ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ২০ জন নিহত: রোড সেফটি ফাউন্ডেশন
সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম বিভাগে।
ডেইলি সান রিপোর্ট
প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:০৩ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
এবারের পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগে-পরে ১৫ দিনে দেশে ৩৭৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৯৮ জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে নারী ৪৬ জন ও শিশু ৬৭টি। প্রতিদিন গড়ে নিহত হয়েছেন ২০ জন। সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম বিভাগে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের ‘ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদনে’ এই চিত্র উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) গণমাধ্যমে পাঠানো এই প্রতিবেদনে বলা হয়, তারা ১৪ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত এই ১৫ দিনের সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য নিয়েছে। ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে এবারের ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনার প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।
তাদের হিসাবে, গত বছরের ঈদুল ফিতরে ঈদযাত্রায় প্রতিদিন গড়ে ২২ জন নিহত হয়েছিলেন। ওই বছর ১১ দিনের ঈদযাত্রায় ২৫৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৪৯ জন নিহত হন।
সংস্থাটি বলছে, এবারের ঈদযাত্রায় মোটরসাইকেলচালক ও আরোহী ১১৬ জন, বাসযাত্রী ৪১ জন, ট্রাক-পিকআপ আরোহী ১৩ জন, প্রাইভেট কার-মাইক্রোবাস আরোহী ২০ জন, থ্রি-হুইলার যাত্রী (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান) ৫০ জন, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী (নছিমন-ভটভটি-মাহিন্দ্র-টমটম) ৯ জন এবং বাইসাইকেল আরোহী ২ জন নিহত হয়েছেন। আর মোট আহত হয়েছেন ২ হাজারের বেশি মানুষ।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ১১৫টি (৩০.৮৩%) জাতীয় মহাসড়কে, ১৬১টি (৪৩.১৬%) আঞ্চলিক সড়কে, ৪৮টি (১২.৮৬%) গ্রামীণ সড়কে, ৪২টি (১১.২৬%) শহরের সড়কে এবং ৭টি (১.৮৭%) ফেরিঘাটসহ অন্যান্য স্থানে সংঘটিত হয়েছে। দুর্ঘটনার ৬ দশমিক ১৬ শতাংশ ভোরবেলা, ২৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ সকালে, ২৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ দুপুরে, ১৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ বিকেলে, ৮ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ সন্ধ্যায় এবং ২০ দশমিক ৩৭ শতাংশ ঘটেছে রাতে।
সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে চট্টগ্রাম বিভাগে। ২৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ দুর্ঘটনা ও ২৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ প্রাণহানি ঘটেছে এই বিভাগে। এরপরই আছে ঢাকা বিভাগ। ১৭ দশমিক ৪২ শতাংশ দুর্ঘটনা ও ২৪ দশমিক ১৬ শতাংশ প্রাণহানি ঘটেছে এই বিভাগে।
এর আগে গত ৩০ মার্চ বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, এবারের ঈদুল ফিতরে দেশের সড়ক, রেল ও নৌপথে ৩৭৭টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ৩৯৪ জন। আর আহত হয়েছেন ১ হাজার ২৮৮ জন। এর মধ্যে শুধু সড়কেই ৩৪৬টি দুর্ঘটনায় ৩৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
দুর্ঘটনার পেছনে ১০ কারণ
সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে ১০টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। এগুলো হলো- ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা, বেতন-কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল, তরুণ-যুবদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা ও না মানার প্রবণতা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহণ খাতে চাঁদাবাজি।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলেছে, একটি সুস্থ-স্বাভাবিক ও নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে হলে কমপক্ষে তিন বছর মেয়াদি একটি টেকসই ও সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন। এই পরিকল্পনার অধীনে রেলপথ সংস্কার এবং সম্প্রসারণ করে ট্রেনের সংখ্যা বাড়িয়ে সড়কপথের মানুষকে ট্রেনমুখী করতে হবে। নৌপরিবহণ উন্নত ও জনবান্ধব করতে হবে। বিআরটিসির রুট বিস্তৃত করে বাসের সংখ্যা বাড়াতে হবে। ঈদযাত্রায় পোশাকশ্রমিকেরা যাতে পর্যায়ক্রমে ছুটি উপভোগ করতে পারেন, সে জন্য পরিকল্পনা সাজাতে হবে। পোশাকশ্রমিকদের জন্য অঞ্চলভিত্তিক যানবাহনের ব্যবস্থা করতে হবে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করলে পরবর্তী সব ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ হবে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের জন্য শিক্ষা-সচেতনতা কার্যক্রমের মাধ্যমে নিরাপদ সড়কব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা অতীব জরুরি।
১২ সুপারিশ
‘ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদনে’ ১২টি সুপারিশও যুক্ত করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। এগুলো হলো-
১. জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল (এনআরএসসি) পুনর্গঠন করে এই কাউন্সিলের অধীনে বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিটিসিএ পরিচালনা করতে হবে। কাউন্সিলের হাতে আইন, বিধি ও নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষমতা থাকতে হবে।
২. বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিটিসিএর ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে এবং এসব টেকনিক্যাল প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে।
৩. মোটরযানে আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৪. সড়ক থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন প্রত্যাহার করতে হবে।
৫. রাজধানীতে রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে কোম্পানিভিত্তিক আধুনিক বাস সার্ভিস চালু করতে হবে।
৬. বিআরটিসির বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং পরিবহণসেবা উন্নত করে সরকারের পরিবহন সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
৭. দক্ষ চালক তৈরির প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বৃদ্ধি করে তাঁদের বেতন, কর্মঘণ্টা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে।
৮. স্বল্পগতির ছোট যানবাহনের জন্য সব মহাসড়কে সার্ভিস রোড নির্মাণসহ নিরাপদ রোড ডিজাইন করতে হবে।
৯. সব রেলক্রসিংয়ে গেটকিপার নিয়োগ করতে হবে।
১০. সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতন করতে ও দক্ষতা বাড়াতে জাতীয় বাজেটে অর্থ বরাদ্দ করতে হবে।
১১. প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। কারণ, তাঁরা জনপ্রশাসন পরিচালনা ও নীতিমালা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১২. টেকসই পরিবহন কৌশলের অধীনে সড়ক, রেল ও নৌপরিবহণ একত্র করে একটি অভিন্ন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গঠন করতে হবে।