EN ☀️
×

Follow Us

বাংলাদেশ

বগুড়ায় ফুটপাথ দখল: প্রশাসন-পুলিশ-সিটি করপোরেশনের ‘সমন্বয়হীনতার’ অভিযোগ

টি এম মামুন, বগুড়া

প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬, ১০:১৭ এএম

বগুড়ায় ফুটপাথ দখল: প্রশাসন-পুলিশ-সিটি করপোরেশনের ‘সমন্বয়হীনতার’ অভিযোগ

ছবি: ডেইলি সান

অ অ

বগুড়া শহরের প্রধান সড়ক ও ফুটপাথ এখন কার্যত অবৈধ দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থায়ী ও ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী, অটোরিকশা চালক এবং মোটরসাইকেল মেকানিকদের দখলে ফুটপাথের বড় অংশ ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এতে প্রতিদিন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন পথচারী, বিশেষ করে নারী, শিশু ও শিক্ষার্থীরা।

শহরের কেন্দ্রীয় এলাকা সাতমাথা ও আশপাশের প্রায় দুই বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে শত শত ভ্রাম্যমাণ ও অস্থায়ী দোকান বসে ফুটপাথ দখল করে রাখছে বলে স্থানীয়দের দাবি। ফলে পথচারীরা ফুটপাথে হাঁটতে না পেরে বাধ্য হয়ে সড়কে নামছেন, যা প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ফুটপাথ ও সড়ক দখল করে গড়ে ওঠা এসব দোকান থেকে প্রতিদিন দোকানপ্রতি ১০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়। পৌর পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট কিছু সমন্বয়কারী অংশের মাধ্যমে এই অর্থ সংগ্রহ করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের কোনো স্বাধীন তদন্ত বা সরকারি যাচাইকৃত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

সূত্রের তথ্যমতে, শহরের বিভিন্ন সড়ক ও ফুটপাথে প্রায় ১১০০টি ভ্রাম্যমাণ কাপড়ের দোকান, ২৫০টি ফলের দোকান, ৩০টির মতো ফাস্টফুড ও চটপটি দোকান, ২৫টি চায়ের দোকান, ২০টি ডাবের দোকান এবং আরও কয়েক ডজন অস্থায়ী দোকান নিয়মিতভাবে বসে। তবে এই সংখ্যাগুলোর কোনো অফিসিয়াল পরিসংখ্যান নেই।

বগুড়া শহরের স্টেশন রোড, নবাববাড়ী রোড, গোহাইল রোড, থানা রোডসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতেও ফুটপাথ সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে দখল হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে যানজট বাড়ছে এবং পথচারীদের চলাচল আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

শহরের ফুটপাথ ও সড়ক দখল পরিস্থিতি নিয়ে জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাবই মূল সমস্যা বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। একাধিক সংস্থা একে অপরের ওপর দায় চাপালেও মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান কোনো স্থায়ী সমাধান নেই বলে দাবি তাদের।

বগুড়া ট্রাফিক পুলিশের ইনচার্জ (ইন্সপেক্টর) মো. সালেকুজ্জামান এর দাবি, তিনি যানজট নিরসনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। কিন্তু পৌর কর্তৃপক্ষ এবং জেলা প্রশাসনের আশানুরূপ আগ্রহ নেই।

তাঁর ভাষায়, পৌরসভার নেই কোন অভিভাবক, নাগরিক সেবায় কোনরকম কাজ দেখাতে পারছেনা পৌরসভা। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ জনভোগান্তি রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় ততটা উৎসাহী নয়। যে কারণে পুলিশ একবেলা অবৈধ ব্যবসায়ীদের ফুটপথ ও সড়ক থেকে সরিয়ে দিলেও পরক্ষণেই আবার ফিরে আসে।

অন্যদিকে বগুড়া পৌরসভার বাজার পরিদর্শক আব্দুল হাই দাবি করেন, অভিযান চলমান রয়েছে, তবে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন।

স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন পেশাজীবীরা জানান, শহরের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সড়কই এখন ফুটপাথ দখলের কারণে সংকুচিত হয়ে গেছে। স্টেশন রোড, থানা রোড, টেম্পল রোড, গোহাইল রোড (পার্করোড), নবাববাড়ী রোড, জিলাস্কুল রোড, সার্কিট হাউজ রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক দোকান বসে গেছে।

তাদের অভিযোগ, প্রশাসনের অভিযান থাকলেও তা টেকসই হচ্ছে না।

সরকারি চাকুরিজীবি এনামুল হক, আইনজীবি এ্যাডভোকেট বজলুর রশীদ, শিক্ষক শাহাদৎ হোসেন, ব্যবসায়ী রবিউল হাসানসহ নবাববাড়ী, গোহাইল রোড ও মফিজ পাগলার মোড় এলাকার কয়েকজন জানান, প্রশাসন এমন একটি ফুটপাথ দেখাতে পারবেনা, যেটা অবৈধ ব্যবসায়ীদের দখলে নেই।

তাদের মতে, স্টেশন রোড, থানা রোড, গোহাইল রোড, নবাববাড়ী রোডসহ প্রায় সব জায়গাই দখল হয়ে গেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মফিজ পাগলার মোড় থেকে সিয়াম হোটেলের দক্ষিণ পর্যন্ত এলাকাজুড়ে দোকানগুলো মাসিক ভিত্তিতে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচালিত হচ্ছে বলে জনমনে ধারণা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি অধ্যক্ষ সাহাবুদ্দিন সৈকত, সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান এবং সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযানের (সুপ্র) সম্পাদক কেজিএম ফারুক জানান, ফুটপথ ও সড়ক দখল করা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনী পদক্ষেপ গ্রহণে জেলা ও পৌর প্রশাসনসহ পুলিশ বিভাগের আন্তরিকতার কোনরকম প্রমাণ মিলছেনা। তাদের মতে, সমন্বয়ের দোহাই দিয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো একে অপরকে দায় এড়িয়ে যাচ্ছে।

বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক ও মিডিয়া) আতোয়ার রহমান জানান, যেকোন রকম বে-আইনী কাজের সঙ্গে কোন পুলিশ সদস্যের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া মাত্রই তার বিরুদ্ধে আইনগত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

জেলার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাসুদ হোসেন জানান, এ বিষয়ে তার কোন ব্যক্তিগত মতামত দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে জেলা আইনশৃঙ্খলা ও সমন্বয় সভায় এ বিষয়ে বেশকিছু মতামত ও সিদ্ধান্ত এসেছে। তার মতে, শহরকে পরিচ্ছন্ন করতে হলে সকল বিভাগের সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, চাইলেই সকল ক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ আদালত করা সম্ভব নয়। অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একই স্থানে একবার ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করলে পরবর্তীতে সেখানে নিয়মিত মামলা করতে হয়।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ইমরুল কায়েস জানান, আমাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে সবাইকে সচেতন এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। তার মতে, পুলিশ চাইলেই ফুটপথ ও সড়ক অবৈধ দখলমুক্ত করতে পারে। প্রচলিত আইনে পুলিশের নির্দিষ্ট পরিমাণ আর্থিক জরিমানা করার সুযোগ রয়েছে, যা বাস্তবায়ন করলে জনভোগান্তি অনেকটাই কমে আসবে।

সব মিলিয়ে বগুড়া শহরের ফুটপাথ ও সড়ক এখন এক দীর্ঘস্থায়ী দখল, অভিযান ও সমন্বয়হীনতার চক্রে আটকে আছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। নাগরিক ভোগান্তি বাড়লেও স্থায়ী সমাধানের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

আরও পড়ুন