সুন্দরবনের ভাসমান সম্পদেই জ্বলে উপকূলের চুলা, পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ
জ্বালানি সংকটে কয়রার নারীরা নদী থেকে কুড়িয়ে আনছেন সুন্দরবনের ফল ও শুকনো ডাল; পরিবেশবিদদের উদ্বেগ বনায়ন ক্ষতি নিয়ে
ডেইলি সান রিপোর্ট, খুলনা
প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ০৬:২৯ পিএম
ছবি: ডেইলি সান
জ্বালানি কিনতে পারেন না, গ্যাস নেই। তবু প্রতিদিন রান্না করতে হয়। খুলনার কয়রা উপজেলার শাকবাড়িয়া নদীর তীরের নারীরা তাই প্রতিদিন কোমরসমান পানিতে নেমে সুন্দরবন থেকে জোয়ারে ভেসে আসা শুকনো পাতা, ডালপালা ও গাছের ফল কুড়িয়ে আনেন। এটাই তাঁদের জ্বালানির একমাত্র ভরসা।
স্থানীয়রা জানান, জোয়ারের পানির সঙ্গে সুন্দরবনের কেওড়া, গেওয়া, বাইন ও গোলপাতার ফল ও পাতা ভেসে আসে। প্রতি জোয়ারে একজন নারী এক থেকে দেড় মণ পর্যন্ত এসব সংগ্রহ করতে পারেন। ঝুড়িভর্তি ফল ও পাতা বাড়িতে এনে রোদে শুকিয়ে রান্নার কাজে ব্যবহার করা হয়।
কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের বাসিন্দা অঞ্জনা মুন্ডা বলেন, ‘ভেসে আসা ফলগুলোর ভেতরে শাঁস থাকলে শুকাতে সময় লাগে। তাই আমরা শাঁস ফেলে দিয়ে খোলস শুকিয়ে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করি। নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে কিছু ফল বিক্রিও করি। তবে বনের বাইন গাছের ফল সহজে পোড়ে না, তাই সেগুলো গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়।’
সম্প্রতি শাকবাড়িয়া নদীর তীর থেকে ঝুড়িভর্তি ফল সংগ্রহ করে রাস্তার পাশে শুকাতে দেখা যায় কাটকাটা গ্রামের মধ্যবয়সি নারী সুরভি মণ্ডলকে। তিনি বলেন, ‘সারা বছরই এসব ফল সংগ্রহের কাজ চলে। এলাকায় জ্বালানির খুব সংকট, তাই আমরা দল বেঁধে নদীর তীর থেকে ভেসে আসা সুন্দরবনের বিভিন্ন গাছের ফল সংগ্রহ করি। এসব ফল জ্বালানি ছাড়াও ছাগলের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়।’
তবে এই অভ্যাস পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কয়রা উপজেলা বন কর্মকর্তা জহিরুল হক বলেন, ‘সুন্দরবন থেকে ভেসে আসা ফল জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করায় প্রাকৃতিক বনায়ন ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের বারবার সতর্ক করা হয়েছে।’
সুন্দরবনের কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন বলেন, ‘এসব ফল থেকে বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে নতুন বনায়নের সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারে সেই সম্ভাবনা নষ্ট হচ্ছে।’
উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের ঘুগরাকাটি ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা সুজাউদ্দিন বলেন, ‘এসব ফল সংরক্ষণ করা গেলে নদীর চরগুলোতে প্রাকৃতিক সবুজ বেষ্টনী গড়ে উঠতে পারত।’
দারিদ্র্য ও জ্বালানি সংকটের কারণে উপকূলের মানুষ বাধ্য হয়ে এই পথ বেছে নিচ্ছেন। তবে সচেতনতা ও বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা না হলে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক বনায়নে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
