EN ☀️
×

Follow Us

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

স্পেসএক্সের ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলার সাম্রাজ্যের নেপথ্যে যে নারী

গুয়েন শটওয়েল নর্থওয়েস্টার্ন থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে ক্যালিফোর্নিয়ার ‘অ্যারোস্পেস কর্পোরেশন’- এ কর্মজীবন শুরু করেন

প্রযুক্তি ডেস্ক

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ০৯:৩৪ পিএম

স্পেসএক্সের ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলার সাম্রাজ্যের নেপথ্যে যে নারী

ছবি: সংগৃহীত

অ অ

রেকর্ড ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল বাজারমূল্য নিয়ে শেয়ার বাজারে (আইপিও) যাওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে ইলন মাস্কের মহাকাশ গবেষণা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স।

রকেট বিজ্ঞান, স্যাটেলাইট যোগাযোগ ও মহাকাশ জয়ের সীমানাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার এই যাত্রায় বিশ্বজুড়ে মাস্কের নাম উচ্চারিত হলেও, এই বিশাল সাম্রাজ্য গড়ার পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছেন একজন নারী। তিনি হলেন স্পেসএক্সের প্রেসিডেন্ট ও চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) গুয়েন শটওয়েল। 

দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে নেপথ্যে থেকে মাস্কের উচ্চাভিলাষী স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া এবং কোম্পানির মজবুত বাণিজ্যিক ভিত গড়ে তোলার পর, আইপিও’র এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে তিনি এখন পাদপ্রদীপের আলোয়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট- এর এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

সহকর্মী ও মহাকাশ শিল্প পর্যবেক্ষকদের মতে, ৬২ বছর বয়সী শটওয়েল নিজের প্রকৌশলী দক্ষতা ও বিচক্ষণ ব্যবসায়িক বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে স্পেসএক্সকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছেন। অ্যাপলে স্টিভ জবসের পাশে টিম কুক কিংবা মেটাতে মার্ক জাকারবার্গের পাশে শেরিল স্যান্ডবার্গ যেভাবে অবদান রেখেছেন, স্পেসএক্সে মাস্কের পাশে শটওয়েলের ভূমিকাও ঠিক তেমনই।

স্পেসএক্সের শুরুর দিকের নির্বাহী জিম ক্যানট্রেলের ভাষায়— ‘ইলন কী চেয়েছিলেন এবং বাস্তবে কী করা সম্ভব, এই দুইয়ের মধ্যকার সেতু ছিলেন শটওয়েল।’

২০১৮ সালের এক টেড কনফারেন্সে নিজের কাজের ধরন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শটওয়েল বলেছিলেন, মাস্ক যখন কোনো অসম্ভব পরিকল্পনার কথা বলেন, তখন হুট করে ‘অসম্ভব’ না বলে গভীরভাবে ভেবে তা সফল করার পথ খুঁজে বের করাই তার কাজ। চলতি বছরের শুরুতে ‘টাইম’ ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে জানান, তার মূল লক্ষ্য হলো ‘ইলনের জন্য সহায়ক হওয়া’ এবং ‘কোম্পানির অগ্রগতিতে অবদান রাখা’।

নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করা গুয়েন শটওয়েল ক্যালিফোর্নিয়ার ‘অ্যারোস্পেস কর্পোরেশন’- এ তার কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে স্পেসএক্স প্রতিষ্ঠার বছর, অর্থাৎ ২০০২ সালে তিনি কোম্পানিটিতে যোগ দেন। মহাকাশ খাতে মাস্ক যখন অনভিজ্ঞ ও অপরিচিত ছিলেন, তখন শটওয়েলের বিস্তৃত পরিচিতি ও সুসম্পর্কই বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগের দ্বার খুলে দেয়।

