জুলাই মেমোরিয়াল জাদুঘর প্রকল্প ঘিরে বিতর্ক
জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় যথাযথ নিয়মকানুন অনুসরণ করা হয়নি। ফারুকী নিজেই জাদুঘরের গভর্নিং বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে নিজেকে নিয়োগ দিয়েছিলেন
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬, ১০:৫৪ পিএম
জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠার প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর বিরুদ্ধে।
সম্প্রতি বিভিন্ন সরকারি নথিপত্র, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছে টাইমস অব বাংলাদেশ।
সেখানে তথ্য উঠে এসেছে যে, জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় যথাযথ নিয়মকানুন অনুসরণ করা হয়নি। ফারুকী নিজেই জাদুঘরের গভর্নিং বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে নিজেকে নিয়োগ দিয়েছিলেন।
সুশাসনের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পদক্ষেপ গুরুতর নৈতিক প্রশ্ন তোলে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান—যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন ঘটিয়েছিল—সেই ঘটনার দলিল, স্মারক ও সাক্ষ্য সংরক্ষণের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই জাদুঘর প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করে।
শুরুতে কর্মকর্তারা জাদুঘরটিকে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের একটি শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে পরবর্তীতে এই পরিকল্পনা পরিবর্তন করে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ার সিদ্ধান্ত হয়। সমালোচকদের মতে, ফারুকী উপদেষ্টা থাকাকালে তার প্রভাবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর সরকার একটি অধ্যাদেশ জারি করে জাদুঘরটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তীতে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রায় ৯৬ কোটি টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন করা হয়।
অধ্যাদেশের ৮ ধারা অনুযায়ী, ১৫ সদস্যের একটি বোর্ড জাদুঘর পরিচালনা করবে, যার নেতৃত্বে থাকবেন শিক্ষা, ইতিহাস, সাহিত্য বা সংস্কৃতির মতো ক্ষেত্রের একজন “বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ”।
তবে জাতীয় নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে ৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত সরকারি গেজেটে গভর্নিং বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয় এবং ফারুকীকে এর চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনীত করা হয়।
সুশাসনের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফারুকী যখন নিজেই মন্ত্রীর মর্যাদায় সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন, তখন এই নিয়োগ স্বার্থের সংঘাতের শামিল।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘যদি কেউ মন্ত্রীর মর্যাদায় উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বরত থাকেন, তবে একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে কোনো প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে বসা স্পষ্টতই স্বার্থের সংঘাত।’
তিনি আরও বলেন, ‘তিনি ব্যক্তিগতভাবে যোগ্য হতে পারেন, কিন্তু এমন একটি অবস্থানে থেকে নিজের সুবিধামতো যোগ্যতার মানদণ্ড নির্ধারণ করা কারো পক্ষেই শোভনীয় নয়।’
জাদুঘরের নিয়োগ বিধি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কর্মকর্তারা জানান, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় শুরুতে জাদুঘরের ১০৭টি পদের জন্য নিয়োগ নীতিমালা তৈরি করেছিল। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ফারুকী সেই নীতিমালা প্রত্যাখ্যান করেন এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের মাধ্যমে নতুন কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেন। ওই সময় আইন উপদেষ্টা ছিলেন আসিফ নজরুল।
প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের মতে, সংশোধিত বিধিমালায় শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অন্যান্য শর্ত শিথিল করা হয়েছে। সমালোচকদের যুক্তি, আগের শর্ত বহাল থাকলে ফারুকী নিজেই গভর্নিং বোর্ডের জন্য অযোগ্য বিবেচিত হতে পারতেন।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য আসিফ নজরুলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে নিয়োগের সময়সীমা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি ৯৬টি পদের জন্য দেওয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে আবেদনকারীদের সময় দেওয়া হয়েছিল মাত্র সাত দিন, যেখানে সময়সীমা শেষ হয় ৪ ফেব্রুয়ারি। সরকারি নিয়োগ নীতিমালায় সাধারণত আবেদনের জন্য অন্তত ২১ দিন সময় দেওয়ার নিয়ম রয়েছে।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের এক সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই তড়িঘড়ি সময়সূচি অস্বাভাবিক। তিনি বলেন, “দেখে মনে হচ্ছে উপদেষ্টা পদে থাকা অবস্থাতেই নিয়োগ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে।”
জাদুঘর পরিচালনার অধ্যাদেশে “বিশেষ যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের” জন্য নিয়োগের শর্ত শিথিল করার একটি ধারাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, সময়স্বল্পতার কারণে কর্তৃপক্ষ শুধু মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করেছিল, যদিও সরকারি চাকরিতে লিখিত পরীক্ষা একটি সাধারণ পদ্ধতি।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার বলেন, লিখিত পরীক্ষা এড়িয়ে যাওয়া স্বচ্ছতাকে ক্ষুণ্ণ করবে। তিনি আরও বলেন, “সময়স্বল্পতা যেটাই হোক, সরকারি নিয়োগে লিখিত পরীক্ষা অপরিহার্য। এটি ছাড়া প্রক্রিয়াটি অনিয়ম ও দুর্নীতির ঝুঁকিতে পড়ে।”
টাইমসের হাতে আসা নথিপত্র নিয়োগ বাছাই কমিটির গঠন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। জনপ্রশাসন বিধি অনুযায়ী, এসব কমিটি সাধারণত উপসচিব বা যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দ্বারা পরিচালিত হয়। কিন্তু ফারুকী কমিটির দায়িত্বে নিয়েছিলেন মন্ত্রণালয়ের তুলনামূলক জুনিয়র কর্মকর্তাদের, যার মধ্যে ছিলেন সিনিয়র সহকারী সচিব আজম উদ্দিন তালুকদার এবং সহকারী সচিব সেকান্দার আলী খান।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এই কর্মকর্তারা পদোন্নতিপ্রাপ্ত, ক্যাডারভুক্ত নন।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরিচালক (প্রযোজনা বিভাগ) ড্যানিয়েল আফজালুর রহমান এবং পরিচালক (থিয়েটার ও ফিল্ম) দীপক কুমার গোস্বামীকেও কমিটির সদস্য হিসেবে রাখা হয়।
অন্যদিকে জাদুঘর প্রকল্পের একটি চুক্তি নিয়েও আর্থিক অনিয়মের প্রশ্ন উঠেছে। নথিপত্র অনুযায়ী, জাদুঘরের জন্য ১৯টি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য ‘মিনহাজ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটি কোম্পানিকে প্রায় ৫.২৩ কোটি টাকার কাজ দেওয়া হয়। চলচ্চিত্র শিল্পের লোকজন টাইমসকে জানিয়েছেন, এই কোম্পানির কোনো আগের কাজের রেকর্ড সম্পর্কে তাদের জানা নেই। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন যে, কোম্পানিটির সঙ্গে ফারুকী বা তার সহযোগীদের যোগসূত্র থাকতে পারে, যদিও এর স্বপক্ষে কোনো দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এখন পর্যন্ত প্রায় ১৩,০০০ আবেদন জমা পড়েছে এবং ১,২০০ প্রার্থীকে সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে বারবার মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। তাকে টেক্সট বার্তার মাধ্যমে অভিযোগের বিস্তারিত পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি। [সূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ]