EN ☀️
×

Follow Us

বাংলাদেশ

তফসিল ঘোষণা: প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সম্পূর্ণ ভাষণ

ডেইলি সানের পাঠকদের জন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের পুরো ভাষণ হুবহু তুলে ধরা হলো

ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা

প্রকাশ: ১১ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৬:৫৪ পিএম

তফসিল ঘোষণা: প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সম্পূর্ণ ভাষণ

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভাষণ/ ছবি সংগৃহীত

অ অ

জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার মাধ্যমে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা শুরু করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। এই ঘোষণার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু হলো।

বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) সন্ধ্যা ৬টায় বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারের মাধ্যমে একযোগে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের জাতির উদ্দেশে ভাষণের মাধ্যমে জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা শুরু হয়।

ডেইলি সানের পাঠকদের জন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের পুরো ভাষণ হুবহু তুলে ধরা হলো—

জুলাই আগস্ট ২০২৪ এর ছাত্র গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মৃতির প্রতি জানাচ্ছি আমার শ্রদ্ধা এবং তাদের আত্মার শান্তির জন্য দোয়া করছি। মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ এর ছাত্র গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত সার্বভৌমত্ব এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও রক্ষার সকল আন্দোলনে যারা আহত নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের প্রতি জানাই আমার আন্তরিক সমবেদনা। আহতদের দ্রুত আরোগ্য এবং স্বাভাবিক জীবনের জন্য প্রার্থনা করছি। 

প্রিয় দেশবাসী জাতি হিসেবে আমাদের অনুগ্রহ শক্তি হচ্ছে স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের জন্য আমাদের ভালোবাসা ও আত্মত্যাগ। জাতির প্রত্যাশাকে ধারণ করে আমাদের সংবিধান রাষ্ট্রের উপর জনগণের একচ্ছত্র মালিকানা নিশ্চিত করেছে। জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল মালিকানা প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ হচ্ছে নির্বাচন। দুঃখজনক হলেও সত্য যে মানসম্মত নির্বাচনের অনুপস্থিতি প্রায়শই আমাদের ঐতিহ্য এবং সামষ্টির প্রত্যাশাকে ম্লান করেছে। এমনি এক প্রেক্ষাপটে ২৪ এর গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে। আমাদের ভাই-বোন সন্তানদের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে আমাদের হচ্ছে একটি সুষ্ঠ ও সুন্দর নির্বাচন অনুষ্ঠান যা জাতি হিসেবে আমাদের প্রত্যাশা পূরণ করবে এবং বিশ্ব দরবারে আমাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস আপনারা একই প্রত্যাশা ধারণ করেন এবং একই অঙ্গীকারে অঙ্গীকারাবদ্ধ প্রিয় দেশবাসী সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে গত এক বছরে আমরা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদন করেছি। একটি স্বচ্ছ নির্বাচনের পূর্ব শর্ত হচ্ছে একটি নির্ভুল পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ ভোটার তালিকা। আমরা শুরুতেই এই কাজে হাত দেই। 

গত এক বছরে নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি ভোট বিমুখ এবং বাদ পড়া প্রায় ৪৫ লাখ ভোটারকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এবং ২১ লক্ষাধিক মৃত ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। নারী ভোটারদের যথাযথ অন্তর্ভুক্তির অভাবে পুরুষের সাথে নারী ভোটারের ব্যবধান বেড়ে প্রায় ২৯ লাখে গিয়ে দাঁড়ায়। বাদ পড়া নারী ভোটারদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে সেই ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা হয়েছে। আইন সংশোধন করে ভোটার হওয়ার যোগ্যতার তারিখ প্রতিবছর পয়লা জানুয়ারির পরিবর্তে কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত দিনে নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে ৩১শে অক্টোবর ২০২৫ পর্যন্ত যোগ্য তরুণ ভোটারগণ ভোট দিতে পারছেন। 

