EN ☀️
×

Follow Us

বাংলাদেশ

ধান-আলু-পেঁয়াজ-তামাকে লোকসান, দিশেহারা উত্তরাঞ্চলের কৃষক

উৎপাদন খরচের অর্ধেকও উঠছে না; মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য আর বাজার তদারকির অভাবে বিপাকে চাষি

ডেইলি সান রিপোর্ট, লালমনিরহাট

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬, ০৫:৩৩ পিএম

ধান-আলু-পেঁয়াজ-তামাকে লোকসান, দিশেহারা উত্তরাঞ্চলের কৃষক

ছবি: সংগৃহীত

অ অ

সারা বছর মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলান, কিন্তু বিক্রির সময় ন্যায্যমূল্য মেলে না— এই হতাশার গল্প এখন উত্তরাঞ্চলের লাখো কৃষকের। ধান, আলু, পেঁয়াজ ও তামাক— একের পর এক ফসলে লোকসান গুনতে গুনতে ঋণের বোঝায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে।

বোরো মৌসুমে ধান কাটার ধুম পড়েছে উত্তরের আট জেলায়। মাঠ থেকে উঠোনে আসছে ধান, চলছে মাড়াই ও শুকানোর কাজ। কিন্তু কৃষকের মুখে হাসি নেই। বাজারে এক মণ ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৭০০ থেকে ৮৫০ টাকায়, অথচ একজন ধানকাটা শ্রমিকের মজুরিই লাগছে ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা। ফলে শ্রমিক খরচই উঠছে না, লাভের কথা তো দূরে থাক।

লালমনিরহাট সদর উপজেলার রাজপুর ইউনিয়নের কৃষক বেলাল হোসেন বলেন, ‘সার, বীজ, সেচ ও শ্রমিক খরচ কয়েকগুণ বেড়েছে। কিন্তু ফসল বিক্রির সময় ন্যায্যমূল্য পাচ্ছি না।’

এ বছর লালমনিরহাট জেলায় বোরো ধানের আবাদ হয়েছে ৪৮ হাজার ১১০ হেক্টরে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১১০ হেক্টর বেশি। ফলনও ভালো হয়েছে। তবে, সরকার প্রতি কেজি বোরো ধান ৩৬ টাকায় কেনার ঘোষণা দিলেও, ৩ মে থেকে ক্রয় শুরু হওয়ার পর বাজারে তেমন প্রভাব পড়েনি। নানা জটিলতায় সরকারি গুদামে ধান বেচতে আগ্রহ নেই কৃষকের।

রবি মৌসুমে সার সংকটের মধ্যে দ্বিগুণ দামে সার কিনে আলু উৎপাদন করতে হয়েছে কৃষকদের। প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে খরচ পড়েছে ১৩ থেকে ১৬ টাকা, অথচ ভরা মৌসুমে বিক্রি হয়েছে মাত্র ৮ টাকায়। প্যাকেজিং ও সংরক্ষণ খরচ যোগ করলে কেজিপ্রতি দাঁড়ায় ১৯ থেকে ২০ টাকা, আর বর্তমান বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৪ টাকায়। উত্তরাঞ্চলের আট জেলায় দেশের মোট আলু উৎপাদনের প্রায় ৩৪ শতাংশ হয়ে থাকে, ফলে এই লোকসানের ধাক্কা বিশাল।

এবার আবহাওয়া অনুকূল থাকায় পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হয়েছে। কিন্তু মুড়িকাটা পেঁয়াজের বাজার নিম্নমুখী থাকায় ভরা মৌসুমে প্রতি মণ বিক্রি করতে হয়েছে মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়। উৎপাদন খরচের ধারেকাছেও নেই এই দাম।

উত্তরাঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে তামাকের ভূমিকা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। কোম্পানিগুলোর প্রণোদনায় সার, বীজ ও অর্থ পেয়ে অনেক কৃষক তামাক চাষে ঝুঁকেছিলেন। কিন্তু এবার সেই কোম্পানিগুলোই সিন্ডিকেট করে দাম কমিয়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ চাষিদের। যাদের কোম্পানির কার্ড আছে কেবল তাদের কাছ থেকে নির্ধারিত পরিমাণ তামাক নেওয়া হচ্ছে। কার্ডবিহীন চাষিরা কোম্পানি মূল্যের অর্ধেকেরও কম দামে তামাক বেচতে বাধ্য হচ্ছেন। ক্ষোভে কেউ কেউ উৎপাদিত তামাকে আগুন দিয়ে প্রতিবাদ জানালেও কোনো সাড়া মেলেনি।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারি বাজার তদারকি জোরদার, সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কৃষকের সরাসরি বাজারে বিক্রির সুযোগ বাড়ানো এখন জরুরি।

তবে কৃষকদের বক্তব্য আরও সরল— ‘সারা বছর কষ্ট করে চাষ করি, কিন্তু ফসল বিক্রি করে লাভ তো হয়ই না, উল্টো ঋণের বোঝা বাড়ছে।’

এই দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে আগামীতে ধানসহ অন্যান্য ফসল চাষে আগ্রহ হারাবেন কৃষক— এমন আশঙ্কাই করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরও পড়ুন