হামের প্রাদুর্ভাব ইস্যুতে মার্কিন সায়েন্স জার্নাল
সমস্যার মূলে অন্তর্বর্তী সরকার টিকা কেনায় চরম গাফিলতি
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬, ১০:৪৭ এএম
ছবি: সংগৃহীত
উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতির কারণে সরবরাহে দেরি হওয়ায় বাংলাদেশে থমকে যায় টিকাদান কর্মসূচি। এতে বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দি অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্সের বৈজ্ঞানিক গবেষণাভিত্তিক ওয়েবসাইট সায়েন্সের প্রতিবেদনে এমনটাই বলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে অল্প সময়ের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে।
গত মার্চের মাঝামাঝি থেকে এখন পর্যন্ত ৩২ হাজারের বেশি আক্রান্ত হয়েছে এবং ২৫০ জনের বেশি মারা গেছে, যাদের বেশির ভাগই শিশু।
এতে বলা হয়, বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে বর্তমানে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে অসংখ্য শিশুকে চিকিৎসা দিতে নিয়ে যাওয়া হয়, যাদের অনেকে শ্বাসকষ্টে ভুগছিল। বেড সংকট থাকায় অনেক শিশুকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হাম একসময় প্রায় নির্মূল হয়ে গেছে বলে মনে করা হলেও এটি আবার ফিরে আসছে। কানাডা ও বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ এখন আর ‘হামমুক্ত’ নেই। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই এ বছর এক হাজার ৭০০ জনের বেশি হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। ২০ বছর আগেও এই সংখ্যা ছিল প্রায় ১০০। মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকাতেও হামের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে।
সায়েন্স জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে টিকা কেনার ক্ষেত্রে অচলাবস্থা তৈরি হয়। সেখান থেকেই হাম মহামারির সূত্রপাত বলে উল্লেখ করেছে সায়েন্স জার্নাল। প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই সময় দেশজুড়ে টিকার তীব্র সংকট তৈরি হয় এবং টিকাদানের হার কমে যায়। অপুষ্টি ও দুর্বল স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার কারণে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা আরো বেড়েছে।
বাংলাদেশে ৯ ও ১৫ মাস বয়সের শিশুদের হাম-রুবেলা টিকার দুটি ডোজ দেওয়া হয়। সারা দেশের ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যে প্রতি চার বছর পর পর দেশব্যাপী এই কর্মসূচি চালানো হয়। ইউনিসেফ এই টিকা সরবরাহ করত, যার অর্থায়ন আসত মূলত বিশ্বজুড়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিতে পরিচালিত টিকার জোট ‘গ্যাভি’ ও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে।
কিন্তু টিকা সরবরাহ পদ্ধতিতে একটি ‘বিতর্কিত’ পরিবর্তন এনেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা বন্ধ করে দিয়ে ‘উন্মুক্ত দরপত্র’ পদ্ধতি চালু করে। ইউনিসেফ এই পরিবর্তনের তীব্র বিরোধিতা করে সতর্ক করেছিল।
সংস্থাটি বলেছিল, এই পদ্ধতি টিকাদানব্যবস্থা ব্যাহত করতে পারে এবং মহামারির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স সায়েন্স জার্নালকে বলেন, ‘বিষয়টি খুবই হতাশাজনক ছিল।’ তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে তিনি অনুরোধ করেছিলেন ‘যেন এটি না করা হয়’। ওই দরপত্র প্রক্রিয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে যাওয়ায় টিকার মজুদ ফুরিয়ে যায় এবং নিয়মিত টিকাদান বন্ধ হয়ে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে মায়ানমার সীমান্তসংলগ্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়ে তা খুবই দ্রুত ৫৪ জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। এরপর অন্তত ২১ হাজারের বেশি মানুষকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। গত ২৩ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে জানায়, মায়ানমারে যুদ্ধের কারণে টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়েছে এবং ভারতে এই রোগ ছড়িয়ে পড়ার যথেষ্ট ঝুঁকি আছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, হামের এই প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশে হাম নির্মূলে আগের অর্জিত সাফল্যকে নস্যাৎ করে দিচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের একটি গবেষণা ইনস্টিটিউট আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ এস এম আলমগীর জানান, টিকার অভাবের পাশাপাশি ভিটামিন ‘এ’ বিতরণ কর্মসূচি তিন দফা বাদ পড়ায় শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা আরো কমে গেছে।
আইইডিসিআরের উপদেষ্টা মোহাম্মদ মুশতাক হোসাইন বলেন, ‘টিকাদান ঘাটতির বাইরেও বাংলাদেশের হামসংকট গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন।’ এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার গত এপ্রিলে ফের ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনার পদ্ধতি চালু করেছে এবং ৫ এপ্রিল থেকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি টিকাদান শুরু হয়েছে। হামের এই পরিস্থিতির জন্য ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকার উভয়কেই দায়ী করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সূত্র: ওয়েবসাইট
ইউনিসেফের দাবি ‘সঠিক নয়’: আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, হামের টিকা কেনা নিয়ে আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাখ্যা দিয়েছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান। তিনি দাবি করেছেন, টিকা ক্রয় প্রক্রিয়া পরিবর্তন বা স্থগিত করার বিষয়ে ‘ইউনিসেফ’ যে বক্তব্য দিয়েছে, তা সঠিক নয়।
গত শুক্রবার সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকা কেনার পদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি এবং ইপিআই কর্মসূচির টিকাও পরিবর্তিত কোনো পদ্ধতিতে কেনা হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্সের বৈজ্ঞানিক গবেষণাভিত্তিক ওয়েবসাইট সায়েন্সে তাঁর বক্তব্য খণ্ডিতভাবে প্রকাশিত হওয়ায় বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।
ডা. সায়েদুর রহমান ব্যাখ্যা করে বলেন, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় হামের টিকা সম্পূর্ণভাবে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে কেনা হয়। মোট চারটি টিকা সরকার পুরো অর্থে কিনে থাকে, আর অন্যান্য টিকার ক্ষেত্রে গ্লোবাল ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্সের (গ্যাভি) সঙ্গে যৌথ অর্থায়ন রয়েছে। নতুন টিকা চালু বা বিশেষ ক্যাম্পেইনের টিকা গ্যাভি সম্পূর্ণ অর্থায়ন করে। এই বাস্তবতায় সরকারি অর্থে কেনাকাটার ক্ষেত্রে ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট-২০০৬’ অনুসরণ বাধ্যতামূলক বলে তিনি উল্লেখ করেন। আইনের আওতায় ‘ডাইরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথড (ডিপিএম)’ বা ‘উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি (ওটিএম)’ এই দুই পদ্ধতির যেকোনো একটি অনুসরণ করা যায়।
