EN ☀️
×

Follow Us

বাংলাদেশ

অতিষ্ঠ মানুষ, লোডশেডিং আর কতদিন

ডেইলি সান রিপোর্ট

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১১:২৮ এএম

অতিষ্ঠ মানুষ, লোডশেডিং আর কতদিন
অ অ

দেশে দিনে-রাতে নিয়ম করে শহর এলাকায় পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা এবং গ্রামাঞ্চলে সাত থেকে আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না বলে জানাচ্ছেন বিদ্যুতের গ্রাহকরা। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সংকট শুরু হওয়ার পর থেকেই দেশে লোডশেডিং একটু একটু করে বেড়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট শুরু হয়েছে আরও আগে থেকেই।

নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দার বাসিন্দা পলাশ তালুকদার বলেন, ‘এসএসসি পরীক্ষার মধ্যে এমনিতেই তীব্র গরম, আর সাথে বিদ্যুৎ নাই, সব মিলিয়ে খুবই বাজে অবস্থা। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকার বাসিন্দা নয়ন বড়ুয়া বলেন, ‘গরমের মধ্যে যন্ত্রণায় আছি- গভীর রাতেও দুই-তিনবার বিদ্যুৎ যায়, একবার গেলে দেড়-দুই ঘণ্টার কমে আসে না। তার দাবি, চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন ছয় থেকে সাত ঘণ্টার মতো লোডশেডিং হচ্ছে।

কিন্তু গত তিনদিনে গ্রাম-শহর নির্বিশেষে সারা দেশে লোডশেডিং বেড়েছে বলেই তথ্য মিলছে। মূলত গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি এবং বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের ইউনিটে কারিগরি ত্রুটির কারণে উৎপাদন বন্ধ থাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কমেছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে চাহিদা বাড়লেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি থাকায় গত বুধ ও বৃহস্পতিবার দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং দিতে হয়েছে।

এমনকি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন অন্তত ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং দেওয়ার সিদ্ধান্ত বৃহস্পতিবার সংসদে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

যদিও দুটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বন্ধ হয়ে যাওয়া ইউনিউ চালু এবং আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ ঠিক হলে সপ্তাহখানেকের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী।

সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘আদানি পাওয়ার প্ল্যান্ট আমাদের যা সাপ্লাই করতো তাদের একটি ইউনিটে সমস্যা হওয়ায় এখন অর্ধেক দিতে পারছে। বাঁশখালির এসএস পাওয়ারের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। তাদের সবার সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। আশা করছি সপ্তাহ খানেকের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে গেল তিনদিন লোডশেডিংয়ের চিত্র তুলে ধরে এক স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী বলেন, ‘সকাল থেকে দুইবার বিদ্যুৎ যায় অন্তত আধা ঘণ্টা করে। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনবার যায় আরও আধা ঘণ্টা করে। আর সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত তিন থেকে চারবার যায় অন্তত এক ঘণ্টা করে।’

ওই জেলার গ্রামাঞ্চলে আরও আগে থেকেই লোডশেডিং শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি। জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে তীব্র লোডশেডিংয়ের বিরূপ প্রভাব পড়েছে যশোর জেলার কৃষি কাজে।

আরেক স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী বলেন, ‘তেলের দাম বাড়ানোর পর থেকেই যশোরের অধিকাংশ ফিলিং স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে। কৃষকরা তেল পাচ্ছে না, বিদ্যুৎও ভোগাচ্ছে।’

গ্রাম-শহর নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি এলাকায় কম-বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। যার কারণ হিসেবে চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন ঘাটতির কথা বলছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

বাংলাদেশ পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির সবশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৬৪৭ মেগাওয়াট। যার বিপরীতে ওই দিন বিদ্যুৎ উৎপাদনের সর্বোচ্চ পরিমাণ ১৪ হাজার ৪৬৭ মেগাওয়াট।

