EN ☀️
×

Follow Us

বাংলাদেশ

দৃষ্টিহীন হয়েও শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন লক্ষ্মীপুরের তিন শিক্ষক

ডেইলি সান রিপোর্ট, লক্ষ্মীপুর

প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২৩ পিএম

দৃষ্টিহীন হয়েও শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন লক্ষ্মীপুরের তিন শিক্ষক

ছবি: সংগৃহীত

অ অ

চোখে নেই আলো। দেখা যায় না প্রিয়জন কিংবা প্রিয় শিক্ষার্থীদের মুখ। বইয়ের অক্ষরও ধরা পড়ে না চোখে। তবু থেমে নেই তাদের পথচলা। নিজেদের সীমাবদ্ধতাকে জয় করে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন অন্যের জীবনে। দৃষ্টিশক্তি হারানোর পরও শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাননি লক্ষ্মীপুরের তিন শিক্ষক—আজাদ পাটোয়ারী, আবদুল মুহাইমিন ও বোরহান উদ্দিন ভূঁইয়া। তাদের প্রত্যয় ও আত্মবিশ্বাসে আলোকিত হচ্ছে অসংখ্য শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ।

তাদের চোখে পৃথিবীর আলো-রং ধরা পড়ে না। কিন্তু জীবনের অন্ধকারকে জয় করে অন্যের ভবিষ্যৎ আলোকিত করাই যেন তাদের জীবনের ব্রত। প্রতিবন্ধকতা তাদের থামিয়ে দিতে পারেনি; বরং শিক্ষা ও আত্মবিশ্বাসকে সঙ্গী করে তারা হয়ে উঠেছেন অন্যদের অনুপ্রেরণা।

কণ্ঠ শুনেই শিক্ষার্থী চেনেন আজাদ পাটোয়ারী

লক্ষ্মীপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রায় ১৫ বছর ধরে ইংরেজি পড়াচ্ছেন আবদুল কালাম আজাদ পাটোয়ারী। জীবনের প্রথম ১০ বছর স্বাভাবিকভাবেই কেটেছে তার। পরে টাইফয়েডে এক চোখের দৃষ্টিশক্তি হারান। এরপর বলের আঘাতে হারান অন্য চোখের দৃষ্টিও।

দৃষ্টিশক্তি হারালেও শিক্ষাজীবনে থেমে থাকেননি আজাদ পাটোয়ারী। ঢাকার নটর ডেম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন তিনি।

চোখে না দেখেও শ্রেণিকক্ষে সাবলীলভাবে পাঠদান করে যাচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের কণ্ঠ শুনেই চিনে নিতে পারেন কে কোন শিক্ষার্থী। ইংরেজি বিষয়ে ইতোমধ্যে ১০টি বই লিখেছেন তিনি। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা এবং শিক্ষকদের প্রশ্ন তৈরির সুবিধার্থে তৈরি করেছেন ‘দি ব্রেইন’ নামে একটি প্ল্যাটফর্মও।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য সময়মতো ব্রেইল বই সরবরাহের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। পাশাপাশি ব্রেইল প্রিন্টার, ব্রেইল ডিসপ্লে ও স্ক্রিন রিডারের মতো আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা উপকরণ সরবরাহে সরকারি সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন।

ব্রেইল শেখানোর স্বপ্ন আবদুল মুহাইমিনের

লক্ষ্মীপুর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কালুহাটি রোডে অবস্থিত আত্মসাহসী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্রেইল হাফিজিয়া ও কারিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করছেন আবদুল মুহাইমিন। পার্বতীনগর ইউনিয়নের উত্তর সোনাপুর গ্রামের এই শিক্ষক নিজে দৃষ্টিশক্তিহীন হলেও শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।

কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে শিক্ষকতা পেশায় আসেন তিনি। কণ্ঠ শুনেই শিক্ষার্থীদের চিনে নেওয়ার অসাধারণ দক্ষতা রয়েছে তার।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ব্রেইল শিক্ষায় দক্ষ করে গড়ে তোলাই তার অন্যতম লক্ষ্য। তার বিশ্বাস, দৃষ্টিশক্তির সীমাবদ্ধতা কখনোই শিক্ষার পথে স্থায়ী বাধা হতে পারে না।

১৯৯৬ সাল থেকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের পাশে বোরহান

১৯৯৬ সাল থেকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বোরহান উদ্দিন ভূঁইয়া। দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দিয়ে আসছেন তিনি।

কুমিল্লার সমিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষা কার্যক্রম থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি।

শিক্ষকতা তার কাছে শুধু পেশা নয়, আনন্দ ও তৃপ্তির বিষয়। বোরহান উদ্দিন বলেন, ‘কোনো শিক্ষার্থী প্রতিষ্ঠিত হলে শিক্ষক যে আনন্দ ও তৃপ্তি পান, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।’

নিজের প্রতিবন্ধকতা প্রসঙ্গে তার স্পষ্ট বক্তব্য, ‘প্রতিবন্ধিতা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো সমাজের সঙ্গে নিজেকে সমন্বয় করে নেওয়া।’

লক্ষ্মীপুরের এই তিন শিক্ষকের জীবন যেন একই বার্তা দেয়—চোখের আলো নিভে গেলেও মানুষের ভেতরের আলো নিভে যায় না। ইচ্ছাশক্তি, শিক্ষা ও আত্মবিশ্বাস থাকলে শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে জয় করে নিজের পাশাপাশি অন্যের পথও আলোকিত করা সম্ভব।

আরও পড়ুন