বাংলাদেশে নতুন জঙ্গি সংগঠনের পরিকল্পনা, সতর্ক সরকার
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর তেজগাঁও কলেজের মসজিদ থেকে আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণে ‘ইতেহাদুল উম্মাহ’ নামে একটি উগ্রবাদী সংগঠন গঠনের পরিকল্পনার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সংগঠনটির লক্ষ্য ছিল খেলাফত প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে উগ্রবাদী তৎপরতায় সংগঠিত হওয়া। এ পরিকল্পনার সঙ্গে বিদেশি কোনো জঙ্গি সংগঠনের যোগাযোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা।
সরকার বলছে, জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদী তৎপরতা দমনে তাদের অবস্থান কঠোর।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, তেজগাঁও থেকে আটক ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণ ও জিজ্ঞাসাবাদে ‘ইতেহাদুল উম্মাহ’ নামে সংগঠন গঠনের পরিকল্পনার তথ্য পাওয়া গেছে। এ ধরনের উগ্রবাদী তৎপরতার বিষয়ে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি রয়েছে বলেও জানান তিনি।
সম্প্রতি রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় তেজগাঁও কলেজের মসজিদ থেকে উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে ২৩ জনকে আটক করে পুলিশ। গত ১৮ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার জুমার নামাজের পর মসজিদে একটি বৈঠক চলার সময় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এ অভিযানের কথা সাংবাদিকদের জানান।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিদের পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা হয়। পরে তাঁদের মধ্যে ১২ জনের বিরুদ্ধে উগ্রবাদী সংগঠন গঠন ও নাশকতার পরিকল্পনা-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার কথা জানায় পুলিশ। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেওয়া হয়। অন্য ১১ জনের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য তথ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয় বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান। এ ঘটনায় অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) ও কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য যাচাই ও তদন্ত করে।
আটকের ঘটনাটি দেশে উগ্রবাদী তৎপরতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। এর আগে জাতিসংঘের পক্ষ থেকেও আল-কায়েদাসহ বিভিন্ন জঙ্গি নেটওয়ার্কের বিষয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে সতর্ক করার তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রের বরাতে জানা যায়, তেজগাঁও কলেজের মসজিদে বৈঠক চলার সময় আটক ব্যক্তিদের মোবাইল ফোন ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে উগ্রবাদী কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং তাঁদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়গুলো তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
এদিকে, তেজগাঁওয়ে আটকের পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর, শনিবার রাজধানীর মিরপুর ও মধ্য বাড্ডায় তিনটি বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে একটি পিকআপেও আগুন দেওয়া হয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের খবরও পাওয়া যায়। পরদিন রোববারও কয়েকটি এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার পেছনে কারা জড়িত, তা তদন্তসাপেক্ষ।
প্রতিবেদনে গোয়েন্দাদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, নির্বাচনে পরাজিত কোনো শক্তি দেশকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে মদদ দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এ দাবির পক্ষে তদন্তের ফল বা স্বতন্ত্র প্রমাণ প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই দেশে ধর্মীয় মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদী তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের কথা জানানো হয়।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এর আগে বলেছিলেন, দেশে জঙ্গি তৎপরতা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে সরকার কাজ করবে। তবে বিরোধী পক্ষ জঙ্গিবাদীদের মদদ দিচ্ছে—এমন অভিযোগও প্রতিবেদনে রয়েছে। এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য উল্লেখ করা হয়নি।
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন কারাগার থেকে বন্দি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মোতাহের হোসেনের বক্তব্য অনুযায়ী, পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের মধ্যে জঙ্গিবাদ-সংক্রান্ত একাধিক মামলার আসামি ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৯ জনের বিরুদ্ধে একাধিক জঙ্গিবাদী মামলা ছিল। পরে তাঁদের ছয়জনকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বাকি তিনজনের সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া নরসিংদী কারাগার থেকে অন্তত ২৭ জন জঙ্গি পালিয়ে যাওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে রয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে অন্তত ৬৯০ জন বন্দি পালিয়ে যায় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাঁদের সবাই এখনো নিখোঁজ—এমন তথ্য নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। কারাগার থেকে পালানো ব্যক্তিদের কেউ কেউ নতুন করে উগ্রবাদী তৎপরতায় যুক্ত হতে পারে বলে প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার মাধ্যমে আতঙ্ক সৃষ্টির লক্ষ্য রয়েছে বলেও সেখানে দাবি করা হয়েছে।
তেজগাঁও থেকে আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে ‘ইতেহাদুল উম্মাহ’ নামে সংগঠন গড়ে তোলার পরিকল্পনার তথ্য পাওয়ার কথা জানানো হলেও সংগঠনটি বাস্তবে কতটা সক্রিয় ছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার পর উগ্রবাদ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য অনুযায়ী, পরিস্থিতিকে উগ্রবাদের নতুন উত্থান হিসেবে চিহ্নিত করার মতো তথ্য এখনো নেই; সম্ভাব্য তৎপরতার ওপর নজরদারি চলছে। অন্যদিকে, অতীতের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে উগ্রবাদ দমনে আগাম পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেছেন, বাংলাদেশে উগ্রবাদ নতুন কোনো বিষয় নয়। দীর্ঘদিন ধরেই এ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গত প্রায় দুই বছরে এ ধরনের গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড কতটা কার্যকরভাবে নজরদারিতে ছিল, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তাঁর মতে, কিছু আলামত থেকে বোঝা যাচ্ছে, এসব গোষ্ঠী নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একজন ওয়ারেন্ট অফিসারের সঙ্গে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, চলতি বছর চট্টগ্রামের একটি ঘাঁটি থেকে নিখোঁজ হওয়া ওই কর্মকর্তার সন্ধান টিটিপির একটি আস্তানায় পাওয়া গেছে।
পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ওই সদস্য টিটিপির পক্ষে কাজ করছিলেন। এ ঘটনায় সশস্ত্র বাহিনীর ভেতরে উগ্রপন্থী নেটওয়ার্কের উপস্থিতি নিয়ে তদন্ত শুরুর কথাও বলা হয়েছে। তবে এসব দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে নেই।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিশুদের মধ্যে উগ্রবাদী ধারণা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।



-69fa11881b80c.jpg)