অনলাইনে প্রতারণার চেয়ে বড় ঝুঁকি তথ্য যাচাই না করা: নাজমুল হক সজীব
ডেইলি সান রিপোর্ট, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২৮ পিএম
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া পরিচয়, প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন, সন্দেহজনক লিংক, ফিশিং ও ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা নতুন নয়। তবে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে এসব প্রতারণার কৌশলও আরও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠছে। ফলে অনলাইনে প্রতারণা ঠেকাতে শুধু প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নয়, ব্যবহারকারীর তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাসকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক তরুণ উদ্যোক্তা ও পরিবেশকর্মী নাজমুল হক সজীব।
তার মতে, অনলাইনে কোনো তথ্য, পরিচয়, লিংক কিংবা জরুরি আর্থিক অনুরোধ দেখেই বিশ্বাস করার প্রবণতা ব্যবহারকারীদের বড় ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। পরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে যোগাযোগ এলেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা অর্থ লেনদেনের আগে বিকল্প মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিশ্বাসযোগ্যতার আড়ালে প্রতারণা
অনলাইন প্রতারণার বড় একটি অংশের ক্ষেত্রে প্রতারকরা সরাসরি ব্যবহারকারীর কাছে নিজেদের অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করে না। বরং পরিচিত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা, চাকরি, পুরস্কার, জরুরি সহায়তা কিংবা আর্থিক সুযোগের মতো বিশ্বাসযোগ্য বিষয় সামনে এনে ব্যবহারকারীকে সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে।
কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভুয়া অ্যাকাউন্ট বা পেজ ব্যবহার করা হয়। কখনো পাঠানো হয় সন্দেহজনক লিংক। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত তথ্য, ওটিপি, পাসওয়ার্ড বা আর্থিক তথ্য চাওয়ার মাধ্যমে ব্যবহারকারীকে ধাপে ধাপে ঝুঁকির মধ্যে নেওয়া হয়।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে ব্যবহারকারী যদি তথ্য যাচাই না করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে প্রতারণার সুযোগ আরও বাড়ে।
নাজমুল হক সজীব বলেন, অনলাইনে কোনো কিছু বিশ্বাস করার আগে তার উৎস, পরিচয় ও উদ্দেশ্য যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে অস্বাভাবিক জরুরি পরিস্থিতি তৈরি করে কেউ অর্থ বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চাইলে সরাসরি বিশ্বাস না করে অন্য একটি যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করা উচিত।
একটি ফোন কল, একটি লিংক বদলে যেতে পারে পরিস্থিতি
সাইবার নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের মতে, অনেক অনলাইন প্রতারণার ক্ষেত্রে অপরাধীরা ব্যবহারকারীর অসতর্কতার ওপর নির্ভর করে। একটি অপরিচিত লিংকে ক্লিক করা, সন্দেহজনক অ্যাপ ইনস্টল করা, অপরিচিত ব্যক্তিকে ওটিপি দেওয়া কিংবা একই পাসওয়ার্ড বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে ব্যবহার করার মতো বিষয় বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে ব্যক্তিগত তথ্য বেশি থাকায় এসব অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা নষ্ট হলে শুধু একটি অ্যাকাউন্ট নয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির যোগাযোগ, ছবি, পরিচিতজনের তথ্য এবং কখনো কখনো আর্থিক নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
সজীবের পরামর্শ, গুরুত্বপূর্ণ অনলাইন অ্যাকাউন্টে আলাদা ও শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহারের পাশাপাশি দুই স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা 2FA চালু রাখা উচিত। একই সঙ্গে সন্দেহজনক লগইন, অচেনা ডিভাইস ও অস্বাভাবিক কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
এআই যুক্ত হওয়ায় বাড়ছে নতুন চ্যালেঞ্জ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহজলভ্যতা অনলাইন নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। ছবি, কণ্ঠস্বর ও ভিডিওসহ বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট আগের তুলনায় সহজে তৈরি ও পরিবর্তন করা সম্ভব হচ্ছে।
ফলে শুধু ছবি বা কণ্ঠস্বর দেখে পরিচয় নিশ্চিত করার প্রবণতাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে বিষয়টিকে কেবল এআই-নির্ভর প্রতারণা হিসেবে দেখলে পুরো সমস্যাটি বোঝা যাবে না। মূল ঝুঁকির একটি জায়গা হলো—ব্যবহারকারী কোনো তথ্য কত দ্রুত বিশ্বাস করছেন এবং সেটি যাচাই করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যাচাই করছেন কি না।
এ কারণে জরুরি অর্থ চাওয়া, ব্যক্তিগত তথ্যের অনুরোধ, অস্বাভাবিক লিংক বা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ তৈরি হলে অতিরিক্ত সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
প্রতারণার শিকার হলে প্রথম কাজ কী?
