সিন্ডিকেটে বন্দী জনগণ-দ্বিতীয় পর্ব
ওষুধের বাজার সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে
কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাড়ানো হচ্ছে দাম
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:১০ এএম
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার সিদ্ধান্ত নিলেও বাস্তবে তার কোনো প্রভাব পড়েনি বাজারে। সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে নির্ধারিত দামে মিলছে না জীবনরক্ষাকারী ওষুধ। উল্টো কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাড়ানো হচ্ছে দাম। এতে নাভিশ্বাস উঠছে সাধারণ মানুষের।
গত ৮ জানুয়ারি সরকার অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা সম্প্রসারণ করে। নতুন করে ১৩৫টি ওষুধ যুক্ত হওয়ায় বর্তমানে এই তালিকায় মোট ওষুধের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯৫। এসব ওষুধ সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করতে হবে—এমন নির্দেশনাও জারি করা হয়।
উপদেষ্টা পরিষদের সভায় অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের হালনাগাদ তালিকা ও ওষুধের মূল্য নির্ধারণ নীতির অনুমোদন দেওয়া হয়। সভা শেষে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে) অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান জানান, তালিকাভুক্ত এসব ওষুধ দেশের ৮০ শতাংশ মানুষের প্রাথমিক চাহিদা পূরণ করবে এবং দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ রোগের চিকিৎসায় কার্যকর হবে।
তবে সিদ্ধান্তের তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও বাজারে এসব ওষুধ সরকার নির্ধারিত মূল্যে মিলছে না। ওষুধের দোকানে গেলে প্রথমেই জানানো হচ্ছে—ওষুধ নেই। পরে ক্রেতা অনুরোধ করলে বিক্রেতারা বলেন, আগের বেশি দামে কিনতে রাজি হলে ওষুধ দেওয়া যাবে।
একজন ভুক্তভোগী বলেন, সরকার শুধু দাম নির্ধারণ করেই দায়িত্ব শেষ করেছে। কিন্তু নির্ধারিত দামে ওষুধ বিক্রি হচ্ছে কিনা—সে বিষয়ে কোনো কার্যকর মনিটরিং নেই। ফলে সিন্ডিকেটের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় ওষুধ বাজার থেকেই উধাও হয়ে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, গত কয়েক মাসে তিন দফায় ওষুধের দাম বাড়ানো হয়েছে। কোনো কোনো ওষুধের দাম বেড়েছে দ্বিগুণ, আবার কোনো কোনো ওষুধের দাম বেড়েছে তার চেয়েও বেশি। বর্তমানে খাবারের ব্যয়ের তুলনায় চিকিৎসা ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।
বাংলাদেশে মূলত ছয়টি প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি ওষুধ উৎপাদন করে। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছেই কার্যত জিম্মি জনগণ। তারা যখন যেভাবে পারছে, সেভাবেই ওষুধের দাম নির্ধারণ করছে। দাম নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নিলেই তৈরি করা হচ্ছে কৃত্রিম সংকট। ফলে অতি জরুরি ওষুধও বাজারে মিলছে না।
এদিকে বৈধ ওষুধের পাশাপাশি ভেজাল ও নকল ওষুধেও সয়লাব বাজার। ঢাকায় পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো হলেও মফস্বলে ভেজাল ও নকল ওষুধের দৌরাত্ম্য মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এখানেও গড়ে উঠেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, ভেজাল ও নকল ওষুধ সেবনের ফলে কিডনি, ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগে শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। এমনকি মৃত্যুহার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবেও ভেজাল ওষুধকে দায়ী করছেন তাঁরা।
দেশের বৃহত্তম ওষুধের পাইকারি বাজার পুরান ঢাকার মিটফোর্ড এলাকায়। এখান থেকেই রাজধানীসহ সারা দেশে ওষুধ সরবরাহ হয়। অভিযোগ রয়েছে, অর্ধশতাধিক ব্যক্তির নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত নিয়ন্ত্রণ করছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, এসব নকল ও ভেজাল ওষুধ মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। অথচ আইন অনুযায়ী ওষুধ বিক্রি ও সংরক্ষণের দায়িত্ব ফার্মাসিস্টদের হলেও সারা দেশে প্রায় ৯০ শতাংশ দোকানেই ফার্মাসিস্ট নেই।
ওষুধ প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালানোর দাবি করা হলেও ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বাস্তবে এর কোনো দৃশ্যমান ফল নেই। বরং অভিযোগ রয়েছে, বিদেশি নামিদামি ওষুধ নকল করে বাজারজাত করা এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তাও জড়িত।
একদিকে কয়েকটি কোম্পানির দখলে থাকা ওষুধের বাজার, অন্যদিকে ভেজাল ও নকল ওষুধের দৌরাত্ম্য—সব মিলিয়ে সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের মানুষ। প্রশ্ন উঠছে, এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ আদৌ কতটা নিরাপদ?