত তথ্য অনেকাংশেই বিশ্বাসযোগ্য। বাস্তবে অপরাধের সংখ্যা আরও বেশি। সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে মানুষ প্রায়ই ঘটনা জানাতে চায় না, ফলে অনেক ঘটনা আমাদের অজানাই থেকে যায়’— বলেন ড. ওমর ফারুক।
প্রকাশ্য দিবালোকে নাগরিকরা যখন আইন এড়িয়ে কোনো সন্দেহভাজনকে হত্যা করে, তখন তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার ইঙ্গিত দেয়অপরাধ বিশ্লেষক ড. তাওহিদুল হক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তাওহিদুল হক ডেইলি সানকে বলেন, ‘গণপিটুনির স্বাভাবিকীকরণ আমাদের ভেঙে পড়া ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার একটি স্পষ্ট অভিযোগপত্র।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রকাশ্য দিবালোকে নাগরিকরা যখন আইন এড়িয়ে কোনো সন্দেহভাজনকে হত্যা করে, তখন তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার ইঙ্গিত দেয়।’