গত ১৮ নভেম্বর প্রকাশিত তারিখ অনুযায়ী বর্তমানে দেশে ভোটারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জনে। এর মধ্যে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ৬ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭ জন এবং নারী ভোটারের সংখ্যা ৬ কোটি ২৮ লাখ সাত হাজার ৯৪২ জন। গত এক বছরে নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সবার জবাবদিহিতা বাড়াতে আমরা বহুবিধ আইনি ও কাটাগত সংস্কার সম্পন্ন করেছি। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ এবং রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের আচরণবিধিতে যথাযথ পরিবর্তন সংশোধন ও পরিমার্জন করা হয়েছে। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের বিভিন্ন সুপারিশের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব মূল্যায়ন ও অংশীজনের পরামর্শের ভিত্তিতে এসব সংস্কার করা হয়েছে। এই উদ্যোগ সফলভাবে সম্পন্ন করতে সহযোগিতার জন্য আমি অন্তর্বর্তকালীন সরকার নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন ও জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনসহ সকল অংশীজনদের জানাই আমার কৃতজ্ঞতা। 

প্রিয় দেশবাসী বিভিন্ন কারণে এবারের নির্বাচন আমাদের জাতির ইতিহাসে অনন্য ও গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত প্রকৃত গণতান্ত্রিক ধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পাশাপাশি কাঙ্ক্ষিত সংস্কার প্রশ্নে সিদ্ধান্তের নির্বাচন এটি। এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে যা একটি নতুন অভিজ্ঞতা। দ্বিতীয়ত সংশ্লিষ্ট সব রাষ্ট্রীয় ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের জন্য এই নির্বাচন হচ্ছে সক্ষমতা প্রমাণ করে ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের অনন্য সুযোগ। তৃতীয়ত দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামের পর দেশের স্বার্থে রাজনৈতিক দলসমূহের মাঝে সৌহাদ্যপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার ধারা প্রবর্তনের দাবি রাখে এই নির্বাচন। চতুর্থত প্রায় অকার্যকর পোস্টাল ভোট ব্যবস্থাকে পরিমার্জন করে এই নির্বাচনে একটি কার্যকরী রূপ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের অন্যতম চালিকাশক্তি আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধা তথা প্রবাসী বাংলাদেশি ভোটারদের প্রথমবারের মত ভোটের আনা হচ্ছে। একইভাবে প্রথমবারের মতো ভোটের আওতায় আসছেন আইনি হেফাজতে থাকা ভোটারগণ। 

এছাড়াও নিজ নির্বাচনী এলাকার বাইরে কর্মরত সরকারি কর্মচারী এবং নির্বাচন অনুষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিগণ পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে এবার ভোট দেবেন। 

প্রিয় ভোটারবৃন্দ, ভোট আপনার শুধু নাগরিক অধিকারী নয় বরং পবিত্র আমানত ও দায়িত্ব। এই দায়িত্ব সচেতনভাবে আপনারা পালন করবেন। এই আমার বিশ্বাস যেকোনো ভয়ভীতি প্রলোভন প্রমঞ্চনা এবং সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে উঠে নিঃসংকচে আপনাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করুন আপনাদের নিরাপদ ও উৎসবমুখর অংশগ্রহণ নিশ্চিত গল্পে সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠান ও বাহিনী কাজ করবে ধর্ম গোত্র গোষ্ঠী লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলে এই আনন্দ আয়োজনে অংশগ্রহণ করুন পরিবারের প্রতিবন্ধী বয়স্ক ও সন্তান সম্ভাব মাসসহ সকলকে নিয়ে ভোট দিতে আসুন। আমি আশা করি আপনাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে ভোটের অনুষ্ঠান উৎসবে রূপ নেবে। 

