রাশিয়া- ইউক্রেন যুদ্ধ
শত্রুপক্ষের অবস্থান শনাক্তে বাংলাদেশিদের ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার
চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশ থেকে ৩০ জনকে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার পর দেশটির সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে তিনটি ট্রাভেল এজেন্সির বিরুদ্ধে
বিবিসি বাংলা
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৭ এএম
চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশ থেকে ৩০ জনকে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার পর দেশটির সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে তিনটি ট্রাভেল এজেন্সির বিরুদ্ধে। তাদের মধ্যে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে ২০ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশের বিশেষ ইউনিট স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। আহত হয়ে দেশে ফিরেছেন ঝিনাইদহের রাজন হোসেন। তার অভিযোগ, যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করার ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
রাজন হোসেনের বাড়ি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলায়। তার ভাষ্য, নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়ার কথা বলে গত মে মাসে তাকে রাশিয়ায় পাঠায় জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি ট্রাভেল এজেন্সি। সেখানে পৌঁছানোর পর তার পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়।
প্রথমে তিন সপ্তাহ প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে রেখে অস্ত্র চালানোসহ যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় তাকে। এরপর পাঠানো হয় ইউক্রেনের সম্মুখসারিতে। রাজনের দাবি, তার সঙ্গে আরও ২৯ বাংলাদেশিকে যুদ্ধে পাঠানো হয়েছিল। প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় তাদের ১৭ জন নিহত হন। পরে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়।
চার দিন না খেয়ে চার কিলোমিটার পথ
সম্মুখসারিতে যাওয়ার দুই দিনের মাথায় ড্রোন হামলায় রাজনের কোমর ও পা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার দুই পা অবশ হয়ে যায়। ওয়াকিটকির মাধ্যমে রুশ সেনাদের কাছে সাহায্য চাইলেও কেউ তাকে উদ্ধার করতে আসেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পরে হাত ও বুকে ভর দিয়ে অবশ পা টেনে প্রায় চার দিনে চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সেনা ক্যাম্পে পৌঁছান রাজন। এ সময় চার দিন তিনি খাবার ও পানি পাননি বলে জানান।
ক্যাম্পে পৌঁছানোর পর চিকিৎসার বদলে প্রথমে অস্ত্র হারানোর অভিযোগে তাকে মারধর করা হয় বলে দাবি করেন তিনি। পরে ক্যাম্পের অস্থায়ী হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। সেখানে থাকা অবস্থায় এক সেনার কথায় তিনি বুঝতে পারেন, বাংলাদেশিদের যুদ্ধক্ষেত্রে ঝুঁকির মধ্যে রেখে প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা করা হচ্ছে।
পরে তাকে রাশিয়ার একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। কয়েক সপ্তাহ চিকিৎসা নেওয়ার পর মস্কোয় বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন রাজন। দূতাবাসের সহায়তায় আগস্টের শেষ দিকে দেশে ফেরেন তিনি।
তিন এজেন্সির বিরুদ্ধে তদন্ত
দেশে ফেরার পর রাজন ও তার পরিবার জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের বিরুদ্ধে মামলা করেন। অভিযোগ তদন্তে নেমে এসআরবি জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের পাশাপাশি আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের আরও দুটি এজেন্সির সন্ধান পায়।
এসআরবি-১০-এর অধিনায়ক ও পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, এসব এজেন্সি কয়েক মাসে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ৩০ জনকে চাকরির কথা বলে রাশিয়ায় পাঠিয়েছে। প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।
তদন্তকারীদের ভাষ্য, এ কাজে ইগর নামের এক রুশ নাগরিক এবং জুলিয়া নামের কিরগিজস্তানের এক নারী জড়িত বলে তথ্য পাওয়া গেছে। বাংলাদেশি এজেন্সিগুলোর মূল সমন্বয়কারী হিসেবে অভিযুক্ত জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান ও আবু তাহের লেন্টুকে গ্রেপ্তার করেছে এসআরবি। অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
এসআরবির দাবি, যুদ্ধক্ষেত্রে ৩০ বাংলাদেশিকে তিনটি দলে ভাগ করে মোতায়েন করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। কয়েকজন ভুক্তভোগীর বক্তব্যের ভিত্তিতে তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করতে তাদের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পাঠানো হয়ে থাকতে পারে।
ছেলের মরদেহ ফেরত চান বাবা
নিহতদের মধ্যে লালমনিরহাটের পাটগ্রামের আব্দুল্লাহ আল মামুনও রয়েছেন বলে তার পরিবার জানিয়েছে। ছেলেকে রাশিয়ায় পাঠাতে গরু-ছাগল বিক্রি, জমি বন্ধক ও ঋণ করেছিলেন তার বাবা আব্দুল মাজিদ। এখন ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার আকুতি জানিয়েছেন তিনি।
একই জেলার আল আমিন ইসলাম নামের আরেক তরুণ এখনো রাশিয়ায় আটকে আছেন বলে জানিয়েছে তার পরিবার। তাকে দেশে ফেরাতে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে যোগাযোগ করেও সফল হননি স্বজনেরা।
বিবিসি জানিয়েছে, বিষয়গুলো নিয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। রুশ সরকার এসব অভিযোগ সম্পর্কে অবগত কি না, তা-ও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এর আগে বিবিসিকে জানিয়েছিলেন, রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধে অংশ নেওয়া এবং নিখোঁজ স্বজনদের বিষয়ে গত এক বছরে তিন ডজনের বেশি আবেদন পেয়েছেন তাঁরা। রুশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে ছয়জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা গেলেও তাঁদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে নিহত বলে জানা যাওয়া ২০ বাংলাদেশির মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা নিয়েও এখন অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তাঁদের স্বজনেরা।