মৃত্যুফাঁদে লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়ক: দেড় বছরে প্রায় অর্ধশত প্রাণহানি
ডেইলি সান রিপোর্ট, লালমনিরহাট
প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৩৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ লালমনিরহাট–বুড়িমারী মহাসড়ক এখন কার্যত ‘মৃত্যুফাঁদে’ পরিণত হয়েছে। সংকীর্ণ সড়ক, বিপজ্জনক বাঁক, ঘন ঘন রেলক্রসিং এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার কারণে এই মহাসড়কে প্রায়ই ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রায় দেড় বছরে এ সড়কে অন্তত ৭০টি দুর্ঘটনায় প্রায় অর্ধশত মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন শতাধিক। এ সময় সড়ক দুর্ঘটনা সংক্রান্ত ২৭টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
সবশেষ ১৭ মার্চ সকালে পাটগ্রাম উপজেলার মডেল মসজিদ এলাকায় এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে বিপরীত দিক থেকে আসা ট্রাকের ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন এনজিওকর্মী শরিফুল ইসলাম, তার স্ত্রী ও এক সন্তান। গুরুতর আহত আরেক শিশু বর্তমানে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মহাসড়কটির অন্যতম প্রধান সমস্যা এর ত্রুটিপূর্ণ নকশা। জাতীয় মান অনুযায়ী সড়কের প্রস্থ ১০ দশমিক ৩ মিটার হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা মাত্র ৫ দশমিক ৫ মিটার। প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার যানবাহন চলাচল করে, যার বড় অংশই ভারী ট্রাক ও যাত্রীবাহী বাস।
পুরো মহাসড়কজুড়ে রয়েছে ৮৪টি বিপজ্জনক বাঁক এবং ১১টি রেলওয়ে লেভেল ক্রসিং, যা দেশের অন্য কোনো মহাসড়কে এত ঘনভাবে নেই। প্রতিদিন চার জোড়া ট্রেন চলাচলের কারণে অন্তত আটবার যান চলাচল বন্ধ থাকে, ফলে দীর্ঘ যানজট ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়।
এছাড়া সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় খানাখন্দ, উঠে যাওয়া কার্পেটিং এবং উঁচুনিচু ঢেউয়ের মতো অংশ দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
এ রুটে চলাচলকারী চালক ও যাত্রীরা সব সময় দুর্ঘটনার আতঙ্কে থাকেন। ট্রাকচালক কামাল উদ্দিন বলেন, “এত সংকীর্ণ ও বাঁকপূর্ণ রাস্তা আর কোথাও দেখিনি। কম গতিতেও দুর্ঘটনা এড়ানো কঠিন।” আরেক চালক মাইদুল ইসলাম জানান, লালমনিরহাট থেকে বুড়িমারী যেতে সময় লাগে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা, যা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি।
বাসচালক দবিয়ার রহমান বলেন, “বাঁকে গাড়ি উল্টে যাওয়ার ঘটনা প্রায়ই ঘটে। সবসময় আতঙ্ক নিয়ে গাড়ি চালাতে হয়।”
গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কটি বুড়িমারী স্থলবন্দরকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত করায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ। তবে সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে পণ্য পরিবহনে সময় ও খরচ বেড়ে যাচ্ছে, যা আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবহন শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরে সড়কটি প্রশস্তকরণ ও আধুনিকায়নের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
লালমনিরহাট সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মোজাম্মেল হক বলেন, “নকশাগতভাবে সড়কটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এত বেশি বাঁক ও রেলক্রসিং দেশের অন্য কোথাও নেই। স্থায়ী সমাধানের জন্য বড় প্রকল্প গ্রহণ জরুরি।”
তিনি আরও জানান, জরুরি ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সংস্কারের জন্য বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে, তবে এখনো অনুমোদন পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত সময়ের মধ্যে মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করা, বিপজ্জনক বাঁক কমানো, আধুনিক রেলক্রসিং স্থাপন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা না গেলে এটি ভবিষ্যতেও ‘মৃত্যুফাঁদ’ হিসেবেই থেকে যাবে।