EN ☀️
×

Follow Us

বাংলাদেশ

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর নিয়ে যা বলছে ভারতীয় গণমাধ্যম

ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা

প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২৬, ০৫:০৯ পিএম

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর নিয়ে যা বলছে ভারতীয় গণমাধ্যম
অ অ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া ও চীনে ৬ দিনের সফর শেষে শুক্রবার দেশে ফেরেন। তার প্রথম চীন সফরকে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মোড় হিসেবে ব্যাখ্যা করছে ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলো।

বিশেষ করে মোংলা বন্দরের অর্থনৈতিক অঞ্চল, তিস্তা প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা, সম্ভাব্য সামরিক সহযোগিতা এবং বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ে নয়াদিল্লির কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে বলে তাদের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

ভারতীয় বিশ্লেষকরা বলছেন, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ধীরে ধীরে চীনের দিকে আরও ঝুঁকছে, যা ভারতের ঐতিহ্যগত প্রভাব বলয়ের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

মোংলা বন্দরে ভারতের বদলে চীনের প্রবেশ

টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাগেরহাটের মোংলা বন্দরের পাশে ১১০ একর জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইপিজেড) গড়ে তোলার চুক্তি চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ ও চীন। জমিটি আগে ভারতের জন্য বরাদ্দ ছিল, কিন্তু ২০২৫ সালে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার তা বাতিল করে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে চীনের এই বিনিয়োগ বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে বেইজিংয়ের কৌশলগত উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করতে পারে। পাকিস্তানের গোয়াদর থেকে আফ্রিকার জিবুতি পর্যন্ত চীনের বন্দর বিনিয়োগের ধারাবাহিকতায় মোংলাও গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হতে পারে বলে তারা মন্তব্য করেছে।

ইন্ডিয়া টুডে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছে—‘ভারতের কি উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত?’ পত্রিকাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, এটি শুধু একটি অর্থনৈতিক প্রকল্প হাতছাড়া হওয়ার ঘটনা নয়; বরং ভারতের পূর্ব উপকূলের কাছাকাছি চীনের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির পথ খুলে দিতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনের বাণিজ্যিক বিনিয়োগ সামরিক উপস্থিতিতে রূপ নেবে—এমন প্রমাণ না থাকলেও অতীতে বিদেশি বন্দরে বিনিয়োগকে গোয়েন্দা ও নজরদারি কার্যক্রমে ব্যবহার করার নজির রয়েছে।

ভারতের ‘সংবেদনশীল স্নায়ুতে’ আঘাত

চীন সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তিস্তা নদীর ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে বেইজিংয়ের সহযোগিতা চেয়েছেন। এ বিষয়টি প্রায় সব ভারতীয় গণমাধ্যমই গুরুত্ব দিয়েছে।

দ্য হিন্দু বলছে, তিস্তা নদী নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের বিরোধ দীর্ঘদিনের। শেখ হাসিনা সরকার ভারতের সঙ্গে সমঝোতার পথ খুঁজলেও বর্তমান সরকার অপেক্ষা না করে উন্নয়নকাজ এগিয়ে নিতে চায়।

তিস্তা মহাপরিকল্পনায় ১০০ কিলোমিটারের বেশি নদী খনন, জলাধার নির্মাণ, ভাঙনরোধ এবং নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।

দ্য প্রিন্ট লিখেছে, তিস্তা প্রকল্প ভারতের কাছে সংবেদনশীল, কারণ নদীটি পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিম হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং এর অবস্থান শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’-এর খুব কাছাকাছি।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের একমাত্র স্থল সংযোগ এই করিডোর। ফলে সেখানে চীনের যেকোনো ধরনের উপস্থিতি নয়াদিল্লির উদ্বেগ বাড়ায়।

তবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তিস্তা প্রকল্প কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয় এবং বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতাকে বাইরের প্রভাবমুক্ত রাখা উচিত।

১৩ সমঝোতা স্মারক ও নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র

এনডিটিভি এবং ইন্ডিয়া টুডে জানিয়েছে, চীন সফরে বাংলাদেশ ও চীন ১৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, নদী ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি এবং অবকাঠামোর উন্নয়ন।

চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর উভয় দেশ চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল এবং মোংলায় অর্থনৈতিক অঞ্চল এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে।

চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে আঞ্চলিক সংযোগ বাড়াতে চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো উল্লেখ করেছে, এটি মূল বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) করিডোরের একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ, যেটি আগে বাস্তবায়িত হয়নি।

প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়েও জল্পনা

এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ২৪টি চীনা জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তানের পর বাংলাদেশ হবে এই মডেলের দ্বিতীয় বিদেশি ব্যবহারকারী।

এ ছাড়া ‘টু প্লাস টু’ সংলাপের আওতায় দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত আলোচনার বিষয়ে নীতিগত সমঝোতার কথাও উঠে এসেছে।

যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, তবে ভারতীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি ভবিষ্যতে নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও গভীর হওয়ার ইঙ্গিত বহন করে।

চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বলেছেন, চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় সমর্থন দেয় এবং ‘বিদেশি হস্তক্ষেপ’ প্রত্যাখ্যান করে।

ইন্ডিয়া টুডে ও এনডিটিভি এই বক্তব্যকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছে। তাদের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যদিও কোনো দেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি, তবু আঞ্চলিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বক্তব্যটির তাৎপর্য রয়েছে।

শি জিনপিং আরও বলেন, বিশ্ব পরিস্থিতি যেভাবেই বদলাক না কেন, বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের প্রশ্নে চীনের অবস্থান বদলাবে না এবং বেইজিং বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য বন্ধু, প্রতিবেশী ও অংশীদার হয়ে থাকবে।

ভারতের উদ্বেগ কতটা বাস্তবসম্মত

আউটলুক ম্যাগাজিনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নয়াদিল্লির উদ্বেগের মূল কারণ অর্থনীতি নয়, বরং ভূগোল ও নিরাপত্তা।

তাদের মতে, মোংলা বন্দর, তিস্তা অববাহিকা এবং লালমনিরহাট বিমানঘাঁটিকে ঘিরে সম্ভাব্য চীনা সম্পৃক্ততা ভারতের নিরাপত্তা কৌশলের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে।

তবে একইসঙ্গে ভারত কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে। নতুন ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী পর্যটক ভিসা পুনরায় চালুর ঘোষণা দিয়েছেন। দুই দেশের নিরাপত্তা ও জ্বালানি সহযোগিতাও অব্যাহত রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ এখন এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে চাইছে, যেখানে চীনের অর্থনৈতিক সহায়তা গ্রহণের পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কও বজায় রাখতে হবে।

সম্পর্কের ভবিষ্যৎ

ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকে কেবল দ্বিপক্ষীয় সফর হিসেবে দেখা হয়নি; বরং দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যে সম্ভাব্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

মোংলা বন্দর, তিস্তা প্রকল্প, অর্থনৈতিক করিডোর, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং ‘বিদেশি হস্তক্ষেপ’ প্রসঙ্গে চীনের অবস্থান–সব মিলিয়ে বলা যায় নয়াদিল্লি গভীরভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

একইসঙ্গে তারা এটাও স্বীকার করছে যে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন হলেও, ভৌগোলিক বাস্তবতায় ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উপেক্ষা করার সুযোগ নেই ঢাকার।

আরও পড়ুন