প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে শ্রমিকের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে: শিমুল বিশ্বাস
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৫৯ পিএম
প্রযুক্তির অগ্রগতি ও কর্মজগতের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শ্রমিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা, ন্যায্য মজুরি ও অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস এমপি।
তিনি বলেন, ‘আমরা এমন ভবিষ্যৎ চাই না, যেখানে প্রযুক্তি এগিয়ে যাবে কিন্তু শ্রমিক পিছিয়ে থাকবে। আমরা এমন অর্থনীতি চাই, যেখানে উৎপাদনশীলতা বাড়বে, শিল্প প্রতিযোগিতামূলক হবে, বিনিয়োগ বাড়বে; কিন্তু এর ভিত্তি হবে শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা।’
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ের দ্বিতীয় তলার কনফারেন্স লাউঞ্জে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) আয়োজিত ‘Future of Work: Decent Work and Social Justice for All’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক শ্রমবিষয়ক সিম্পোজিয়ামে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
শিমুল বিশ্বাস বলেন, কর্মজগতের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। প্রযুক্তি, উৎপাদনব্যবস্থা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নতুন ধরনের কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। তবে এসব পরিবর্তনের কেন্দ্রে থাকা শ্রমিক ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা, মর্যাদা, ন্যায্য মজুরি ও অধিকার যেন পিছিয়ে না পড়ে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে কর্মরত মানুষের বড় একটি অংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত। কৃষি, নির্মাণ, পরিবহন, গৃহকর্ম, মৎস্য, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, হোম-বেজড কাজ এবং প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন খাতে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কাজ করছেন। অথচ তাঁদের অনেকেরই চাকরির স্থায়িত্ব, আইনগত সুরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও শ্রম অধিকার নিশ্চিত নয়।
শ্রমিকের যেসব অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান
শ্রমিকদের মৌলিক দাবির কথা তুলে ধরে শিমুল বিশ্বাস বলেন, ন্যায্য মজুরি, আট ঘণ্টা কর্মদিবসের বাস্তবায়ন, অতিরিক্ত কাজের ন্যায্য পারিশ্রমিক, চাকরির নিরাপত্তা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার, যৌথ দর-কষাকষির সুযোগ, সময়মতো মজুরি, নারী শ্রমিকের সমঅধিকার, সামাজিক সুরক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে মজুরি কাঠামো সমন্বয়, কর্মঘণ্টার বাস্তবায়ন, অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের ডেটাবেইস তৈরি এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সময়ে কর্মসংস্থান সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আইন বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব
শিমুল বিশ্বাস বলেন, ‘ইতোমধ্যে বাংলাদেশ শ্রম আইন সংশোধিত হয়েছে। এটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু আইন প্রণয়নই শেষ কথা নয়। আইন কতটা বাস্তবায়ন হচ্ছে, শ্রমিক কতটা সুরক্ষা পাচ্ছেন এবং শ্রমিক তাঁর অধিকার কতটা বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারছেন—সেটিই হবে আমাদের সাফল্যের আসল মাপকাঠি।’
শ্রমখাতের সমস্যা সমাধানে সামাজিক সংলাপের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, সরকার একা শ্রমবাজারের সব সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। মালিকপক্ষ বা শ্রমিক সংগঠনও এককভাবে তা পারবে না। সরকার, নিয়োগকর্তা ও শ্রমিক—এই তিন পক্ষকে সমান মর্যাদা ও দায়িত্ব নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসতে হবে।
তিনি বলেন, যৌথ দর-কষাকষি, ত্রিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সংলাপ এবং কর্মক্ষেত্রে গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। ‘শ্রমিকের কণ্ঠকে বাদ দিয়ে শ্রমনীতি তৈরি করলে সেই নীতি কখনো টেকসই হতে পারে না।’
সিম্পোজিয়ামে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শ্রমনীতিকে শ্রমিকবান্ধব, শিল্পবান্ধব, উৎপাদনশীলতাবান্ধব ও ন্যায়ভিত্তিক করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা এবং সামাজিক সংলাপের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে শ্রমিকদের সম্পৃক্ত করার বিষয়ে আলোচনা হয়।
অনুষ্ঠানে ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, জাপান, পানামা, ফিলিপাইন, তিউনিসিয়া, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), পাকিস্তান ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক ফোরামের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। ভবিষ্যতের শ্রমবাজারের পরিবর্তন ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সিম্পোজিয়ামে বিভিন্ন মতামত ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়।