কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারে বাড়ছে খাদ্য নিরাপত্তাঝুঁকি
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৪:৫০ এএম
ছবি: সংগৃহীত
কৃষি উৎপাদন বাড়াতে একসময় রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফসলের পোকা ও রোগ দমনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত ও নিয়মবহির্ভূত কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ফসল তোলার নির্ধারিত সময় না মেনে আগেই বাজারজাত করা হচ্ছে সবজি ও ফল।
এই পরিস্থিতিতে কীটনাশকের ব্যবস্থাপনা সংস্কারে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে কৃষি বিভাগ। কঠোর করা হচ্ছে নতুন বালাইনাশকের নিবন্ধন, অনুমোদন ও আমদানি নীতিমালা।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ বা ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের কাঁচামাল আমদানিতে কড়াকড়ি, ল্যাব পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং পরিবেশবান্ধব জৈব বালাইনাশক ও সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ৩৯ হাজার ১৫৭ টন বালাইনাশক আমদানি করা হয়েছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ৪০ হাজার ৮৩২ টন। একই সময়ে এক হাজার ১৪৭টি কীটনাশকের নিবন্ধন বা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
কীটনাশক ব্যবসায়ীরা জানান, ১৯৭২ সালে দেশে কীটনাশকের ব্যবহার ছিল মাত্র চার হাজার মেট্রিক টন। পাঁচ দশকের ব্যবধানে সেই পরিমাণ প্রায় ১০ গুণ বেড়ে ৪০ হাজার টন ছাড়িয়েছে। ধান, শাক-সবজি, ফলসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদনে বর্তমানে ব্যাপকভাবে কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, গত পাঁচ বছরেই দেশে কীটনাশকের ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ৮১.৫ শতাংশ। ধারাবাহিক এই বৃদ্ধির ফলে দেশে কীটনাশকের বাজারের আকার সম্প্রসারিত হয়ে বর্তমানে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, উৎপাদিত খাদ্য হতে হবে বিষমুক্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত। কিন্তু দেশে মাঠ পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে, অনেক কৃষক সুপারিশ করা মাত্রা ও সময়সীমা না মেনে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করছেন। ফলে ফসলে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ থেকে যাচ্ছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে ক্যান্সার, কিডনি ও লিভারের জটিলতাসহ নানা অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে উপকারী পোকামাকড় ও মাটির অণুজীব ধ্বংস হচ্ছে। বৃষ্টির পানির সঙ্গে এসব রাসায়নিক জলাশয়ে গিয়ে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্যও হুমকি তৈরি করছে।
যা পাওয়া গেছে গবেষণায়
প্রায় দুই দশক ধরে কীটনাশক নিয়ে গবেষণা করছেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন তিনি বলেন, ‘গত ১৭ বছরের গবেষণায় দেখা গেছে, বাজারে আসা সবজি সংগ্রহের সময় ২০ থেকে ৩০ শতাংশে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে। তবে সব ক্ষেত্রে তা ক্ষতিকর মাত্রায় থাকে না। ক্ষতিকর মাত্রা ১০ থেকে ১২ শতাংশ। ফলে অনুমোদিত সীমার বেশি থাকে ৩ থেকে ৪ শতাংশ কীটনাশক ।’
তিনি বলেন, ‘প্রতিটি কীটনাশকের জন্য নির্ধারিত অপেক্ষাকাল রয়েছে। কিন্তু অনেক কৃষক তা অনুসরণ করেন না। এ অবস্থায় ভোক্তারা সবজি ও ফল ভালোভাবে ধুয়ে এবং রান্না করে খেলে অনেক ক্ষেত্রে ৩০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কীটনাশকের কার্যকারিতা কমে যায়।’
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের পুষ্টি বিভাগের সাবেক পরিচালক ড. মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সংগ্রহের সময় সবজি ও ফলে ৬২ শতাংশ পর্যন্ত কীটনাশকের উপস্থিতি পাওয়া গেলেও ধোয়ার পর তা কমে ৩৭.৫ শতাংশে এবং রান্নার পর ১৮.৭৫ শতাংশে নেমে আসে প্রায়। আশার কথা হলো, বেশির ভাগ সময় এ মাত্রা সহনশীল। তাই কৃষকদেরও সঠিক মাত্রায় কীটনাশকের ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভোক্তাদের সচেতন থাকতে হবে।
