আদিলুরের সম্পদ দেড় কোটি বেড়েছে, রিজওয়ানার কমেছে
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:৪০ এএম
ছবি: সংগৃহীত
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাসহ সব উপদেষ্টার সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করা হয়েছে। এতে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের তথ্য জানানো হয়েছে। বিবরণীতে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি সম্পদ বেড়েছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানের। তার সম্পদ বেড়েছে এক কোটি ৫৪ লাখ ৭৭ হাজার ২৬২ টাকা।
সবচেয়ে কম বেড়েছে সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের। তার সম্পদ বেড়েছে আট লাখ ৫৬ হাজার ৭৭৯ টাকা।
এদিকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমার সম্পদ কমেছে।
গতকাল মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এক প্রজ্ঞাপনে ২০২৪ সালের ৩০ জুন ও ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অর্জিত সম্পদের হিসাব প্রকাশ করা হয়।
প্রজ্ঞাপন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত ৩০ জুন পর্যন্ত প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মোট পরিসম্পদ ছিল ১৫ কোটি ৬২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৫ টাকা। এক বছর আগে তা ছিল ১৪ কোটি এক লাখ ৩৯ হাজার ৬৭৩ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে প্রধান উপদেষ্টার সম্পদ বেড়েছে এক কোটি ৬১ লাখ চার হাজার ৩৯২ টাকা। সঞ্চয়পত্র নগদায়ন, সঞ্চয়ী বা মেয়াদি আমানতে বৃদ্ধি, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া শেয়ার ইত্যাদি কারণে মোট সম্পদ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
প্রধান উপদেষ্টার স্ত্রী আফরোজী ইউনূসের মোট পরিসম্পদ এক কোটি ২৭ লাখ ৬৩ হাজার ৩৬০ টাকা, যা আগের অর্থবছরে ছিল দুই কোটি ১১ লাখ ৭৭ হাজার ২৭৪ টাকা। সেই হিসাবে এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ৮৪ লাখ ১৩ হাজার ৯১৪ টাকা। আয়কর আইন অনুযায়ী, একজন করদাতার মালিকানাধীন স্থাবর-অস্থাবর, আর্থিক ও মূলধনী সম্পত্তির সমষ্টি হলো পরিসম্পদ।
অধ্যাপক ইউনূসের সম্পদের বিবরণের তথ্য অনুযায়ী, তার আর্থিক সম্পদের পরিমাণ ১৪ কোটি ৭৬ লাখ ৬৪ হাজার ৪০১ টাকা। এক বছর আগে এই অর্থের পরিমাণ ছিল ১৩ কোটি ১৮ লাখ ৭১ হাজার ৪৩৩ টাকা।
আর তার নন-ফিন্যানশিয়াল সম্পদ আছে ২১ লাখ ছয় হাজার ২৫০ টাকার। এক বছর আগে ছিল ২০ লাখ ৯২ হাজার ৫০০ টাকা। দেশের বাইরে তার সম্পদ আছে ৬৪ লাখ ৭৩ হাজার ৪১৪ টাকার। এক বছর আগে ছিল ৬১ লাখ ৭৫ হাজার ৭৪০ টাকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৩ সালের আয়কর আইন প্রণয়নের সময় ব্যক্তির সম্পদের সংজ্ঞা আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুসারে ঠিক করা হয়। সেখানে আর্থিক সম্পদ বলতে বোঝায়, নগদ টাকার পাশাপাশি ব্যাংকে রাখা টাকা এবং সঞ্চয়পত্র, বিভিন্ন শেয়ার, কম্পানি থেকে পাওয়া লভ্যাংশ ইত্যাদি। আর নন-ফিন্যানশিয়াল সম্পদ হলো আর্থিক সম্পদের বাইরে থাকা সম্পদ। এই তালিকায় আছে জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লটসহ সব ধরনের স্থাবর সম্পদ।
প্রধান উপদেষ্টার স্ত্রী আফরোজী ইউনূসের সম্পদ বিবরণীর তথ্য অনুযায়ী, তার আর্থিক সম্পদ আছে চার লাখ ৫১ হাজার ৮৬০ টাকার। এক বছর আগে এর পরিমাণ ছিল ৯৫ লাখ ৪১ হাজার ৬৭৯ টাকার। আর তার নন-ফিনানশিয়াল সম্পদের পরিমাণ এক কোটি ২৩ লাখ ১১ হাজার ৫০০ টাকার। এক বছর আগে এর পরিমাণ ছিল এক কোটি ১৬ লাখ ৩৫ হাজার ৫৯৫ টাকার। তার বিদেশে কোনো সম্পদ নেই। অধ্যাপক ইউনূসের কোনো দায় না থাকলেও তার স্ত্রীর ১৬ লাখ ৯৬ হাজার টাকার দায় রয়েছে।
অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের গত এক বছরে মোট পরিসম্পদ বেড়েছে পাঁচ লাখ ৬৫ হাজার ৩০৮ টাকা, ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের এক কোটি ১৩ লাখ ৮২ হাজার ৩৮১ টাকা, ড. আসিফ নজরুলের বেড়েছে ১২ লাখ ৮৭ হাজার ৭৯৯ টাকা, তৌহিদ হোসেনের ছয় লাখ ২৪ হাজার ৫৪৯ টাকা। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলমের বেড়েছে ১৫ লাখ ৫৪ হাজার ৮৯৯ টাকা, আদিলুর রহমান খানের এক কোটি ৫৪ লাখ ৭৭ হাজার ২৬২ টাকা, আলী ইমাম মজুমদারের ৫১ লাখ ৮২ হাজার ৫৭৪ টাকা, সিআর আবরারের ৫৫ লাখ ৪২ হাজার ২৫৪ টাকা, ফাওজুল কবির খানের ২৫ লাখ ৩৪ হাজার ৯৪০ টাকা, ফারুক-ই-আজমের ২৫ লাখ ৪৩ হাজার ৭৬৫ টাকা, ড. এম সাখাওয়াত হোসেনের বেড়েছে ২৬ লাখ ১৩ হাজার ৩৩৭ টাকা, নুরজাহান বেগমের চার লাখ ৯ হাজার ৮৩৭ টাকা, বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দারের এক কোটি ৩৬ লাখ ২৭ হাজার ৩৪৮ টাকা, ফরিদা আখতারের বেড়েছে ২০ লাখ ৯৬ হাজার ১৩১ টাকা। শারমীন এস মুরশিদের বেড়েছে ২৮ লাখ ৫৫ হাজার ৪৪৩ টাকা, ড. আ ফ ম খালিদ হোসেনের ২৫ লাখ ৭৬ হাজার ৩২৮ টাকা, শেখ বশিরউদ্দীনের ৫৪ লাখ ১২ হাজার ৫৩ টাকা, মাহফুজ আলমের বেড়েছে আট লাখ ৫৬ হাজার ৭৭৯ টাকা। এ ছাড়া প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টার পদমর্যাদা) আবদুল হাফিজের বেড়েছে ৮৪ লাখ ৬১ হাজার ৮২৮ টাকা ও ড. খলিলুর রহমানের দুই লাখ টাকা বেড়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার মতো অন্য উপদেষ্টাদের সম্পদ বাড়লেও গত এক অর্থবছরে উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও সুপ্রদীপ চাকমার সম্পদ কমেছে। রিজওয়ানা হাসানের ২০২৪ সালের জুনে মোট পরিসম্পদের পরিমাণ ছিল দুই কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৫৫ টাকা। এর এক বছর পর তার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক কোটি ১২ লাখ ৭২ হাজার ৯২৪ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে তার সম্পদ কমেছে এক কোটি ১২ লাখ ৯২ হাজার ১৩১ টাকা। একই সময়ে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সম্পদ ছিল দুই কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা। এক বছর পর তার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দুই কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। সুপ্রদীপ চাকমার সম্পদ ছিল এক কোটি ২৬ লাখ ৩৩ হাজার ১৪১ টাকা। এক বছর পর তার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক কোটি ৯ লাখ ৯৮ হাজার ৭৯৬ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে তার সম্পদ কমেছে ১৬ লাখ ৩৪ হাজার ৩৪৫ টাকা। এ ছাড়া আসিফ মাহমুদের টিআইএন না থাকায় তার সম্পদের হিসাব প্রকাশ করা হয়নি।
২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থানের কথা তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেছিলেন, সব উপদেষ্টা দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করবেন। পর্যায়ক্রমে এটি সরকারি সব কর্মকর্তার ক্ষেত্রেও নিয়মিত ও বাধ্যতামূলক করা হবে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদে প্রতিশ্রুত ন্যায়পাল নিয়োগে অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হবে বলেও তিনি ভাষণে উল্লেখ করেছিলেন। ওই বছরের ১ অক্টোবর ‘অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের আয় ও সম্পদ বিবরণী প্রকাশের নীতিমালা, ২০২৪’ জারি করা হয়। নীতিমালায় বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি, যারা সরকার বা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত, তারা প্রতিবছর আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সর্বশেষ তারিখের পরবর্তী ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাদের আয় ও সম্পদের বিবরণী জমা দেবেন। স্ত্রী বা স্বামীর পৃথক আয় থাকলে সেটিও জমা দিতে হবে। এই বিবরণী প্রধান উপদেষ্টা নিজ বিবেচনায় উপযুক্ত পদ্ধতিতে প্রকাশ করবেন। কিন্তু এত দিনেও তা প্রকাশ না করায় সমালোচনা হচ্ছিল। এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম গত সোমবার জানিয়েছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদের বিবরণী দু-এক দিনের মধ্যে প্রকাশ করা হবে।