অর্থাৎ সরবরাহ ঘাটতি থাকায় সারাদেশে লোডশেডিং দিতে হয়েছে দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি। চাহিদা এবং সরবরাহের হিসেবে বৃহস্পতিবারও তিন হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি লোডশেডিংয়ের তথ্য জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

বাংলাদেশ পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির অঞ্চল ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা জোনে সবথেকে বেশি ছয় হাজার ১৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৪৫০ মেগাওয়াট লোডশেডিং দেওয়া হয়েছে।

খুলনা জোনে এক হাজার ৯৭৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৩৮০ মেগাওয়াট, চট্টগ্রামে এক হাজার ৫৮৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ২৫০ মেগাওয়াট, রাজশাহী জোনে এক হাজার ৮০৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ২৮০ মেগাওয়াট লোডশেডিং দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া কুমিল্লা জোনে এক হাজার ৫৭৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ২২০ মেগাওয়াট, ময়মনসিংহে এক হাজার ৭০ মেগাওয়াটের বিপরীতে ১৮০ মেগাওয়াট, সিলেটে ৫৭৬ মেগাওয়াটের বিপরীতে ১০০ মেগাওয়াট, বরিশালে ৪৬৮ মেগাওয়াটের বিপরীতে ৬০ মেগাওয়াট এবং রংপুরে এক হাজার দুই মেগাওয়াটের বিপরীতে ১৬৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে।

লোডশেডিং চলবে কতদিন তীব্র গরমে লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। শিল্প উৎপাদন এবং কৃষি উৎপাদনেও এর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

আর তাই বিদ্যুৎ নিয়ে এমন পরিস্থিতি আরও কতদিন চলবে এই প্রশ্নই এখন ঘুরেফিরে সামনে আসছে। পরিস্থিতি পুরো ঠিক না হলেও খুব শিগগিরই সহনীয় পর্যায়ে আসবে বলেই মনে করছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

তারা বলছে, ২৬শে এপ্রিল থেকে আদানি পাওয়ারের আমদানিৃকত বিদ্যুৎ আবারো পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া বাঁশখালির এসএস পাওয়ারের আইপিপি প্ল্যান্ট থেকে ৬৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ ২৮শে এপ্রিল থেকে স্বাভাবিক হতে পারে।

যুগ্ম সচিব উম্মে রেহানা বলেণ, ‘২৮শে এপ্রিল থেকে প্রায় তেরশ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমরা পাবো, যাতে সংকট খানিকটা কমবে। এছাড়া জ্বালানি সংকটে আরএনপিএন এর বন্ধ ইউনিটটি চালু হলে সব মিলিয়ে মে মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হবে।’

এক সপ্তাহের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আসতে পারে বলে মনে করেন বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

একটি সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলছেন, ‘আদানি পাওয়ার প্ল্যান্ট আমাদেরকে যা সাপ্লাই করতো তাদের একটি ইউনিটে সমস্যা হওয়ায় এখন অর্ধেক দিতে পারছে, বাঁশখালির এসএস পাওয়ারের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। তাদের সবার সঙ্গে আমরা কথা বলেছি, আশা করছি সপ্তাহ খানেকের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’

তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি চলমান থাকলে এবং বাংলাদেশে জ্বালানি সংকটের এই প্রেক্ষাপট ঠিক না হওয়া পর্যন্ত লোডশেডিং সহ্য করেই চলতে হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞদের অনেকে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেন বলছেন, প্রায় ছয় থেকে সাত হাজার মেগাওয়াটের তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো সচল করে এই মুহূর্তে লোডশেডিং কমানো সম্ভব।

কিন্তু এক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম যত বাড়বে সেটি বহন করা বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কঠিন বলেই মনে করেন এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ।

তিনি বলছেন, ‘বর্তমানে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে এই খাতে। এবার হয়তো সেটা ৬০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। ফার্নেস অয়েল নির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে চাইলেই বাড়তি উৎপাদন করা যাবে না।’

সূত্র: বিবিসি বাংলা

আরও পড়ুন