নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে দক্ষিণাঞ্চলের নদীতে ইলিশ শিকার, বিক্রি প্রকাশ্যে
ডেইলি সান রিপোর্ট, বরিশাল
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৩ পিএম
ছবি: ডেইলি সান
মা ইলিশ রক্ষায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা চলছে। কিন্তু বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন নদীতে থামছে না ইলিশ শিকার। দিন-রাত নির্বিচারে ধরা হচ্ছে মা ইলিশ। সেই মাছ আবার বিক্রি হচ্ছে প্রকাশ্যে। প্রশাসনের অভিযান এড়াতে নদীতে মাছ শিকারের স্থান থেকে দুই থেকে চার কিলোমিটার দূরে পাহারায় রাখা হচ্ছে লোকজন। অভিযানের খবর পেলেই মুঠোফোনে সতর্ক করা হচ্ছে জেলেদের। ফলে অভিযান পরিচালনাকারী দল পৌঁছানোর আগেই জাল গুটিয়ে খাল ও নদীর শাখায় সরে যাচ্ছেন তারা।
এদিকে মেঘনা নদীর অভয়াশ্রমে বাঁশ, টেঁটাসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে সংঘবদ্ধ একটি চক্রের ইলিশ শিকারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযানের সময় কোস্ট গার্ড ও নৌ পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। প্রতিদিনই চক্রটির সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবার অভিযানে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টার যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন সারা দেশে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুত ও বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তবে এই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে দক্ষিণাঞ্চলের পদ্মা, মেঘনা, তেঁতুলিয়া, গজারিয়া, কালাবদর, আড়িয়াল খাঁ, কীর্তনখোলা, সন্ধ্যা ও সুগন্ধাসহ বিভিন্ন নদ-নদীতে ইলিশ শিকার চলছে।
ভোলার শিবপুর, ধনিয়া ও তুলাতলী, মেহেন্দীগঞ্জের ভাসানচর, দক্ষিণ উলানিয়ার লালগঞ্জ ও হাজিরহাট এবং বরিশাল সদর উপজেলার শায়েস্তাবাদ ও চরমোনাইসহ বিভিন্ন নদীতীরবর্তী এলাকায় নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ধরা ইলিশ বিক্রি হচ্ছে। এই অবৈধ কারবারে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মদদ রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
অভিযানের আগেই সতর্কবার্তা
নদীতে ইলিশ শিকার বন্ধে প্রশাসনের অভিযান চললেও অনেক ক্ষেত্রে অভিযানের খবর আগেই পেয়ে যাচ্ছেন জেলেরা। মাছ ধরার স্থান থেকে দুই থেকে চার কিলোমিটার দূরে পাহারায় রাখা হয় লোকজন। কোস্ট গার্ড, নৌ পুলিশ কিংবা মৎস্য বিভাগের অভিযানের দল এলাকায় প্রবেশের আগেই এসব পাহারাদার জেলেদের সতর্ক করে দেন।
অভিযানের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে মুঠোফোনে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। এরপর জেলেরা দ্রুত জাল গুটিয়ে নৌকা নিয়ে আশপাশের সরু খাল, শাখানদী কিংবা দুর্গম এলাকায় সরে যান। এতে অভিযানের সময় তাদের আটক করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অভয়াশ্রমে বাঁশ-টেঁটা নিয়ে শিকার
দক্ষিণাঞ্চলের মেঘনা নদীর অভয়াশ্রমে সংঘবদ্ধভাবে ইলিশ শিকারের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, একটি চক্রের সদস্যরা বাঁশ, টেটা ও অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে নদীতে নামেন। অভিযানের মুখে পড়লে তারা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এ সময় কোস্ট গার্ড ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটছে।
জেলেদের ভাষ্য, চক্রটির সদস্যরা মূলত মৌসুমি জেলে। তারা প্রতিবছর নিষেধাজ্ঞার সময় নদীতে মাছ শিকারে নামেন। এ কারণে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে গিয়ে বারবার বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে প্রশাসনকে।
আকারভেদে ইলিশের দাম
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ধরা ইলিশের বেচাকেনা চলছে আকারভেদে। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চার-পাঁচটি ইলিশে এক কেজি হলে সেগুলো বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। এক কেজি ওজনের ইলিশের দাম প্রতি কেজি এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা। আর দেড় কেজি ওজনের ইলিশের দাম কেজিপ্রতি প্রায় দেড় হাজার টাকা।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ইলিশ কিনে সংরক্ষণ করছেন। নিষেধাজ্ঞা শেষ হলে এসব মাছ বেশি দামে বিক্রির পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।
চালের সহায়তা পর্যাপ্ত নয়, দাবি জেলেদের
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৪ লাখ ২৩ হাজার। এর মধ্যে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় ৩ লাখ ৫৮ হাজার জেলেকে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়া হচ্ছে।
তবে জেলেদের একটি অংশের দাবি, এই সহায়তা দিয়ে তাদের পরিবারের চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। ফলে জীবিকার তাগিদে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও নদীতে নামতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জেলে বলেন, এবারের মৌসুমে তেমন ইলিশ পাননি তারা। এতে ধারদেনায় জর্জরিত হতে হয়েছে। যখন কিছু ইলিশ পাওয়া শুরু হয়েছে, তখনই নিষেধাজ্ঞা এসেছে। ঋণ পরিশোধের তাগিদে তাকে মাছ ধরতে নামতে হচ্ছে।
আরেক জেলে বলেন, সরকার মাত্র ২৫ কেজি চাল দিচ্ছে। এই চাল দিয়ে পরিবারের চাহিদা মেটে না। পেটে ভাত না থাকলে নিষেধাজ্ঞা মানা কঠিন।
প্রণোদনা বাড়ানোর পরামর্শ বিশেষজ্ঞের
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. সাজেদুল হক বলেন, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। জেলেদের প্রণোদনা বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। মা ইলিশ রক্ষা করা গেলে ইলিশের উৎপাদন বাড়বে এবং ভবিষ্যতে জেলেরাও বেশি মাছ পাবেন—এ বিষয়টি তাঁদের বোঝাতে হবে।
অভিযানে যুক্ত হচ্ছে বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টার
বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক মো. কামরুল হাসান বলেন, প্রতিবছর মেঘনা নদীর দুর্গম এলাকায় সংঘবদ্ধ একটি চক্র ইলিশ শিকার করে। তারা সহিংস হয়ে ওঠে এবং অভিযানের সময় প্রশাসনের ওপর হামলা চালায়। এ কারণে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
তিনি বলেন, এবার মেঘনা নদীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দুটি লঞ্চ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে কয়েকটি ছোট নৌযান। ড্রোনের মাধ্যমেও নজরদারি করা হচ্ছে।
কামরুল হাসান আরও জানান, শিগগিরই অভিযানে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টার যুক্ত হবে। শরীয়তপুরের জাজিরা পয়েন্ট থেকে মেঘনা হয়ে ভোলা, পটুয়াখালী ও বরগুনাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় টহল দেবে হেলিকপ্টারটি। এতে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে অভিযান আরও কার্যকর হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।