প্রতারণাপূর্ণ উত্তরাধিকার সনদ ও প্রত্যয়নপত্র দিয়ে অন্যের জমি বিক্রি
মাহবুব আলম, ঢাকা
প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬, ০৫:৩০ পিএম
বাস্তা ইউনিয়ন পরিষদ/ ছবি সংগৃহীত
ঢাকার কেরানীগঞ্জে একটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের দেওয়া উত্তরাধিকার সনদ ও প্রত্যয়নপত্র ব্যবহার করে অন্যের জমি প্রতারণামূলকভাবে বিক্রির ঘটনা ঘটেছে। বোয়ালী ও বাস্তা মৌজার অন্তত ৯৭ শতাংশ জমি বিক্রি করা হয়েছে। এতে প্রকৃত মালিকদের পাশাপাশি জমি কিনে এখন অনিশ্চয়তায় পড়েছেন ক্রেতারাও।
বাস্তা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাজি আশকর আলী এই প্রতারণামূলক কাজের সঙ্গে জড়িত। ডেইলি সান আশকর আলীর স্বাক্ষরযুক্ত তিনটি উত্তরাধিকার সনদ ও দুটি প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ করেছে, যেগুলোর মাধ্যমে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ সার্কেলের অধীন বোয়ালী ও বাস্তা মৌজায় এই জমি বিক্রি করা হয়।
সিএস রেকর্ড অনুযায়ী, বোয়ালী মৌজায় ৫২ শতাংশ জমি আকালি মিস্ত্রির নামে নিবন্ধিত ছিল (সিএস খতিয়ান নং ৪৫৯, দাগ নং ৩৬১)। তার মৃত্যুর পর তার দুই ছেলে মোহন বাশি মিস্ত্রি ও মরণ চাঁদ মিস্ত্রি জমিটি উত্তরাধিকারসূত্রে পান, যা এসএ খতিয়ান নং ৩০৭-এ নথিভুক্ত হয়।
মোহনের মৃত্যুর পর তার অংশ তার ছেলে পরেশ মিস্ত্রি ও ভানু মিস্ত্রির কাছে যায় এবং আরএস রেকর্ডে খতিয়ান নং ৪৪৯, প্লট নং ৪৬৯-এ নিবন্ধিত হয়।
কিন্তু, ভানুর আত্মীয় মহাদেব বাড়ইয়ের চার ছেলে নিজেদের ভানুর উত্তরাধিকারী হিসেবে মিথ্যাভাবে পরিচয় দিয়ে ভানুর ১৩ শতাংশ জমি বিক্রি করে দেন।
২০২১ সালের ২৭ মে, জমিটি ইমাম হোসেন ও শান্তি মণ্ডলের কাছে বিক্রি করেন।
জমি বিক্রি করতে মহাদেব বাড়ইয়ের চার ছেলে ধীরেন, পাণ্ডব, দুলাল ও চন্দন বাস্তা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দুটি নথি সংগ্রহ করেন, উভয়টিতেই চেয়ারম্যান আশকর আলীর স্বাক্ষর ছিল। একটি প্রত্যয়নপত্রে চেয়ারম্যান প্রত্যয়ন করেন যে ‘ভানু মিস্ত্রি ও মহাদেব বাড়ই একই ব্যক্তি।’
পরবর্তীতে একটি উত্তরাধিকার সনদে চার ভাইকে ভানু ওরফে মহাদেব বাড়ইয়ের উত্তরাধিকারী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। দ্য ডেইলি সান উভয় নথি যাচাই করেছে।
যোগাযোগ করা হলে ধীরেন বাড়ই স্বীকার করেন যে, ভানু মিস্ত্রি আসলে তাদের চাচা ছিলেন এবং ভানুর নিজের চার ছেলে রয়েছেন। তারা হলেন- গণেশ, কার্তিক, দিনেশ ও চন্দ্রি।
ধীরেন আরও বলেন, কোনাখোলা এলাকার দেলোয়ার হোসেন নামে এক ব্যক্তি উত্তরাধিকার সনদ ও প্রত্যয়নপত্রের ব্যবস্থা করেছিলেন। আমরা প্রতি শতাংশে ৮০ হাজার টাকা পেয়েছি। টাকা নিয়ে আমরা ইমাম হোসেন ও শান্তি মণ্ডলকে অফেরতযোগ্য আম মোক্তারনামা করে দিয়েছিলাম। তারা পরে অন্যদের কাছে বিক্রি করে দেয়।
