গ্রহের তালিকা থেকে বাদ পড়ল প্লুটো, কেন এই সিদ্ধান্ত?
৭৬ বছর গ্রহ থাকার পর ‘ডোয়ার্ফ প্ল্যানেট’ হলো সৌরজগতের নবম সদস্য; বিতর্ক এখনও চলছে
ডেইলি সান রিপোর্ট
প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬, ০৪:৩২ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
একসময় সৌরজগতের নবম গ্রহ হিসেবে পরিচিত প্লুটো এখন আর গ্রহ নয়। ২০০৬ সালের ২৪ আগস্ট আন্তর্জাতিক অ্যাস্ট্রোনোমিকাল ইউনিয়নের (আইএইউ) সদস্যদের ভোটে প্লুটোর মর্যাদা ‘গ্রহ’ থেকে ‘ডোয়ার্ফ প্ল্যানেট’- এ নামিয়ে আনা হয়। এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ বৈজ্ঞানিক গবেষণা, নতুন আবিষ্কার এবং গ্রহের সংজ্ঞা নিয়ে তীব্র বিতর্ক।
যেভাবে আবিষ্কার হয়েছিল প্লুটো
গল্পটা শুরু ১৮শ শতকে। বিজ্ঞানীরা তখন লক্ষ্য করেন, ইউরেনাস তার নির্ধারিত কক্ষপথ ঠিকমতো মেনে চলছে না। ফরাসি জ্যোতির্বিজ্ঞানী অ্যালেক্সিস বোভার্ড গবেষণা করে দেখান, ইউরেনাস বারবার পূর্বানুমান করা পথ থেকে সরে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, অদৃশ্য কোনো বড় বস্তু ইউরেনাসকে টানছে।
সেই অনুসন্ধান থেকেই ১৮৪৬ সালে আবিষ্কার হয় নেপচুন। কিন্তু নেপচুন আবিষ্কারের পরও ইউরেনাসের কক্ষপথে অস্বাভাবিকতা থেকেই যায়। এরপর পার্সিভাল লোয়েল অনুমান করেন, নেপচুনের বাইরেও আরেকটি বড় গ্রহ আছে। তিনি এর নাম দেন ‘প্লানেট এক্স’। ১৯০৬ সাল থেকে দীর্ঘ অনুসন্ধান চালিয়ে ব্যর্থ হয়ে ১৯১৬ সালে তার মৃত্যু হয়।
অবশেষে ১৯২৯ সালে এই অনুসন্ধানের দায়িত্ব পান তরুণ জ্যোতির্বিজ্ঞানী ক্লাইড টমবগ। রাতে আকাশের ছবি তুলে দিনে বিশেষ যন্ত্র ‘ব্লিঙ্ক কম্পারেটর’- এর সাহায্যে ছবি তুলনা করতেন তিনি। অনেক মাস পরিশ্রমের পর ১৯৩০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জেমিনি নক্ষত্রমণ্ডলে একটি ছোট চলমান বিন্দু দেখতে পান। সেটিই ছিল বহুদিন ধরে খোঁজা ‘প্লানেট এক্স’। রোমান পাতাল দেবতার নামে এর নাম রাখা হয় ‘প্লুটো’।
যে কারণে গ্রহের তালিকা থেকে বাদ
শুরু থেকেই প্লুটোকে নিয়ে সন্দেহ ছিল। বড় টেলিস্কোপেও এর আকার স্পষ্ট ছিল না। ১৯৭৮ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী জেমস ক্রিস্টি প্লুটোর সবচেয়ে বড় চাঁদ ক্যারন আবিষ্কার করলে জানা যায়, প্লুটোর ভর এমনকি পৃথিবীর চাঁদের চেয়েও কম।
এরপর ১৯৯০-এর দশকে আরও বড় ধাক্কা আসে। উন্নত ক্যামেরা প্রযুক্তির সাহায্যে দেখা যায়, নেপচুনের বাইরে প্লুটোর মতো আরও অনেক বস্তু রয়েছে— এগুলোকে বলা হয় কুইপার বেল্ট অবজেক্টস। এরপর একে একে আবিষ্কার হয় কোয়ার, সেডনা, মেকমেক ও এরিস। তখন প্রশ্ন ওঠে, যদি প্লুটো গ্রহ হয়, তাহলে এগুলোও কি গ্রহ?
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে ২০০৬ সালে আইএইউ গ্রহের নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ করে। সেই সংজ্ঞা অনুযায়ী গ্রহ হতে হলে তিনটি শর্ত পূরণ করতে হবে— সূর্যকে কেন্দ্র করে কক্ষপথে ঘুরতে হবে, নিজের ভরের কারণে আকার প্রায় গোলাকার হতে হবে এবং নিজের কক্ষপথের আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে।
প্লুটো প্রথম দুটি শর্ত পূরণ করলেও তৃতীয় শর্তটি পূরণে ব্যর্থ। কারণ তার কক্ষপথে এখনো অনেক বরফ ও ছোট বস্তু ঘুরে বেড়ায়। তাই প্লুটোকে ‘গ্রহ’ নয়, ‘ডোয়ার্ফ প্ল্যানেট’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয় এবং এটিকে কুইপার বেল্ট বস্তু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
বিতর্ক এখনও থামেনি
এই সিদ্ধান্ত মেনে নেননি অনেকেই। একদল বিজ্ঞানী বলছেন, পৃথিবী বা বৃহস্পতিও পুরোপুরি এই সংজ্ঞা মেনে চলে না। কেউ কেউ আবেগগত কারণে প্লুটোকে গ্রহ হিসেবেই রাখার পক্ষে। অনেকে মনে করেন, প্লুটো গ্রহ না হলে কুইপার বেল্টের অন্যান্য বস্তুগুলোকেও গ্রহের মর্যাদা দেওয়া উচিত।
তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্লুটোকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া মানে এটিকে অপ্রয়োজনীয় ঘোষণা করা নয়। বরং এই সিদ্ধান্ত আমাদের সৌরজগতের গঠন ও ইতিহাস সম্পর্কে আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করেছে।