রাজধানীর বাজারের চিত্র
ড. দেলোয়ার হোসেন প্রধান এবং শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের গবেষণায় রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, তালতলা ও যাত্রাবাড়ী বাজার থেকে সংগ্রহ করা বেগুন ও ফুলকপির নমুনায় ক্ষতিকর অর্গানোফসফরাস কীটনাশকের উচ্চমাত্রার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ২১টি নমুনার ২০টিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নির্ধারিত কীটনাশকের সর্বোচ্চ অবশিষ্টাংশ সীমা অতিক্রম করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে ক্লোরপাইরিফস।
তবে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমান খাদ্যগ্রহণের মাত্রা বিবেচনায় তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি আন্তর্জাতিক সূচক অনুযায়ী এখনো গ্রহণযোগ্য সীমার মধ্যে রয়েছে। কিন্তু নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত ও রপ্তানি বাড়াতে ফসল কাটার আগের নির্ধারিত সময় কঠোরভাবে অনুসরণের সুপারিশ করেছেন গবেষকরা।
যে ফসলে সবচেয়ে বেশি কীটনাশক
‘বাংলাদেশে কীটনাশকের ব্যবহার ও অপব্যবহার’ শীর্ষক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, সবজির মধ্যে বেগুন চাষে সবচেয়ে বেশি ১২ শতাংশ কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। এরপর মিষ্টিকুমড়া ও টমেটোতে ৭ শতাংশ, মূলায় ৬ শতাংশ, শিম ও ফুলকপিতে ৫ শতাংশ, বাঁধাকপিতে ৪ শতাংশ এবং চালকুমড়া ও করলায় ৪ শতাংশ করে কীটনাশক ব্যবহার করা হয়।
বাংলাদেশে ব্যবহৃত মোট কীটনাশকের মধ্যে ছত্রাকনাশকের অংশ ৪৫.৭৭ শতাংশ, কীটনাশকের অংশ ৩৩.১৫ শতাংশ এবং আগাছানাশকের ব্যবহার প্রায় ২০ শতাংশ। মাকড়সানাশক ও ইঁদুরনাশকের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কম।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, রাসায়নিক বালাইনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই যেকোনো বালাইনাশকের ব্যবহার অবশ্যই বিজ্ঞানভিত্তিক ও দায়িত্বশীল হতে হবে। মাটি, পানি ও জলজ বাস্তু সংস্থানের ভারসাম্য অক্ষুণ্ন রেখে বালাইনাশকের উৎপাদন, নিবন্ধন, অনুমোদন, বিপণন ও ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জৈব বালাইনাশকের উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি প্রাকৃতিক উপায়ে কীট-পতঙ্গ দমন পদ্ধতির প্রসারেও গুরুত্ব দিতে হবে।
সরকারের কৃষি উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কৃষিকে রপ্তানিমুখী খাতে রূপান্তর করা গেলে দেশের অর্থনীতি আরো টেকসই ও শক্তিশালী হবে। সরকারের লক্ষ্য শিল্পভিত্তিক (ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কেলে) কৃষি উৎপাদনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করা। তবে এর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বিশ্ববাজারের ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করা। তাদের নিশ্চিত করতে হবে, বাংলাদেশে উৎপাদিত কৃষিপণ্য নিরাপদ, মানসম্মত ও মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়।’
সচেতনতাই সবচেয়ে বড় সমাধান
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন কঠোর করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। মাঠ পর্যায়ে কার্যকর মনিটরিং, কৃষকদের প্রশিক্ষণ, ডিলারদের জবাবদিহি ও ভোক্তাদের সচেতনতা সবকিছু মিলে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব।
ফসলে কোন কীটনাশক কতটুকু এবং কখন ব্যবহার করতে হবে এ বিষয়ে কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। একই সঙ্গে ফসল কাটার আগের সময়কাল কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, বাজারে নিয়মিত অবশিষ্টাংশ পরীক্ষা এবং নিরাপদ কৃষি চর্চা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারের নতুন উদ্যোগ মাঠ পর্যায়ে দ্রুত বাস্তবায়িত হলেই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। [সূত্র: কালের কণ্ঠ]