পাকিস্তানে মিলল ৩২ বছর আগে নিখোঁজ আছিয়ার সন্ধান, ফিরতে চান বাবার কাছে
ঢাকার মিরপুর থেকে নিখোঁজ ও পাচারের শিকার আছিয়ার ফেসবুকে মিলল সন্ধান; আইনি জটিলতা কাটিয়ে তাকে ফেরাতে আকুল আবেদন পরিবারের
ডেইলি সান রিপোর্ট, বরগুনা
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৯:২১ পিএম
পাকিস্তান থেকে ভিডিও কলে আসা মেয়ের ছবির দিকে তাকিয়ে বরগুনার তমিজ উদ্দিন।
ঢাকার মিরপুর থেকে নিখোঁজ হওয়ার ৩২ বছর পর পাকিস্তানের মোজাফফর নগরে সন্ধান মিলেছে বরগুনার আছিয়ার। পাচারের শিকার হয়ে এতদিন পাকিস্তানে থাকা আছিয়ার খোঁজ মিলেছে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি পোস্টের সূত্রে। দীর্ঘ তিন দশক পর মেয়েকে ফোনে দেখতে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছেন তাঁর ৯৫ বছর বয়সী জীর্ণশীর্ণ বাবা তমিজ উদ্দিন। আইনি জটিলতা কাটিয়ে হারিয়ে যাওয়া মেয়েকে দ্রুত দেশে ফেরাতে সরকারের জরুরি সহায়তা চেয়েছে ভুক্তভোগী পরিবার।
মোবাইল ফোনের ভিডিও কলে হারানো মেয়েকে দেখতে পাচ্ছেন ৯৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ বাবা তমিজ উদ্দিন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মেয়ের মুখ দেখে ও কণ্ঠ শুনে একদিকে যেমন হাসছেন, অন্যদিকে আবেগে অশ্রুসিক্ত হচ্ছেন তিনি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এখন তার একটাই আকাঙ্ক্ষা, মৃত্যুর আগে একবার হলেও মেয়েকে নিজের কাছে পাওয়া।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, জীবিকার তাগিদে ১৯৯০ সালের দিকে বরগুনা ছেড়ে ঢাকার মিরপুর ২ নম্বরের বড়বাগ এলাকায় উঠেছিলেন তমিজ উদ্দিন। দিনমজুরির কাজ করে সংসার চালাতেন। ১৯৯৪ সালের এক বিকেলে ঘর থেকে বের হয়ে আর ফেরেননি ১৬ বছরের আছিয়া। সম্ভাব্য সব জায়গায় খুঁজেও মেয়ের সন্ধান না পেয়ে একপর্যায়ে স্ত্রী ও অন্য ৬ সন্তানকে নিয়ে বরগুনায় ফিরে আসেন তমিজ উদ্দিন।
মেয়ে হারানোর যন্ত্রণা নিয়েই পাঁচ মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন, ছেলেও সংসার শুরু করেছেন। তবে আছিয়াকে পাওয়ার আকুল প্রতীক্ষা ও শোক বুকে নিয়েই তিন বছর আগে মারা যান তাঁর মা রাহেলা। অবশেষে দীর্ঘ বঞ্চনার পর সম্প্রতি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি পোস্টের মাধ্যমে জানা যায়, মানবপাচারের শিকার হয়ে আছিয়া এখন পাকিস্তানে রয়েছেন।
বরগুনা সদর উপজেলার এম বালিয়াতলী ইউনিয়নের চারাভাঙ্গা গ্রামে জীর্ণশীর্ণ এক টিনের ঘরে বার্ধক্যের নানা জটিলতা নিয়ে কাটে তমিজ উদ্দিনের দিন। বয়স ও অসুস্থতার ভারে তিনি এখন অনেকটাই শয্যাশায়ী। কিন্তু মেয়ে আছিয়ার সন্ধান মেলার পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই মোবাইল ফোনে ভিডিও কলে কথা হচ্ছে বাবা-মেয়ের। স্ক্রিনে মেয়েকে দেখলেই বৃদ্ধ বাবার চোখেমুখে ফুটে ওঠে আনন্দের ঝলক। ২০ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এই ভিডিও কথোপকথনে কখনো মৃদু হাসেন, কখনো বা চোখ মুছতে মুছতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
ভিডিও কলে যোগাযোগ করা হলে পাকিস্তান থেকে আছিয়া জানান তাঁর নিখোঁজ হওয়ার নেপথ্যের করুণ ইতিহাস। তিনি জানান, ঢাকার সদরঘাট এলাকা থেকে একটি পাচারকারী চক্র প্রলোভন দেখিয়ে প্রথমে তাঁকে ভারতে নিয়ে যায়। সেখান থেকে কিছুদিন পর পাকিস্তানের মোজাফফর নগরে নিয়ে মাত্র ৪০ হাজার রুপির বিনিময়ে বিক্রি করে দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে পাকিস্তানের এক নাগরিকের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। বর্তমানে তিনি ৬ মেয়ে ও ১ ছেলের জননী।
এক বছর আগে স্বামীর মৃত্যুর পর নিজের জন্মভূমি ও স্বজনদের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েন আছিয়া। ফেসবুকে নিজের পরিচয় এবং বাংলাদেশের বাবার নাম ও ঠিকানা লিখে একটি পোস্ট করেন। সেই পোস্টটি ‘খোঁজ’ নামের একটি ফেসবুক পেজে শেয়ার হলে বরগুনায় থাকা তাঁর দূরসম্পর্কের এক আত্মীয় রিয়াজ উদ্দিন খানের নজরে আসে। ছবির তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের পর নিশ্চিত হওয়া যায় পাকিস্তান প্রবাসী এই নারীই তমিজ উদ্দিনের হারানো মেয়ে আছিয়া।
আছিয়াও এখন নিজের জন্মভূমিতে, বাবার কাছে ফিরতে ব্যাকুল। তবে পাসপোর্ট, ভিসা ও আইনি জটিলতায় থমকে আছে তাঁদের এই মিলন।
আছিয়ার ভাই মোস্তফা ও স্বজন রিয়াজ উদ্দিন জানান, প্রশাসনিক ও পাসপোর্টের জটিলতা সমাধান করে আছিয়াকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে বরগুনার জেলা প্রশাসক তাছলিমা আক্তার জানান, আছিয়ার ফিরে আসার জন্য দুটি আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। তাঁর যদি বাংলাদেশে জন্ম নিবন্ধন বা নাগরিকত্ব সনদ থাকে, তবে পাকিস্তানে বাংলাদেশ হাইকমিশনে তা জমা দিয়ে ‘ট্রাভেল পাস’ পেতে পারেন। আর যদি কোনো সনদ না থাকে, তবে দেশে থাকা স্বজনরা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বরাবর আবেদন করতে পারেন। আবেদন পেলে বিদ্যমান নীতি অনুযায়ী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরবর্তী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।