লক্ষ্মীপুরে স্কুল ছাত্র মেহেদীর মৃত্যু
পরিবারের দাবি হত্যা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বলছে আত্মহত্যা!
ডেইলি সান রিপোর্ট, লক্ষ্মীপুর
প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ০২:১১ পিএম
ফরিদ আহমেদ ভূইয়া একাডেমির অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান
লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জের ভোলাকোট ইউনিয়নের উদয়পুর গ্রামের ফরিদ আহমেদ ভূইয়া একাডেমির অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী মেহেদী হাসানের (১৪) মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা দেখা দিয়েছে। পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, মোবাইল ফোন চুরির অপবাদ দিয়ে একই প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষার্থী মেহেদীকে পিটিয়ে হত্যা করে এবং মৃতদেহ ঝুঁলিয়ে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি বলছে চুরির অপবাদ সইতে না পেরে সে আত্মহত্যা করেছে।
তবে খোদ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি স্বীকার করেছে, সিনিয়র কয়েকজন শিক্ষার্থী মেহেদীকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেছে এবং মৃত্যুর আগে সে নির্যাতনের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। অভিযোগ তদন্তের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, মেহেদী চরম মানুষিক চাপ ও বিপর্যয়ের মধ্যে থাকায় সে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
এদিকে মেহেদী মৃত্যুর ঘটনাকে হত্যা দাবি করে পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও স্থানীয় লোকজন একাধিকবার বিক্ষোভ করে। ক্ষোভ ফেটে উপজেলাজুড়ে।
বুধবার (১৭ জুন) দুপুরে মেহেদীর মৃতদেহ রামগঞ্জ থানায় নিয়ে আসলে বিক্ষুব্ধ জনতা থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করে হত্যার বিচারের দাবি জানায়। এর আগে মঙ্গলবার (১৬ জুন) রাতে ফরিদ আহমেদ ভূইয়া একাডেমির সামনে বিক্ষোভ করে স্থানীয় শত শত জনতা। এসময় প্রতিষ্ঠানটির গেইট ও কক্ষ ভাংচুর করা হয়। পুড়িয়ে দেওয়া হয় প্রতিষ্ঠানটির একটি গাড়ি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খেতে হয় উপজেলা ও পুলিশ প্রশাসনকে। পরে লক্ষ্মীপুর থেকে অতিরিক্ত পুলিশ গিয়ে রাত ২ টার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এ ঘটনায় বুধবার ফরিদ আহমেদ ভূইয়া একাডেমির পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি দেওয়া হয়। অধ্যক্ষের স্বাক্ষরিত ওই বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ১৬ জুন বিকেলে অষ্টম শ্রেণীর 'খ' শাখার শিক্ষার্থী মেহেদী হাসানকে প্রতিষ্ঠানের আবদুর রহমান হলের ৬১৪ নাম্বার কক্ষের বারান্দায় ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। তাহসিন সিরাজী নামে প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থী তাকে ঝুলন্ত অবস্থা থেকে উদ্ধার করে। পরে তাকে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য প্রেরণ করা হয়।
এ ঘটনায় কর্তৃপক্ষ একটি অন্তবর্তীকালীন অনুসন্ধান কার্যক্রম গ্রহণ করে।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ১৫ জুন প্রতিষ্ঠানের কতিপয় কয়েকজন শিক্ষার্থী (নাম উল্লেখ করা হয়নি) সন্দেহের ভিত্তিতে শিক্ষার্থী মেহেদী হাসানের উপর শারিরীক ও মানষিক নির্যাতন করে। পরদিন ১৬ জুন মেহেদী কর্তৃপক্ষের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দেয়। এদিন সকালে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞাসাবাদ ও লিখিত বক্তব্য নেওয়া হয়। এদিন বিকেলেই তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়।
এদিকে সার্বিক ঘটনায় কর্তৃপক্ষ সাত দিনের একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ছুটি ঘোষণা করে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১৪ জুন ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া একাডেমির ছাত্রাবাসের উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণীর ছাত্র মোজাম্মেল হোসেন আপনের একটি আইফোন চুরি হয়। এই চুরির ঘটনায় সন্দেহ করা হয় একই ছাত্রাবাসের ৪১৪ নম্বর কক্ষের আবাসিক ছাত্র ও অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী মেহেদী হাসানকে। মঙ্গলবার (১৬ জুন) সন্ধ্যায় চুরির ঘটনার বিচারের উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণীর ছাত্র মিরাজ, ইমরান এবং মোবাইল ফোনের মালিক আপনসহ ৮-৯ জন সিনিয়র ছাত্র মেহেদীকে ৪১৪ নম্বর কক্ষে ডেকে নেয়। সেখানে চুরির স্বীকারোক্তি আদায়ের নামে মেহেদীর ওপর নির্যাতন চালানো হয়৷ এরপর তার ঝুলন্ত মৃতদেহ পাওয়া যায়। ঘটনার পর ক্যাম্পাস থেকে পালিয়ে যায় অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা।
মেহেদী হাসানের বাবা জিয়া উদ্দিন বলেন, আমার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। কয়েকজন শিক্ষার্থী মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগ তুলে তাকে নির্যাতন করে। নির্যাতনের ঘটনা যাতে কাউকে না বলা হয়, সে জন্য তাকে হুমকিও দেওয়া হয়েছে। আমার ছেলে কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করায় তাকে হত্যা করে লাশ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আমি হত্যাকারীদের বিচার চাই।
রামগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফিরোজ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, নোয়াখালীর চাটখিল থানা পুলিশ লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরী করে। এরপর নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে ময়নাতদন্ত করা হয়।
তিনি জানান, মোবাইল ফোন চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঝামেলা হয়েছে। তবে ঘটনাটি হত্যা না আত্মহত্যা সেটি ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে জানা যাবে। এ ঘটনায় বুধবার রাত পর্যন্ত কোন মামলা হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি।
বিক্ষুব্ধ জনতার থানা ঘেরাওয়ের বিষয়ে ওসি বলেন, থানা ঘেরাও হয়নি। তবে থানার সামনে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করা হয়েছে।