গেমিংয়ে স্মৃতিভ্রষ্টতা হয় নাকি না? গবেষণায় এলো নতুন তথ্য
নিয়মিত গেম খেললে স্মৃতিভ্রষ্টতার ঝুঁকি ১৯% পর্যন্ত কমে
প্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৪২ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
ইলন মাস্ক রসিকতা করে বলেছেন ‘ভিডিও গেম খেলো নতুবা বোকা বনে যাও’। ভিডিও গেম খেলার সাথে ডিমেনশিয়ার (স্মৃতিভ্রষ্টতা) ঝুঁকি হ্রাস এবং উন্নত বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্ষমতার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তবে নতুন এক গবেষণায় ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। যা বরং মাস্কের বক্তব্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
ইলন মাস্ক সম্প্রতি ভিডিও গেম নিয়ে তার এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে লেখেন, ‘ভিডিও গেম খেলো অথবা বোকা বনে যাও! তোমাদের কাছে কেবল এই ২টি বিকল্পই আছে।’ তার এই পোস্টটি এমন সময়ে এসেছে যখন একটি গবেষণায় খতিয়ে দেখা হচ্ছিল যে, গেমিং কি কেবল বিনোদন দেওয়ার চেয়েও বেশি কিছু করতে পারে কি না।
৪ লাখ ৭১ হাজার ৩৪৬ জন মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করে চালানো একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত কম্পিউটার গেম খেলতেন, তাদের ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কম। আর তারা খুব কম বা কখনোই গেম না খেলা মানুষদের তুলনায় বেশ কয়েকটি কগনিটিভ টেস্ট বা বুদ্ধিবৃত্তিক পরীক্ষা ভালো করে সম্পন্ন করেছেন। ২০২৪ সালের এ গবেষণায় গবেষকেরা মস্তিষ্কের গঠনের সাথেও গেমিংএর যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন।
তবে, এই গবেষণাটি নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে না যে ভিডিও গেম খেললেই ডিমেনশিয়া প্রতিরোধ করা যায়। বরং, একটি পারস্পরিক সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছে এবং আলাদা একটি জেনেটিক বিশ্লেষণে এর সম্ভাব্য কারণগত যোগসূত্রের কথা উল্লেখ করেছে।
ভিডিও গেম এবং ডিমেনশিয়া সম্পর্কে ২০২৪ সালের জুনে 'আলঝেইমার্স রিসার্চ অ্যান্ড থেরাপি' সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণায় 'ইউকে বায়োব্যাংক' এর তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। গবেষকেরা ৪ লাখ ৭১ হাজার ৩৪৬ জন শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ অংশগ্রহণকারীর ওপর নজর রাখেন। যাদের গবেষণার শুরুতে ডিমেনশিয়া ছিল না। এই অনুসরণের গড় সময়কাল ছিল ১৩.৭ বছর।
অংশগ্রহণকারীদের জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তারা কম্পিউটার গেম খেলেন কী না এবং কত ঘন ঘন খেলেন। তাদের তিনটি দলে ভাগ করা হয়েছিল- যারা কখনোই বা খুব কম খেলেন, মাঝে মাঝে খেলেন, অথবা প্রায়শই খেলেন। এই পর্যবেক্ষণকালীন সময়ে ৭ হাজার ৮৯৮জন অংশগ্রহণকারীর ডিমেনশিয়া প্রকাশ পায়। যারা কখনোই বা খুব কম কম্পিউটার গেম খেলেন, তাদের তুলনায় যারা মাঝে মাঝে খেলেন তাদের ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি ১০% কম ছিল।
আর যারা নিয়মিত বা প্রায়শই গেম খেলেন, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি ১৯ শতাংশ কম দেখা গেছে। ভিডিও গেমাররা মস্তিষ্কের বেশ কয়েকটি পরীক্ষাতেও ভালো করেছেন।
তবে গবেষকেরা বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্ষমতার বিভিন্ন দিকও খতিয়ে দেখেছেন। যারা প্রায়শই কম্পিউটার গেম খেলেন, তারা গেম না খেলা বা খুব কম খেলা মানুষের তুলনায় প্রস্পেক্টিভ মেমরি (ভবিষ্যতের পরিকল্পনা মনে রাখা), রিঅ্যাকশন টাইম (প্রতিক্রিয়া জানানোর গতি), ফ্লুইড ইন্টেলিজেন্স (যৌক্তিক চিন্তাভাবনা), নিউমেরিক মেমরি (সংখ্যা মনে রাখা) এবং ভিজুওস্পেশিয়াল মেমরি (স্থানিক ধারণা) সংক্রান্ত পরীক্ষায় ভালো করেছেন।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে যে, নিয়মিত গেমিংয়ের সাথে মস্তিষ্কের 'হিপোক্যাম্পাস' অঞ্চলে ধূসর পদার্থের পরিমাণ বেশি থাকার সম্পর্ক রয়েছে—যা স্মৃতিশক্তি ও শেখার প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত। গবেষকেরা জানান, পূর্ববর্তী বেশ কিছু গবেষণাতেও ভিডিও গেমিং এবং বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্ষমতার মধ্যে এমন সম্পর্ক দেখা গেছে, যার মধ্যে বয়স্ক ব্যক্তি এবং মৃদু বুদ্ধিবৃত্তিক ঘাটতি বা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
এই গবেষণাটি কেবল গেমার এবং নন-গেমারদের মধ্যে সাধারণ তুলনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। গবেষকেরা একটি 'মেন্ডেলিয়ান র্যান্ডমাইজেশন' বিশ্লেষণ পরিচালনা করেন, যা জেনেটিক বৈচিত্র্য ব্যবহার করে এটি একটি কারণগত সম্পর্ক কি না তা পরীক্ষা করে।
এ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জিনগতভাবে যাদের কম্পিউটার গেমিংয়ের প্রবণতা বেশি, তাদের ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কম ছিল। এর বিপরীত পরিস্থিতিতে রিপোর্টেড অডস রেশিও ছিল ০.৩৭ শতাংশ।
গবেষকেরা বলেছেন এ বিষয়ে আরও বিস্তর গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। এর মানে কি ভিডিও গেম ডিমেনশিয়া প্রতিরোধ করে? তা একেবারেই নয়। গবেষকেরা এই ফলাফলগুলোকে কেবল "পারস্পরিক সম্পর্ক" বা অ্যাসোসিয়েশন হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন যে কম্পিউটার গেমিং ডিমেনশিয়া প্রতিরোধের একটি সম্ভাব্য উপায় "হতে পারে"।
তারা এটিও উল্লেখ করেছেন যে, গেমিংয়ের প্রভাব গেমের ধরন এবং এটি কোন ডিভাইসে খেলা হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করতে পারে। মূল বিশ্লেষণের জন্য গবেষণাটি ছিল পর্যবেক্ষণমূলক অর্থাৎ গবেষকেরা অংশগ্রহণকারীদের কেবল গেমিংয়ের অভ্যাস এবং স্বাস্থ্যগত ফলাফল পর্যবেক্ষণ করেছেন। কাউকে নির্দিষ্ট করে ভিডিও গেম খেলার দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।
কোন ধরনের গেম বুদ্ধিমত্তার ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং গেমিং আসলেই ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে পারে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বুঝতে আরও ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা ক্লিনিকাল পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে বলে গবেষকদের মত দিয়েছেন।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া