EN ☀️
×

Follow Us

বাংলাদেশ

র‍্যাব বিলুপ্তির নামে জবাবদিহিহীন প্রতিষ্ঠানের খোলস বদলে বিভ্রান্ত করা যাবে না: টিআইবি

র‍্যাব বিলুপ্ত করে নতুন বাহিনী গঠনের বিলে ক্ষমতার অপব্যবহার ও জবাবদিহির অভাব নিয়ে সতর্ক করল টিআইবি

ডেইলি সান রিপোর্ট

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২৫ পিএম

র‍্যাব বিলুপ্তির নামে জবাবদিহিহীন প্রতিষ্ঠানের খোলস বদলে বিভ্রান্ত করা যাবে না: টিআইবি
অ অ

র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) বিলুপ্ত করে নতুন বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট গঠনে সংসদে উত্থাপিত ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’ এর মাধ্যমে নতুন নামে আরও ক্ষমতাশালী ও জবাবদিহিহীন সংস্থার আইনগত ভিত্তি তৈরি করা হচ্ছে উল্লেখ করে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘র‍্যাব বিলুপ্তির নীতিগত সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে বহু প্রতীক্ষিত এবং এটিকে আমরা ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু একটি বাহিনীর নাম পরিবর্তন করলেই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার হয় না। র‍্যাবের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও নির্যাতনের যে গুরুতর অভিযোগ ও প্রমাণ রয়েছে, সেগুলোর পুনরাবৃত্তি রোধে নতুন বাহিনীর কাঠামো, জনবল, ক্ষমতা, বলপ্রয়োগের বিধান এবং জবাবদিহির ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে।’

‘অন্যথায় র‍্যাবের বদলে ‘এসআরবি’ নামে একই ধরনের ক্ষমতা ও সংস্কৃতির একটি বাহিনী গড়ে উঠলে তা হবে শুধুই পুরোনো প্রতিষ্ঠানের খোলস বদলানোর শামিল। শুধু একটি ‘কসমেটিক মেকওভারের’ মাধ্যমে দেশের নাগরিক বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করা যাবে না,’ বলেন তিনি।

বিলে একাধিক ধারা সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘পুলিশ বাহিনীর বাইরে সশস্ত্র বা প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের প্রেষণে ‘এসআরবি’তে অন্তর্ভুক্তির পথ স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে কারণ এই বিধান অভ্যন্তরীণ পুলিশিংয়ে সামরিক যুদ্ধকৌশল ব্যবহারের ঝুঁকি জিইয়ে রাখবে, যা প্রকারান্তরে প্রতিপক্ষকে হত্যাসহ নির্মূল করতে দীক্ষা দেয়। এর পাশাপাশি, র‍্যাবের জনবল কোনো ধরনের যাচাই ছাড়া ঢালাওভাবে ‘এসআরবি’তে স্থানান্তরের বিধান রাখা হয়েছে। জাতিসংঘের সিকিউরিটি সেক্টর রিফর্ম (এসএসআর) ও ডিডিআর মানদ- অনুযায়ী, অতীতে র‍্যাবে দায়িত্ব পালনকালে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন বা গুমের মতো অপরাধে অভিযুক্ত বা জড়িত কোনো সদস্য যেন নতুন বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হতে না পারে, সেজন্য একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ‘ভেটিং’ প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে।’

উপরন্তু, খসড়ায় বাহিনীটির ওপর অবারিত ক্ষমতা অর্পণ ও বিচারিক সুরক্ষার অনুপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ড. জামান আরও বলেন, ‘প্রস্তাবিত বিলে এই বিশেষায়িত ইউনিটকে গোয়েন্দা নজরদারি থেকে শুরু করে অভিযান, তল্লাশি ও সাধারণ তদন্তের মতো বহুমুখী ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তদুপরি ‘অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা’ বা ‘সরকার কর্তৃক নির্দেশিত অন্যান্য দায়িত্ব’-এর মতো অস্পষ্ট শব্দবন্ধের উপস্থিতি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভিন্নমত দমন ও বলপ্রয়োগের সুযোগ ও অতীতের মতো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে আইনগত বৈধতা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে। একইভাবে বিলটিতে কেবল সন্দেহের বশে পরোয়ানা ছাড়া তল্লাশি ও গ্রেপ্তার এবং বাহিনীর নিজস্ব হাজতখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এটি নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (আইসিসিপিআর) এবং সংবিধানের মৌলিক অধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন।’

‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’ এর ২২ ধারায় প্রস্তাবিত অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার সমালোচনা করে বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাহিনীর অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও অন্যান্য পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি’ সুস্পষ্টভাবে স্বার্থের দ্বন্দ্বে দুষ্ট। কোনো বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তাদেরই সহকর্মীদের দিয়ে তদন্ত করানোর ব্যবস্থা কোনোভাবেই নিরপেক্ষ হতে পারে না। এই অভ্যন্তরীণ কাঠামোর পরিবর্তে সংস্থাটির বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে পুলিশ ও নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত, মানবাধিকার ও আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন, নিরপেক্ষ, স্বার্থের দ্বন্দ্বমুক্ত এবং দলীয় ও নির্বাহী বিভাগ বা সংশ্লিষ্ট বাহিনীর প্রভাবমুক্ত তদারকি কর্তৃপক্ষ গঠন করতে হবে। একই সঙ্গে এই কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের অধিকার নিশ্চিত করার আইনি সুরক্ষার বিধান অন্তর্ভুক্তির দাবি রাখছি।’

টিআইবি মনে করে, র‍্যাব বিলুপ্তির পর নতুন বাহিনী গঠনের ক্ষেত্রে সরকারের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। নতুন বাহিনীর ক্ষমতার সুস্পষ্ট সীমারেখা, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদারকি, স্বচ্ছ সদস্য যাচাই প্রক্রিয়া, বিচারিক সুরক্ষা এবং কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত না হলে র‍্যাব বিলুপ্তির মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে। র‍্যাবের বিলুপ্তি শুধু একটি বাহিনীর নাম ও খোলস পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ না থেকে বরং মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে আইনের শাসন, নাগরিকের অধিকার এবং কার্যকর জবাবদিহির ভিত্তিতে একটি নতুন আইন প্রয়োগকারী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সূচনা হয়- এটাই টিআইবির প্রত্যাশা।

উল্লেখ্য, ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’ এর ধারা-ওয়ারি বিশ্লেষণ ও সুপারিশসহ একটি বিস্তারিত পলিসি ব্রিফ টিআইবির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও সংসদীয় কমিটির নিকট প্রেরণ করা হয়েছে। সুপারিশসমূহ যথাযথ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনকে সম্পৃক্ত করা সাপেক্ষে বিলটি আইনে পরিণত করার আহ্বান জানাচ্ছে টিআইবি।

আরও পড়ুন