জাতিসংঘে বাংলাদেশ: নতুন বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব ও সফল কূটনীতি
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪৭ এএম
ছবি: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের সফর আন্তর্জাতিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই সফর বিশ্বমঞ্চে বহুপাক্ষিক সম্পর্কের সংস্কার, অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার এবং মানবাধিকারভিত্তিক বিশ্ব গড়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী খালেদা জিয়া ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান- একই পরিবারের তিন সদস্যের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়া বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসেও এক বিরল উদাহরণ।
ফিলিস্তিনের প্রতি অবিচল সমর্থন জানানো এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের সময় বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের ওয়াকআউট করা আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের স্বাধীন ও মানবিক পররাষ্ট্রনীতির বার্তা বহন করেছে।
চার দিনে ৩০টি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক
বিশ্বের ১১টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক, জাতিসংঘের ৮টি উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে ১১টি প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগসহ মোট প্রায় ৮০টি আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে বাংলাদেশের ব্যস্ত উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়।
সফরকালে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী নেতৃত্ব কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স শেখ সাবাহ আল-খালিদ, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সাথে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসব বৈঠকে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই), জ্বালানি নিরাপত্তা এবং প্রবাসী কর্মীদের শ্রমবাজার সম্প্রসারণের বিষয়ে যৌথ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
এর পাশাপাশি তুরস্ক, ইরান এবং প্রতিবেশী এশীয় ও ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর শীর্ষ নেতাদের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।
দেশ পুনর্গঠনে প্রধানমন্ত্রীর ‘থ্রি-আর কৌশল’
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে মাতৃভাষা বাংলায় দেওয়া ভাষণে দেশ পুনর্গঠন ও টেকসই অগ্রগতির জন্য ‘থ্রি-আর কৌশল’ (পুনরুদ্ধার, পুনর্বাসন ও পুনর্নির্মাণ) ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈশ্বিক ডিজিটাল বিভাজন নিরসন এবং গণতান্ত্রিক সংস্কারের একটি বিশ্বস্ত দলিল হিসেবে এই ভাষণ আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদলের নজর কাড়ে।
বৈশ্বিক মঞ্চে বিনিয়োগের বার্তা
বৈদেশিক বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক মূলধন আকর্ষণে এই সফরে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া হয়। বিশ্বখ্যাত বিনিয়োগ ব্যাংক ‘জেপি মরগান চেস’-এর সহযোগিতায় ওয়াল স্ট্রিটে আয়োজিত একটি বিশেষ গোলটেবিল বৈঠকে বৈশ্বিক অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের মুখোমুখি হন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি দেশের উদীয়মান অর্থনীতি ও স্বচ্ছ বিনিয়োগ পরিবেশের রূপরেখা তুলে ধরে বার্তা দেন—‘বাংলাদেশ এখন বিনিয়োগের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত’।
এর পাশাপাশি মার্কিন অ্যারোস্পেস জায়ান্ট বোয়িংয়ের কাছ থেকে বিমান কেনার বাণিজ্যিক আলোচনা বিশ্বব্যাপী প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাণিজ্যিক সক্ষমতা ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। বাংলাদেশের অ্যারোস্পেস ও পরিবহন খাতে বড় অঙ্কের বৈশ্বিক বাণিজ্যের সামর্থ্য রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সুদৃঢ় হওয়া রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক দূরদর্শিতার ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয়।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট অজয় ভাঙ্গার সঙ্গে বৈঠক দেশে কৌশলগত আর্থিক সংস্কার, বাজেট সহায়তা ও বৈদেশিক বাণিজ্যিক আস্থা ফিরিয়ে আনতে বড় ভূমিকা রাখবে। এছাড়া প্রযুক্তি ও জনস্বাস্থ্য খাতে উদ্ভাবনী অর্থায়নের জন্য বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের সিইও মার্ক সুজম্যানের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি অর্জিত হয়।
জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবি
এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর পক্ষে কথা বলতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য জলবায়ু তহবিল ছাড় এবং পরিবেশগত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানান তিনি।
রোহিঙ্গা সংকট নিরসন ও মানবাধিকার সুরক্ষা
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ভাষণের পাশাপাশি সংস্থাটির মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক এবং শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডির সাথে আয়োজিত বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশে আশ্রিত ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে বিশ্ব সম্প্রদায় ও জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে পুনরায় তীব্র কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা এই সফরের গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
শ্রমবাজার ও ‘হেলদি বাংলাদেশ’ আলোচনা
সুইডেন ও ইউএনএফপিএ-এ যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে "হেলদি বাংলাদেশ" রূপরেখা উন্মোচন করা হয়। এর আওতায় দেশে ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী (৮০ হাজার নারী স্বাস্থ্যকর্মী ও ২৫ হাজার মিডওয়াইফ) নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়। অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে আলোচনায় বাংলাদেশী শ্রমিকদের জন্য নতুন শ্রমবাজার ও ভিসা সহজীকরণের আশ্বাস মিলেছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই দূরদর্শী অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সাফল্যের পেছনে রয়েছে ‘টিম পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়’। এই টিমের সমন্বয়ক ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ূন কবির জানান, ‘শান্তি, অহিংসা, মানবাধিকার ও পরিবেশগত ভারসাম্যের মূল চেতনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘে বাংলাদেশের যে সময়োপযোগী বার্তা এবং অর্থনৈতিক-মানবিক রূপরেখা তুলে ধরেছেন, তা বিশ্বমঞ্চে ন্যায়ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা উন্মোচনে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।’
প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মূখপাত্র মাহ্দী আমিনের ভাষ্যে, সরকার এখন এই সফরে উপস্থাপিত নীতি, কর্মসূচি ও পরিকল্পনাগুলোকে বাস্তবায়নের জন্য কাজ করবে। বাংলাদেশ যেন সত্যিকারের স্বনির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে তার লক্ষ্যেই বাস্তবায়িত হবে এ পরিকল্পনাগুলো।