পরবর্তী সময়ে জার্মানপ্রবাসী আবদুর রহিম ও অন্যরা ইমাম ও শান্তির কাছ থেকে এই জমি কিনেছেন। রহিম ডেইলি সানকে জানান, তিনি পাঁচ শতাংশ জমি কিনেছিলেন। কাগজপত্র যাচাইয়ের জন্য তিনি একজন আইনজীবীকে ২৩ হাজার টাকাও দিয়েছিলেন, কিন্তু সেই যাচাই পর্যাপ্ত ছিল না।
‘কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে জমি কিনেছি। প্রকৃত মালিকরা আদালতে গেলে আমার কী হবে জানি না’— বলে আক্ষেপ করেন তিনি।
প্রকৃত মালিকদের একজন কার্তিক বলেন, তারা বিষয়টি নিয়ে আদালতে যাবেন।
অন্যদিকে একই মৌজায়, সিএস খতিয়ান নং ২৩০, দাগ নং ৩৫৮-এ ঘেটু মৃধার নামে নথিভুক্ত ২৬ শতাংশ জমি পরবর্তীতে তার ছেলে ফুলচাঁদ বিশ্বাসের কাছে যায় এবং তারপর ফুলচাঁদের তিন ছেলে — জগন্নাথ, ত্রিনাথ ও বৈদ্যনাথ বিশ্বাস— উত্তরাধিকার সূত্রে মালিক হন।
আরএস রেকর্ড প্রস্তুতির সময় জগন্নাথ ও ত্রিনাথ বৈদ্যনাথকে তার অংশ থেকে বঞ্চিত করে তাদের নামে নথিভুক্ত করেন।
পরবর্তীতে জমি বিক্রি সহজ করতে চেয়ারম্যান আশকর আলী একটি উত্তরাধিকার সনদ ইস্যু করেন, সেখানে উল্লেখ করা হয়, বৈদ্যনাথ অবিবাহিত অবস্থায় মারা গেছেন। কিন্তু, জগন্নাথের ছেলে রঘুনাথের স্ত্রী ডেইলি সানকে বলেন, ‘বৈদ্যনাথ বিয়ে করেছিলেন এবং তার স্ত্রী ও সন্তান আছেন। তারা এখন ভারতে থাকেন।’
বাস্তা মৌজায়, সিএস খতিয়ান নং ৬৯৬, দাগ নং ৩৩৮-এ হরিনাথ মণ্ডলের নামে ৫৮ শতাংশ জমি নথিভুক্ত ছিল।
হরিনাথ ভারতে চলে যাওয়ার পর তার এক আত্মীয় কোকারাম সরকার জমিটি চাষাবাদ করেন এবং পরবর্তীতে তার ছেলেরা এসএ ও আরএস রেকর্ডে নিজেদের নামে নিবন্ধন করে নেন।
বিক্রির সময় মালিকানার শৃঙ্খলে অসঙ্গতি দূর করতে তারা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে একটি প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ করেন, যেখানে সার্টিফাই করা হয় যে ‘হরিনাথ ও কোকারাম একই ব্যক্তি’ এবং ‘হরিনাথ ওরফে কোকারাম সরকার’-এর নামে একটি উত্তরাধিকার সনদও নেওয়া হয়। উভয় নথিতেই চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর ছিল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইউনিয়ন পরিষদের একজন সদস্য ডেইলি সানকে জানান, দুজন আত্মীয় হলেও তারা সম্পূর্ণ আলাদা ব্যক্তি। তিনি আরও জানান, ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চেয়ারম্যান আশকর আলী বিদেশে পালিয়ে যান।
এ বিষয়ে চেয়ারম্যান আশকর আলীর মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাস্তা ইউনিয়নের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া কেরানীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শারমিন মুনমুন ডেইলি সানকে জানান, নথিপত্রগুলো যাচাই করা হবে। জালিয়াতি প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ছাড়াও স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্মসচিব (ইউনিয়ন পরিষদ শাখা) মো. আনোয়ার ইমাম ডেইলি সানকে জানান, তদারকির দায়িত্ব স্থানীয় প্রশাসনের। অভিযোগ দায়ের করা হলে আমরা ব্যবস্থা নেব।