EN ☀️
×

Follow Us

বাংলাদেশ

মন্ত্রীদের ইচ্ছেমতো প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষমতায় লাগাম

ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা

প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:৫৪ পিএম

মন্ত্রীদের ইচ্ছেমতো প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষমতায় লাগাম
অ অ

নিজের মন্ত্রণালয়ে প্রকল্প অনুমোদনের যে ক্ষমতা এত দিন ধরে পেয়ে আসছিলেন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা, তা আর পারছেন না। তাদের এ ক্ষমতায় লাগাম টানতে একটি নির্দেশিকা সংশোধন করেছে বর্তমান সরকার। ফলে ৫০ কোটির বেশি টাকার প্রকল্প হলে তা পাঠাতে হবে পরিকল্পনা কমিশনে।

১২ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় এ পরিবর্তন আনা হয়। দুর্নীতি এড়াতে এই পরিবর্তনকে ইতিবাচক মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদন করতে গিয়ে আবার যেন দীর্ঘসূত্রতা তৈরি না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে বলেছেন তাঁরা।

এত দিন স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, আধা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, করপোরেশন, রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির শতভাগ নিজস্ব অর্থায়নের প্রকল্প–সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা অনুমোদন দিতে পারতেন। এখন ৫০ কোটি টাকার বেশি অর্থের প্রকল্প হলে পাঠাতে হবে পরিকল্পনা কমিশনে।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কোনো স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, আধা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, করপোরেশন, রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি শতভাগ নিজস্ব অর্থায়নে ৫০ কোটি টাকার বেশি অর্থের প্রকল্প নিলে তা পরিকল্পনা কমিশনে পাঠাতে হবে। সেখানে প্রকল্প যাচাই-বাছাই শেষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন নিতে হবে। এ কমিটির সভাপতি হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী বা সরকার প্রধান। তবে প্রকল্প ব্যয় ৫০ কোটি টাকার নিচে হলে তা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা আগের মতোই অনুমোদন দিতে পারবেন।

এত দিন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা তাদের মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, আধা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, করপোরেশন, রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির শতভাগ নিজস্ব অর্থায়নের যেকোনো প্রকল্প অনুমোদন করতে পারতেন। তাতে অর্থায়নের কোনো সীমারেখা ছিল না।

২০২২ সালে অনুমোদিত ‘সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন নির্দেশিকার’ ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা ছিল, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, আধা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, করপোরেশন, রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির শতভাগ নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাবিত প্রকল্প–সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী অনুমোদন করবেন। সেই অনুচ্ছেদই সংশোধন করা হয়েছে।

মূল্যায়ন হতো না, জবাবদিহি থাকত না

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা। ঢাকার পাশে পূর্বাচলের অবকাঠামো উন্নয়নে ৮ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প গ্রহণ করে রাজউক, সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে। প্রকল্পটি একনেকে না পাঠিয়ে নিজেদের অর্থায়নে বাস্তবায়নের জন্য গত ১৬ অক্টোবর পরিকল্পনা কমিশনের মতামত চেয়ে রাজউক চিঠি দেয়।

ওই চিঠির জবাবে ৯ ডিসেম্বর পরিকল্পনা কমিশন জানায়, স্ব-অর্থায়নে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পূর্বাচল অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠাতে হবে। প্রকল্পটি একনেক সভায় অনুমোদন করতে হবে।

এ নিয়ে পরিকল্পনা কমিশন ও রাজউকের মধ্যে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব চলছিল।

পরিকল্পিত উন্নয়ন ও সমন্বয়ের জন্য সরকারের এ উদ্যোগ ইতিবাচক। কারণ, অনেক সময় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো মন্ত্রীদের পছন্দমতো প্রকল্প নিয়ে থাকে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নিজস্ব অর্থায়নে সবচেয়ে বেশি প্রকল্প বাস্তবায়ন করে থাকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। এ মন্ত্রণালয়ের অধীন পিডিবি, আরইবি, ডিপিডিসি, ডেসকোসহ অনেক স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা নিজেদের অর্থায়নে অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করে থাকে। প্রকল্পগুলো একনেকে পাঠাতে হয় না, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বা উপদেষ্টা অনুমোদন করতে পারেন।

এসব প্রকল্পে আসলে কী হয়, তা সরকারের অন্য কারও জানার সুযোগ থাকে না। এ ছাড়া সিটি করপোরেশন, ওয়াসাসহ সরকারের অন্যান্য স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা নিজেদের অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে থাকে। সেসব প্রকল্পে কোনো জবাবদিহি থাকে না বলেও অভিযোগ রয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের এক নথিতে উঠে এসেছে, এমন প্রকল্পগুলো বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাইরে থাকায় সরকারি সংস্থা বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) মাধ্যমে নজরদারি ও মূল্যায়ন করা হয় না। তৃতীয় কোনো পক্ষের মাধ্যমে প্রকল্পের মূল্যায়ন ও নজরদারি হয় না। এ কারণে কাউকে জবাবদিহির আওতায় আনা যায় না। উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে প্রকল্প প্রস্তাব ও গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন একই প্রক্রিয়ায় আনা প্রয়োজন।

পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, বড় অঙ্কের প্রকল্পে কোনো ধরনের সমীক্ষা ও যাচাই ছাড়া মন্ত্রী পর্যায়ের অনুমোদনকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়া হয়। এতে প্রকল্পের উদ্দেশ্য জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না কিংবা ব্যয় যৌক্তিক কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না।

সূত্র জানায়, অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প ব্যয় অযৌক্তিকভাবে বাড়ানো, প্রয়োজনহীন প্রকল্প গ্রহণ এবং বাস্তবায়নে গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। এসব বিষয় বিবেচনায় এনে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

নতুন সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নের প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। প্রকল্পের উদ্দেশ্য, কার্যক্রম, ব্যয়ের খাতভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং সম্ভাব্য ফলাফল পরিকল্পনা কমিশন যাচাই করবে। ৫০ কোটি টাকার ওপরে কোনো প্রকল্প একনেকের অনুমোদন ছাড়া বাস্তবায়ন করা যাবে না।

নিজস্ব অর্থায়ন প্রকল্পের বাজে দৃষ্টান্ত

ঢাকার মিরপুরের কালশীতে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষদের কাছে ফ্ল্যাট বিক্রিতে ২০১৫ সালে একটি প্রকল্প হাতে নেয় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। স্বপ্ননগর আবাসিক প্রকল্পের (পর্ব-১) আওতায় গ্রাহকদের ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়ার কথা ২০১৮ সালে। দেড় হাজার বর্গফুটের প্রতি ফ্ল্যাটে গ্রাহকদের কাছ থেকে ৬৪ লাখ টাকা করে নেওয়ার কথা বলা হয়। তবে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে পারেনি সংস্থাটি। তিন বছর দেরিতে ফ্ল্যাট হস্তান্তর করা হয়। ফ্ল্যাটের দাম বাড়িয়ে নেওয়া হয় ৭৮ লাখ টাকা। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারা, ফ্ল্যাটের দাম বাড়িয়ে নেওয়া নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। তা ছাড়া কাজের মান নিয়েও তৈরি হয় প্রশ্ন। সূত্র: প্রথম আলো

আরও পড়ুন