বরিশালের সরকারি কলেজগুলোতে তীব্র আবাসন সংকট
রাসেল হোসেন, বরিশাল
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩২ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
বরিশালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত চারটি সরকারি কলেজে তীব্র আবাসন সংকট দেখা দিয়েছে। প্রায় ৬৩ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে কলেজগুলোতে আবাসন ব্যবস্থা রয়েছে মাত্র ১ হাজার ৮০০ জনের। ফলে প্রায় ৬১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থী আবাসন সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর আবাসন সংকটের কারণে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। আবাসন সুবিধা না থাকায় অনেক শিক্ষার্থী দূরের বাড়ি থেকে যাতায়াত করে শুধু পরীক্ষায় অংশ নেন, নিয়মিত ক্লাস করেন না। এতে শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতির হার কমছে। বিশেষ করে ছাত্রীদের উপস্থিতি কম। আবার অনেক শিক্ষার্থীর পক্ষে বাড়ি থেকে যাতায়াত করে পরীক্ষায় অংশ নেওয়াও সম্ভব হয় না। ফলে অনেকের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
আবাসন সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি সরকারি বরিশাল কলেজে। উচ্চমাধ্যমিক, বিএ, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর মিলিয়ে প্রায় ৯ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করলেও তাদের জন্য কোনো আবাসন ব্যবস্থা নেই। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীদের মেস বা ভাড়া বাসায় থাকতে হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য এই বাড়তি ব্যয় উচ্চশিক্ষার পথকে আরও কঠিন করে তুলছে।
সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজেও চিত্র প্রায় একই। উচ্চমাধ্যমিক, বিএ, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর মিলিয়ে কলেজটিতে প্রায় ১১ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। বিপরীতে আবাসিক সুবিধা রয়েছে মাত্র ১০০ জন ছাত্রের। ফলে প্রায় ১০ হাজার ৯০০ শিক্ষার্থী এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
সরকারি মহিলা কলেজে প্রায় ১১ হাজার ছাত্রী অধ্যয়নরত। বিপরীতে আবাসিক আসন রয়েছে মাত্র ৫০০টি। ফলে প্রায় ১০ হাজার ৫০০ ছাত্রী আবাসন সুবিধা পাচ্ছেন না। নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন গুরুত্বপূর্ণ হলেও চাহিদার তুলনায় আসন একেবারেই অপ্রতুল।
অন্যদিকে বরিশালের বৃহৎ সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজে প্রায় ৩২ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে আবাসিক আসন রয়েছে মাত্র ১ হাজার ২০০টি। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর তুলনায় এ আসনও অপ্রতুল। এর ওপর আবাসিক হলগুলোর অধিকাংশই জরাজীর্ণ এবং ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ শিক্ষার্থী সেখানে থাকছেন।
বিএম কলেজে নতুন বিভাগ চালু হওয়ায় শিক্ষার্থী বেড়েছে। তবে গত ৩৭ বছরে নতুন কোনো হল নির্মাণ হয়নি। ফলে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ নগরীর বিভিন্ন মেসে থেকে পড়াশোনা করছেন। অথচ কলেজের নিজস্ব সম্পত্তি থাকার পরও আবাসন সংকটের সমাধান হচ্ছে না। দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২২টি বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ও ২১টি বিষয়ে স্নাতকোত্তর চালু রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও আবাসন ব্যবস্থা বাড়েনি; বরং কমেছে। ফলে উচ্চশিক্ষা নিতে এসে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের বাড়তি অর্থের চাপ বহন করতে হচ্ছে।
তাদের দাবি, দ্রুত নতুন আবাসিক হল নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান হলগুলো সংস্কার ও আধুনিকায়ন করতে হবে। অন্যথায় শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বরিশালের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আবাসন সংকট আরও তীব্র হবে।
বিএম কলেজ ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ওয়ালিদ বিন সালাউদ্দিন বলেন, হলগুলো অনেক পুরোনো হওয়ায় অধিকাংশই জরাজীর্ণ। অনেক ভবনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষার্থীরা থাকছেন। আগে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসে উপস্থিত থাকার বাধ্যবাধকতা ছিল না। বর্তমানে ৬০ শতাংশ ক্লাসে উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক, না হলে পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া হয় না। তাই বরিশালের বাইরে থেকে পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের শহরে থাকা এখন অনেকটা বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে। কিন্তু হলে পর্যাপ্ত আসন নেই, আবার অনেক শিক্ষার্থীর মেসে থাকার সামর্থ্যও নেই।
বিএম কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক কাজী জাবের আহমেদ বলেন, আবাসন ব্যবস্থায় ভয়াবহ সংকট রয়েছে। যে কয়টি হল আছে, সেগুলোর অবস্থাও ভঙ্গুর। শিক্ষার্থীরা সেখানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। একজনের আসনে দুজন থাকছেন।
সরকারি বরিশাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. মহিউদ্দিন বলেন, আবাসন ব্যবস্থা না থাকায় শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতির হার অত্যন্ত কম। কলেজে ছেলে শিক্ষার্থীর চেয়ে মেয়ে শিক্ষার্থী বেশি। তাই মেয়েদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে একটি আবাসিক হল অত্যন্ত জরুরি।