কাজ শেষ, বিল দেওয়ার জন্য টেন্ডার!
বারবার টেন্ডারে ব্যর্থ হলেও কাজ দেওয়ার জন্য মরিয়া উত্তর সিটির প্রকৌশলীরা
রাশেদুল হাসান, ঢাকা
প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ১২:৩১ পিএম
প্রগতি সরণি থেকে সড়ক বাতির পোল রাখা হয়েছে মহাখালীর আঞ্চলিক কার্যালয়ের সামনে। ছবি: ডেইলি সান
রামপুরা ব্রিজ থেকে কুড়িল ফ্লাইওভার পর্যন্ত সড়কের মিডিয়ানে থাকা খুঁটি অপসারণ, নতুন সড়ক বাতি স্থাপন এবং পুনরায় খুঁটি বসানোর কাজের জন্য তিন দফা দরপত্র আহ্বান করা কাউকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়নি। আবার নতুন করে দরপত্র আহ্বানের কাজ চলছে। কিন্তু এরই মধ্যে খুঁটি অপসারণ ও পুনঃস্থাপন কাজের অধিকাংশ কাজ ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়ে গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, গত এক বছরে তিনটি দরপত্র প্রক্রিয়ায় অযোগ্য ঘোষিত হওয়া একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। সেই আশ্বাসের ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠানটি টেন্ডার চূড়ান্ত হওয়ার আগেই কাজের বড় অংশ সম্পন্ন করে। চুক্তি চূড়ান্ত করতে দীর্ঘসূত্রতার কারণে ছয় কিলোমিটার সড়কটি বড় অংশ এখন বাতির আলোর বাইরে রয়েছে। টেন্ডার সম্পন্ন, প্রয়োজনীয় বাতি আমদানি এবং স্থাপন না হওয়া পর্যন্ত সড়কটি অন্ধকারেই থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে ঘটছে এসব বেআইনি কান্ড। প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের অভিযোগ, উত্তর সিটির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম এবং সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মঈন উদ্দিন এস এস রহমান ইন্টারন্যাশনালকে কাজ পাওয়ার আশ্বাস দেন এবং প্রতিষ্ঠানটিকে আগাম কাজ করার সুযোগ করে দেন। তবে প্রতিষ্ঠানটি তিনটি টেন্ডার প্রক্রিয়াতেই যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হয়। মূল্যায়নের সময় তাদের জমা দেওয়া অভিজ্ঞতার সনদ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
একজন অংশগ্রহণকারী ঠিকাদার অভিযোগ করেন, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম তাকে টেন্ডারে অংশ নেওয়ার কারণে হুমকিও দিয়েছিলেন এবং মূল্যায়নের নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করলেও তাকে সুযোগ দেওয়া হয়নি। রফিকুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায় সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মঈন উদ্দিনের ওপর চাপান।
এস এস রহমান ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধি মো. সালাউদ্দিনও দাবি করেন, কাজ পাওয়ার আশ্বাস সাবেক প্রধান প্রকৌশলীর কাছ থেকেই এসেছিল। তবে একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দুই কর্মকর্তাই ঠিকাদারকে কাজ করার অনুমতি দেওয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
চুক্তি ছাড়াই আগাম কাজ
ঢাকা ওয়াসা ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ‘ঢাকা এনভায়রনমেন্টাল সাসটেইনেবল ওয়াটার সাপ্লাই প্রজেক্ট’-এর আওতায় প্রগতি সরণির রামপুরা থেকে কুড়িল পর্যন্ত সড়কের মিডিয়ানের নিচে পাইপলাইন বসানোর কাজ করছে। প্রকল্পের অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওয়াসা ছয় কিলোমিটার এলাকায় সড়ক বাতির খুঁটি অপসারণ ও পুনঃস্থাপনের জন্য ৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকা দেয় উত্তর সিটিকে ।
ডিএনসিসির নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম তিনবার টেন্ডার আহ্বান করেন— ১ জুন ২০২৫, ৯ ডিসেম্বর ২০২৫ এবং ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।
প্রথম টেন্ডারে জেএপি ট্রেডিং ও এস এস রহমান ইন্টারন্যাশনাল অংশ নেয়। জেপি ট্রেডিং ১৫ শতাংশ কম দর দিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত হলেও পরে সেই টেন্ডার বাতিল করা হয়।
দ্বিতীয় টেন্ডারে এস এস রহমান ইন্টারন্যাশনাল একমাত্র দরদাতা ছিল, কিন্তু কারিগরি মূল্যায়নে যোগ্য বিবেচিত হয়নি।
তৃতীয় টেন্ডারে এম/এস লাবণ অ্যান্ড ব্রাদার্স এবং এস এস রহমান ইন্টারন্যাশনাল দর জমা দেয়। এ দরপত্র মূল্যায়নের সময় এস এস রহমান ইন্টারন্যাশনালের অভিজ্ঞতা অপর্যাপ্ত বলে বিবেচিত হয় এবং তাদের জমা দেওয়া সনদ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
টেন্ডার নথি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৬ কোটি টাকার সমজাতীয় কাজের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হলেও তার সমজাতীয় কাজের পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। এরপর দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি চতুর্থবারের মতো টেন্ডার আহ্বানের সিদ্ধান্ত নেয়।