অনলাইনে প্রতারণার শিকার হওয়ার পর অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে সংশ্লিষ্ট মেসেজ, পোস্ট বা অ্যাকাউন্টের তথ্য মুছে ফেলেন। এতে পরবর্তী সময়ে ঘটনা যাচাই ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
সজীবের মতে, এমন পরিস্থিতিতে প্রথমেই গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ করা দরকার। সংশ্লিষ্ট পোস্ট বা প্রোফাইলের স্ক্রিনশট, লিংক, মেসেজ, ফোন নম্বর, ই-মেইল, লেনদেনের তথ্য এবং সময়সহ প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ করা উচিত।
এরপর সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রিপোর্ট করার পাশাপাশি ঘটনার ধরন অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
শুধু আইন নয়, প্রয়োজন ব্যবহারকারীর সক্ষমতা
অনলাইন অপরাধ প্রতিরোধে আইন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রতিটি ব্যবহারকারীকে নিরাপদ ডিজিটাল আচরণ সম্পর্কে ধারণা না দিলে শুধু আইন দিয়ে সব ধরনের প্রতারণা প্রতিরোধ করা কঠিন।
বিশেষ করে তরুণ, শিক্ষার্থী ও নতুন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে তথ্য যাচাই, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, পাসওয়ার্ড ব্যবস্থাপনা, 2FA, ফিশিং শনাক্তকরণ এবং সন্দেহজনক কনটেন্ট সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
নাজমুল হক সজীব মনে করেন, সাইবার নিরাপত্তাকে শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় হিসেবে না দেখে দৈনন্দিন নাগরিক আচরণের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
যাচাই ছাড়া শেয়ারও তৈরি করতে পারে ঝুঁকি
অনলাইনে নিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তথ্য শেয়ার করার আগে যাচাই করা। কোনো ভুয়া খবর, বিভ্রান্তিকর ছবি, সম্পাদিত ভিডিও কিংবা সন্দেহজনক তথ্য যাচাই না করে শেয়ার করলে সেটি দ্রুত অনেক মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।
এতে শুধু ভুল তথ্য ছড়ায় না; কখনো কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা পরিবারের সামাজিক ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তাই কোনো কনটেন্ট দেখার পর সঙ্গে সঙ্গে শেয়ার না করে এর উৎস, প্রকাশের সময়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য সূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।
ডিজিটাল নিরাপত্তায় দায়িত্ব সবার
অনলাইন প্রতারণার বিরুদ্ধে প্রযুক্তিগত সমাধান, আইন প্রয়োগ এবং প্ল্যাটফর্মের দায়িত্ব—সবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ব্যবহারকারীর সচেতনতা ছাড়া এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা সীমিত হতে পারে।
একটি শক্তিশালী পাসওয়ার্ড, দুই স্তরের নিরাপত্তা, সন্দেহজনক লিংকে সতর্কতা কিংবা একটি ফোনকলের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা—ছোট ছোট কিছু অভ্যাস অনেক বড় ঝুঁকি কমাতে পারে।
নাজমুল হক সজীবের ভাষায়, ডিজিটাল নিরাপত্তার প্রথম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেক সময় কোনো সফটওয়্যার নয়—ব্যবহারকারীর সচেতন সিদ্ধান্ত।
অনলাইনে কোনো তথ্য বা অনুরোধ যতই বিশ্বাসযোগ্য মনে হোক, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কয়েক মুহূর্ত যাচাই করাই হতে পারে বড় ধরনের প্রতারণা থেকে বাঁচার সবচেয়ে সহজ উপায়।