চুরির অপবাদে বাবাকে খুঁটিতে বাঁধা, কন্যা এসে খাইয়ে দিলো চা-রুটি- নেপথ্যে কী ছিল?
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
চুরির অভিযোগে খুঁটির সাথে হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে বাবাকে। আর সেই অবস্থাতেই বাবার মুখে পরম মমতায় চায়ে ভেজানো রুটি তুলে দিচ্ছে তার চতুর্থ শ্রেণী পড়ুয়া শিশু কন্যা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন একটি হৃদয়বিদারক ভিডিও দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
বরিশালের উজিরপুর উপজেলার একটি স্থানীয় বাজারে এই ঘটনাটি ঘটেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) রাতে স্থানীয় একটি বাজারে চুরির অভিযোগে ওই ব্যক্তিকে আটক করে মারধরের পর সারারাত খুঁটির সাথে বেঁধে রাখে স্থানীয়রা।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সকালে খবর পেয়ে বাবার কাছে ছুটে যায় তার বড় মেয়ে। বাবার এই অবস্থা দেখে সে একটি বন রুটি ও চা এনে টুকরো টুকরো করে বাবাকে খাওয়াতে শুরু করে।
ভিডিওটি যেভাবে ভাইরাল হলো
স্থানীয় ব্যবসায়ী মিরাজ হোসেন ফরাজি শনিবার সকাল ৮টার দিকে এই দৃশ্যটি নিজের মোবাইলে ধারণ করে ফেসবুকে পোস্ট করেন। তিনি ক্যাপশনে লেখেন, "চোর হিসেবে সে যতটা খারাপ, বাবা হিসেবে ততটাই ভালো"।
ফরাজি জানান, ‘‘বাজারে এসে দেখি চোর সন্দেহে এক ব্যক্তিকে পিলারের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। উৎসুক জনতা তাকে মারধর করতে চাইছে। কিন্তু তার পেছনে একটি ৬-৭ বছরের মেয়ে মলিন মুখে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। পরে কেউ একজন চা-রুটি কিনে দিলে মেয়েটি পরম যত্নে তার বাবাকে খাওয়াতে শুরু করে। এই দৃশ্যটি আমার হৃদয়কে ভীষণভাবে নাড়িয়ে দেয় এবং আমি ভিডিওটি পোস্ট করি।’’
মুহূর্তেই ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং নেটিজেনদের মাঝে আবেগঘন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
তবে চুরির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত ব্যক্তি। স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে তিনি দাবি করেন, জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে তাকে পরিকল্পিতভাবে চুরির অপবাদ দিয়ে এই বর্বরতা চালানো হয়েছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, এই ব্যক্তির এক ভাই প্রবাসী এবং এক বোনের বিয়ে হয়ে গেছে, তবে তাদের সাথে যোগাযোগ নেই।
প্রশাসনের উদ্যোগ
ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর উজিরপুর উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) ঘটনাস্থল ও ভুক্তভোগী পরিবার পরিদর্শন করেন উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজা জানান,
অভিযুক্ত ব্যক্তি মাদকের সাথে জড়িয়ে পড়েছিলেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সহায়তায় তাকে ইতোমধ্যে একটি পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।
শিশুটি যেন কোনো নেতিবাচক পরিস্থিতিতে না পড়ে, সেজন্য উপজেলা প্রশাসন তার পড়াশোনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়েছে। একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দেশ-বিদেশ থেকে আসা সহায়তা সেখানে জমা রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
পরিবারটিকে স্বাবলম্বী করতে শিশুটির মায়ের জন্য কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উজিরপুর মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. ফারুক হোসেন জানান, চুরির ঘটনায় থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ না থাকায় পুলিশ আইনি ব্যবস্থা নেয়নি। তবে স্থানীয়রা তাকে আটকে রেখে নির্যাতন করার পর ছেড়ে দেয়। বর্তমানে পরিবারটিকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সর্বোচ্চ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
