মাদকবিরোধী অভিযানে থাকা কর্মকর্তারাই জড়াচ্ছেন মাদক কারবারে
ডেইলি সান রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩৫ পিএম
ছবি: এআই দিয়ে বানানো।
মাদকবিরোধী অভিযানে দায়িত্ব পালন করা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধেই মাদক কারবারে জড়ানোর অভিযোগ উঠছে। সম্প্রতি সাতক্ষীরা, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে মাদকসহ পুলিশ ও এপিবিএনের সদস্য গ্রেপ্তারের ঘটনায় মাদক নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বশীলদের ভূমিকা, নজরদারি ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সাতক্ষীরায় মাদক কারবারিদের ধরতে গিয়ে মাদকসহ গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন দুই পুলিশ সদস্য। কক্সবাজারের রামুতে ৫৪ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়েছেন আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) এক সদস্য। এর আগে চট্টগ্রামে ৫০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করা হয় খুলনা জেলা পুলিশের এক কনস্টেবলকে।
তিনটি ঘটনাতেই অভিযুক্ত ব্যক্তিরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্য।
অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদকবিরোধী অভিযানে নিয়োজিত ব্যক্তিদের একটি অংশ মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ছে কি না, তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁদের মতে, শুধু মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়; মাদক নিয়ন্ত্রণ ও আইন প্রয়োগের দায়িত্বে থাকা সদস্যদের বিরুদ্ধেও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক তদন্ত নিশ্চিত করা জরুরি।
তাঁরা আরও বলছেন, মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কেউ মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে পুরো মাদকবিরোধী অভিযানই প্রশ্নের মুখে পড়বে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র বলছে, মাদক সেবনের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে মাদক চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত সন্দেহে কিছু পুলিশ সদস্যকে নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। পুলিশের মাদক সেবন কিংবা মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি কড়া নজরদারিতে রয়েছে। কোনোভাবেই কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। ডোপ টেস্টে কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বা সদস্যের মাদক গ্রহণের বিষয়টি শনাক্ত হলে তাঁর বিরুদ্ধে চাকরিচ্যুতিসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
গত ৬ সেপ্টেম্বর বিকেলে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বকচরা বাইপাসসংলগ্ন এলাকায় দুই পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। তাঁরা হলেন মো. মোস্তাইন বিল্লাহ (৩০) ও নাজমুল (২৮)। মোস্তাইন বিল্লাহ জেলা পুলিশের স্টাফ ফোর্স (এসএফ) শাখায় কর্মরত ছিলেন। নাজমুল জেলা পুলিশের ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
সংশ্লিষ্ট থানার ওসি মাহমুদুর রহমান জানান, এ ঘটনায় ডিবির একজন কর্মকর্তা বাদী হয়ে মামলা করেছেন এবং তিনিই মামলাটির তদন্ত করছেন। উদ্ধার করা আলামত পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। আদালতের মাধ্যমে দুই পুলিশ সদস্যকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
একই দিন কক্সবাজারের রামুতে এপিবিএন সদস্য মোহাম্মদ আলী মুন্না শিকদারকে (২৭) ৫৪ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করে বিজিবি। মামলার এজাহারে বলা হয়, তাঁর কাছ থেকে একটি মোটরসাইকেল, দুটি আইফোন ও নগদ ৫০ হাজার ৯৯০ টাকা জব্দ করা হয়। পরে তাঁর বিরুদ্ধে রামু থানায় মামলা করা হয়।
এর আগে গত ৫ মে চট্টগ্রামের বাকলিয়া থানার নতুন ব্রিজ এলাকায় ৫০ হাজার ইয়াবাসহ আশিকুল ইসলাম (৩০) নামের এক পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি খুলনা জেলা পুলিশের কনস্টেবল হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তের বরাতে বলা হয়, কক্সবাজার থেকে ইয়াবার একটি বড় চালান সংগ্রহ করে তিনি খুলনায় নিয়ে যাচ্ছিলেন।
অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব ঘটনার সময়, স্থান ও প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও একটি বিষয় অভিন্ন। মাদকের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের দায়িত্বে থাকা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধেই মাদক বহন, সংরক্ষণ, সংশ্লিষ্টতা ও আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। ফলে মাদক কারবারিদের মধ্যেই মাদকসংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সীমাবদ্ধ থাকছে না; আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধেও এমন অভিযোগ সামনে আসছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাখাওয়াত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কোনো সদস্য মাদকসহ গ্রেপ্তার হলে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করাই যথেষ্ট কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তিনি কীভাবে মাদক সংগ্রহ করলেন, কার কাছ থেকে পেলেন, কোথায় নিয়ে যাচ্ছিলেন, তাঁর সঙ্গে আর কারা যুক্ত এবং দায়িত্ব পালনের সুযোগ ব্যবহার করে তিনি কোনো সুবিধা নিয়েছিলেন কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
‘শুধু মামলা দিয়ে, বরখাস্ত করে এ প্রবণতা দূর করা যাবে না। কারণ বিপুল পরিমাণ মাদকসহ কোনো বাহিনীর সদস্য গ্রেপ্তার হলে সরবরাহকারী থেকে শুরু করে পরিবহন, অর্থ লেনদেন এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের বিষয়ে তদন্তের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।’
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘কোনো পুলিশ সদস্য মাদকসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে জড়িত—তদন্তে এমন তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া গেলে বিষয়টিতে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সদস্যের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও বিধি-বিধান অনুযায়ী তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।’
সূত্র: কালের কন্ঠ
