EN ☀️
×

Follow Us

বাংলাদেশ

শরীয়তপুরে গাছে বেঁধে তরুণীকে নির্যাতনের অভিযোগ

এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে

ডেইলি সান রিপোর্ট, শরীয়তপুর

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬, ০৬:০৪ পিএম

শরীয়তপুরে গাছে বেঁধে তরুণীকে নির্যাতনের অভিযোগ

ছবি: সংগৃহীত

অ অ

শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখিপুরে কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় এক তরুণী ও তাঁর দুই ভাই-বোনকে আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের অভিযোগ, চুরির অপবাদ দিয়ে তাঁদের কয়েক ঘণ্টা একটি ঘরে আটকে রাখা হয়। পরে তরুণীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর, মাথার চুল কেটে দেওয়া এবং জুতার মালা পরিয়ে অপমান করা হয়।

শুক্রবার (৭ আগস্ট) এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সখিপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের হাজি শরীয়তউল্লাহ কলেজসংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে বলে ভুক্তভোগী পরিবার জানিয়েছে। ওই রাতেই তরুণীর মা ফাতেমা বেগম (৪১) সখিপুর থানায় লিখিত অভিযোগ করেন।

স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগী পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ছৈয়ালকান্দি এলাকার মুদি দোকানি আবুল মোল্লার ছেলে মনির মোল্লা (২৫) দীর্ঘদিন ধরে ফারিয়া আক্তার (১৮)-কে উত্ত্যক্ত করে আসছিলেন। বিভিন্ন সময় তাঁকে কুপ্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে মনিরকে সতর্ক করা হয়েছিল বলেও দাবি পরিবারের।

ঘটনার দিন সকালে ফারিয়া তাঁর ছোট বোন মারিয়া আক্তার (১৩) ও ছোট ভাই ফাহিমকে (৭) সঙ্গে নিয়ে বাজার করতে বের হন। তাঁরা মনিরের দোকানের সামনে গেলে ফারিয়ার সঙ্গে তাঁর কথা-কাটাকাটি হয়। এ সময় মনির তাঁকে রাতে দেখা করার প্রস্তাব দেন বলে অভিযোগ। ফারিয়া প্রতিবাদ করলে মনির তাঁকে এবং তাঁর ভাই-বোনকে দোকানের পাশের একটি বাড়িতে নিয়ে যান বলে পরিবারের দাবি।

অভিযোগ করা হয়েছে, সেখানে তিনজনকে একটি কক্ষে আটকে রেখে মারধর করা হয়। পরে তাঁদের চিৎকার শুনে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে ফারিয়ার বিরুদ্ধে দোকান থেকে চুরি করার অভিযোগ তোলা হয়। এরপর তাঁকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে তাঁর মাথার চুল কেটে দেওয়া এবং জুতার মালা পরিয়ে অপমান করার অভিযোগ ওঠে। তাঁর ভাই-বোনকেও রশি দিয়ে বেঁধে রাখার কথা জানিয়েছে পরিবার।

খবর পেয়ে দুপুরের দিকে সখিপুর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তিন ভাই-বোনকে উদ্ধার করে। পরে তাঁদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয় বলে পরিবার জানিয়েছে।

ফারিয়ার মা ফাতেমা বেগম বলেন, ‘মনির দীর্ঘদিন ধরে আমার মেয়েকে কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছিল। ঘটনার দিন আবারও মেয়েকে রাতে দেখা করার কথা বলে। মেয়ে প্রতিবাদ করায় তাকে ও তার ভাই-বোনকে জোর করে নিয়ে গিয়ে আটকে রাখা হয়। পরে তাদের চুরির অপবাদ দিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘পুলিশ এসে আমার সন্তানদের উদ্ধার করেছে। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। আমার সন্তানদের মতো আর কোনো সন্তান যেন এমন নির্যাতনের শিকার না হয়।’

ফারিয়া আক্তারের অভিযোগ, ‘মনির আমাকে প্রায়ই কুপ্রস্তাব দিত। আমি তা প্রত্যাখ্যান করতাম। ঘটনার দিন দোকানে গেলে সে রাতে দেখা করার প্রস্তাব দেয়। প্রতিবাদ করায় আমাকে ও আমার ভাই-বোনকে জোর করে একটি বাড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে আমাকে আলাদা কক্ষে নিয়ে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। পরে চুরির অপবাদ দিয়ে আমাকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর ও চুল কেটে দেওয়া হয়।’

ফারিয়া বলেন, ‘আমি প্রশাসনের কাছে এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।’

এদিকে অভিযোগ দায়েরের পর থেকে পরিবারটি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে বলে দাবি করেছে। তাঁদের অভিযোগ, মামলা তুলে নিতে বিভিন্নভাবে চাপ ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এমনকি অভিযোগ প্রত্যাহার না করলে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি পরিবারের। নিরাপত্তার কারণে তাঁরা বাড়ি ছেড়ে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।

ফারিয়ার বাবা ফারুক বেপারী (৫০) বলেন, ‘সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত আমার সন্তানদের আটকে রাখা হয়েছিল। তাদের যেভাবে মারধর করা হয়েছে, তা কোনো বাবা-মায়ের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়। এখন আবার অভিযোগ তুলে নিতে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ প্রত্যাহার না করলে যেখানে-সেখানে লাশ পড়ে থাকবে—এমন কথাও বলা হয়েছে।’

ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন এমন এক নারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘চিৎকার শুনে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি মেয়েটিকে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। তার মাথার চুল কেটে দেওয়া হচ্ছিল। তার ভাই-বোনকেও পাশের একটি কক্ষে রশি দিয়ে বাঁধা ছিল। মনির তখন তাদের চুরির অভিযোগ করছিল। তবে কী চুরি হয়েছে, তা পরিষ্কারভাবে বলতে পারেনি।’

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মনির মোল্লা। তিনি বলেন, ‘তারা আমার দোকানে চুরি করেছে। স্থানীয়রা তাদের গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখেছিল। আমি মারধরের সঙ্গে জড়িত নই।’

তরুণীকে কুপ্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেন মনির। তাঁর দাবি, আফসানা, ফৌজিয়া সরদার ও নিশি সরদার ফারিয়ার চুল কেটেছেন। এ ঘটনায় তাঁর কোনো ভূমিকা নেই।

অভিযোগে নাম থাকা আফসানা, ফৌজিয়া সরদার ও নিশি সরদারের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও তাঁরা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।

এ বিষয়ে সখিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোফাজ্জল হোসাইন বলেন, ‘ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ভুক্তভোগীদের উদ্ধার করেছে। এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে ঘটনাটি নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। ভুক্তভোগী পরিবার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, নিরাপত্তা এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।

আরও পড়ুন