চুক্তি না পেলেও টেন্ডারের আওতাভুক্ত খুঁটি অপসারণ ও পুনঃস্থাপনের কাজ সম্পন্ন করা হয়, যার ফলে ওয়াসা তাদের পাইপলাইন স্থাপনের কাজ চালিয়ে যেতে পারে। বুধবার (১৭ জুন) ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান ডেইলি সানকে বলেন, সিটি করপোরেশন খুঁটি সরিয়ে এবং পরে কিছু পুরোনো খুঁটি পুনঃস্থাপন করে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘খুঁটি নিয়ে আমাদের কোনো সমস্যা হয়নি। সিটি করপোরেশন প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করেছে।’
মেরুল বাড্ডা থেকে নতুন বাজার এলাকা পরিদর্শনে দেখা যায়, বেশ কয়েকটি খুঁটি অপসারণ করা হয়েছে এবং কিছু খুঁটি আবার বসানো হয়েছে। অপসারিত খুঁটিগুলো উত্তর সিটির মহাখালী আঞ্চলিক কার্যালয়ের সামনে ফেলে রাখা হয়েছে।
ডেইলি সানের সঙ্গে আলাপকালে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম ও টেন্ডার আহ্বানকারী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম স্বীকার করেন, ওয়াসার কাজ যাতে বিঘ্ন না তা নিশ্চিত করতে একজন ঠিকাদারের কাছ থেকে তারা আর্থিক সহায়তা নিয়েছিলেন।এস এস রহমানের প্রতিনিধি সালাউদ্দিনও বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
নির্বাহী প্রকৌশলী ও দরপত্র আহ্বানকারী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, খুঁটি অপসারণের কাজে সহায়তার জন্য ঠিকাদার ৪ লাখ টাকা দিয়েছিলেন, তবে তিনি কোনো ধরনের চুক্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার কথা অস্বীকার করেন।
তিনি বলেন, ‘তিনি কাজের জন্য সহযোগিতা করেছিলেন। আমি বলেছিলাম, কাজ না পেলেও তার টাকা ফেরত দেওয়া হবে।’
রফিকুল ইসলাম বলেন, ডেকোরেটিভ পোলের টেন্ডারে কাজ এসএস রহমান দেয়া হয়নি এবং সংক্রান্ত জটিলতার সময় তাকে প্রগতি সরনির কাজের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয় টেন্ডারে এস এস রহমান একমাত্র দরদাতা ছিল। ওয়াসার প্রয়োজন অনুযায়ী খুঁটি সরানো জরুরি হয়ে পড়েছিল। ঠিকাদার আমাদের সহায়তা করেছে এবং নিজস্ব অর্থ ব্যয় করেছে। মানবিক কারণে আমরা তাদের বিষয়টি বিবেচনা করতে চেয়েছিলাম।’
‘কাজ শেষ, শুধু বিল বাকি’
৫ ফেব্রুয়ারি ডাকা দরপত্রে “রামপুরা ব্রিজ থেকে কুড়িল মোড় পর্যন্ত খুঁটি, ব্র্যাকেট, স্মার্ট এলইডি স্ট্রিটলাইট ফিটিংস, ডিসিইউ, কেবল ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম সরবরাহ, স্থাপন, অপসারণ ও পুনঃস্থাপন” শীর্ষক টেন্ডারে এম/এস লাবণ অ্যান্ড ব্রাদার্স সর্বনিম্ন দর জমা দেয়।
প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মো. মনিরুজ্জামান অভিযোগ করেন, সব যোগ্যতা পূরণ করলেও তাকে টেন্ডারে অংশ নেওয়ার কারনে হুমকি দেয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘গত ২২ ফেব্রুয়ারি প্রগতির সরণির জন্য পোল ও সড়ক বাতির টেন্ডারে অংশগ্রহণকারী হিসেবে তৎকালী তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বর্তমান অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামের কাছে যাই। তখন তিনি আমাকে বলেন, আপনি কেন টেন্ডারে বিড করেছেন আমাকে জিজ্ঞাসা না করে। কেউ চাইলেই টেন্ডারে বিড করতে পারে না। টেন্ডারের কাজ শেষ তো টেন্ডার করেছি শুধু বিল দেওয়ার জন্য। আপনি কাজ পাবেন না।’ রফিকুল ইসলামকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করেন।
সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মঈন উদ্দিনের সঙ্গে ফোনে কল ও বার্তা পাঠিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
অন্ধকারে প্রগতি সরণি
৫৪০টি এলইডি বাতি, ৭৯৫টি খুঁটি এবং সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম সরবরাহের জন্য ঠিকাদার নিয়োগে ডিএনসিসি এক বছরের বেশি সময় ব্যয় করেছে। ফলে সন্ধ্যার পর প্রগতি সরণির ছয় কিলোমিটার অংশ অন্ধকারে ডুবে থাকে, যা যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএনসিসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, নতুন করে টেন্ডার আহ্বানের আগে দরপত্রের নথি এবং বিল অব কোয়ান্টিটি হালনাগাদ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘সাধারণত একটি টেন্ডার মূল্যায়ন ও কার্যাদেশ দিতে তিন থেকে ছয় মাস সময় লাগে। এরপর বাতিগুলো আমদানি ও স্থাপন করতেও আরও কয়েক মাস লাগতে পারে।’
ডিএনসিসির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খানের মন্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাক্ষাৎ দেননি। তার ব্যক্তিগত সচিব ও সহকারী ব্যক্তিগত সচিবের মাধ্যমে পাঠানো লিখিত প্রশ্নেরও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া ডেইলি সানকে বলেন, বিষয়টি স্থানীয় সরকার বিভাগ বা দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, ‘দরপত্রের নথি ও কাজের স্থান পরিদর্শনের পর অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। সিটি কর্পোরেশন তার কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় না এটা একটা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশন ব্যবস্থা নিতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের অভিযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।