প্রবাসে বসবাসরত প্রিয় ভোটারগণ প্রবাস থেকে ভোটদানের জন্য নিবন্ধন কার্যক্রম গত ১৮ নভেম্বর থেকে চলমান আছে। আগামী ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত পোস্টাল ভোট বিডি অ্যাপ এর মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোনো স্থান থেকে ভোটদানের জন্য আপনারা নিবন্ধন করতে পারবেন। আপনারা এই সুযোগ গ্রহণ করে ভোটে অংশ নিন। দেশ গঠনে আপনাদের অধিকার বুঝে নিন। প্রবাসী ভোটারগণ ছাড়াও দেশের ভিতরের তিন ধরনের ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে পারবেন যা ইতোমধ্যে উল্লেখ করেছি। প্রবাসী ভোটারগণের পাশাপাশি এই তিন ধরনের ভোটারগণ আগামীকাল থেকে শুরু করে আগামী ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত পোস্টাল ভোট বিডি অ্যাপের মাধ্যমে এবং নির্ধারিত পদ্ধতিতে পোস্টাল ভোটের জন্য নিবন্ধন করতে পারবেন। ব্যক্তি ভোটার ও প্রতিষ্ঠান সমূহের প্রতি আমার আহ্বান আসুন আমরা আমাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করি এবং ভোটে অংশ নেই। প্রিয় দেশবাসী বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়ানো হয়ে থাকে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অসত্য তথ্য ও অপতথ্যের বিস্তার দিনকে দিন বেড়ে চলেছে। প্রতিপক্ষ দল ও প্রার্থীকে হেয় করার পাশাপাশি নারীদের প্রতি বিদ্বেষমূলক প্রচারণা আমাদের ঐতিহ্যকে ক্ষুণ্ন করে এবং নির্বাচনকে কলুষিত করে। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী এসব রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আপনাদের প্রতি আমার বিশেষ অনুরোধ অসত্য এবং অসৎ উদ্দেশ্যে প্রচারিত কোন তথ্যে কান দেবেন না। গ্রহণ করবেন না। মনে রাখবেন অসত্য তথ্য শেয়ার করাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। 

আমি আবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ ইচ্ছুক প্রার্থী এবং দলসমূহের প্রতি দু একটি কথা বলতে চাই। আসুন আমরা আচরণবিধি মেনে একটি শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর নির্বাচন নিশ্চিত করি। শান্তিপূর্ণ সহায়বস্থান এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা নিশ্চিত করে ভোটারদের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জনী হোক। আপনাদের লক্ষ্য। নির্বাচনের দায়িত্ব পালনকারী প্রিয় সহ বৃন্দ নির্বাচন কমিশন স্বচ্ছতা নিরপেক্ষতা এবং দৃঢ়তার সাথে দায়িত্ব পালনে বদ্ধপরিকর। কমিশনের অংশ হিসেবে আপনারা নির্ভয়ে সততা ও নিরপেক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করবেন। মনে রাখবেন এ ব্যাপারে কোন শিথিলতা বা গাফিলতি সহ্য করা হবে না। একটি সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে সংবাদ মাধ্যম ও পর্যবেক্ষক সংস্থার সহকর্মীদের ভূমিকা অপরিসীম। আপনারা স্বাধীনভাবে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব নিরপেক্ষতা ও বস্তুনিষ্ঠতার সাথে আপনাদের দায়িত্ব পালন করবেন এটি আমাদের প্রত্যাশা। 

প্রিয় দেশবাসী আমি এ পর্যায়ে নির্বাচনী তফসিল তথা নির্বাচন সংক্রান্ত সময়সূচি ঘোষণা করছি। আগামী ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ১২ তারিখ রোজ বৃহস্পতিবার ৩০০ আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ সাধারণ নির্বাচন এবং একই সাথে জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ এর ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন পত্র দাখিলের শেষ তারিখ আগামী ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ রোজ সোমবার। মনোনয়ন পত্র বাছাই হবে আগামী ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ রোজ মঙ্গলবার এবং জানুয়ারি ৬ রোজ রবিবার পর্যন্ত রিটার্নিং অফিসারের আদেশের বিরুদ্ধে কমিশনে আপিল দায়েরের শেষ তারিখ ১১ জানুয়ারি ২০২৬ রোজ রবিবার কমিশনে দায়েরকৃত আপিল নিষ্পত্তির তারিখ ১২ জানুয়ারি ২০২৬ রোজ সোমবার থেকে ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ রোজ রবিবার পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি ২০২৬ রোজ মঙ্গলবার রিটার্নি অফিসার কর্তৃক চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ ও প্রতীক বরাদ্দ ২১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখ রোজ বুধবার নির্বাচনী প্রচারণা চলবে ২২ জানুয়ারি ২০২৬ রোজ বৃহস্পতিবার হতে ভোট গ্রহণ শুরুর ৪৮ ঘণ্টা আগ পর্যন্ত। আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের ১২ তারিখ রোজ বৃহস্পতিবার নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সব রাজনৈতিক দল ও প্রতিদ্বন্দী প্রার্থীসহ ভোটারদের আন্তরিক অংশগ্রহণ ও সক্রিয় সহযোগিতা কামনা করছি। সবার প্রতি আমার আহ্বান আসন্ন ত্রয়োদ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সফল করে আমাদের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখুন। মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।

আরও পড়ুন