ফ্যালকন ১ রকেটের উপর্যুপরি ব্যর্থতার কারণে স্পেসএক্স যখন তীব্র অর্থসংকটে দেউলিয়া হওয়ার মুখে, তখন শটওয়েলের নেতৃত্বে নাসার সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) রসদ সরবরাহের জন্য ১৬০ কোটি ডলারের একটি বিশাল চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিই স্পেসএক্সকে নতুন জীবন দেয় এবং এর পরপরই মাস্ক তাকে কোম্পানির প্রেসিডেন্ট পদে উন্নীত করেন।

স্যাটেলাইট অপারেটর ‘ইরিডিয়াম’- এর সঙ্গে তৎকালীন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক মহাকাশ উৎক্ষেপণ চুক্তিটি সম্পন্ন করেন শটওয়েল, যা স্পেসএক্সের গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

কোম্পানির এই অভাবনীয় সাফল্যের সাথে সাথে শটওয়েলের পারিশ্রমিকও আকাশচুম্বী হয়েছে। আইপিও’র নথি অনুসারে, স্টক অ্যাওয়ার্ডসহ গত বছর তার মোট আয়ের পরিমাণ ছিল ৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার।

সাবেক কর্মীরা শটওয়েলকে পুরো কোম্পানিকে একসঙ্গে ধরে রাখার ‘মূল চালিকাশক্তি বা আঠা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। চটকদার করপোরেট লাইফস্টাইলের বিপরীতে তাকে প্রায়ই গাঢ় ব্লেজার ও জিন্স পরা সাধারণ পোশাকে কারখানার প্রোডাকশন ফ্লোরে বা মিশন কন্ট্রোল রুমে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। কর্মী ছাঁটাইয়ের মতো কঠোর সিদ্ধান্তও তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নিতেন, যা কর্মীরা বর্ণনা করেছেন ‘যেন মধু ঝরছে’ এমন এক অনন্য শৈলী হিসেবে। কাজের ক্ষেত্রে কঠোর শৃঙ্খলা বজায় রেখেও তিনি দলের সবার আনুগত্য ও ঐক্য ধরে রাখতে পারতেন।

শেয়ার বাজারে প্রবেশ করার পর স্পেসএক্সের এই সূক্ষ্ম ও ভারসাম্যপূর্ণ পরিচালনা ব্যবস্থা আরও বড় পরীক্ষার মুখে পড়বে। বর্তমানে বিনিয়োগকারীরা যে ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্য নির্ধারণ করেছেন, তার পেছনে রয়েছে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং কিছু লক্ষ্য।

আইপিও’র এই চূড়ান্ত মুহূর্তে ইলন মাস্ক যখন এক্স-এ (সাবেক টুইটার) এআই এবং মহাকাশভিত্তিক ডেটাসেন্টার নিয়ে একের পর এক মহাকাশীয় পোস্ট করে যাচ্ছেন, শটওয়েল তখন ব্যস্ত বাস্তবসম্মত ও প্রচলিত কাজ নিয়ে। তিনি বার্সেলোনায় টেলিকম সম্মেলনে ‘স্টারলিংক’- এর প্রচার চালাচ্ছেন, ভারতে সেবাটি চালুর জন্য নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনা করছেন এবং এআই-এর জ্বালানি চাহিদার প্রভাব নিয়ে ওয়াশিংটনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন।

বর্তমানে স্পেসএক্সের আয়ের সিংহভাগ জোগান দিচ্ছে ‘স্টারলিংক’ স্যাটেলাইট ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্ক, যা বাণিজ্যিকভাবে সফল করার মূল কৃতিত্ব শটওয়েলের। এই আয় থেকেই চাঁদে শহর গড়া কিংবা নাসার ‘আর্টেমিস’ কর্মসূচির মতো ঝুঁকিপূর্ণ প্রজেক্টের খরচ মেটানো হচ্ছে। রকেট উৎক্ষেপণের ক্ষেত্রে শটওয়েল যে কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ও কার্যকারিতা দেখিয়েছেন, তা এই বিশাল ও বিস্তৃত সাম্রাজ্যের ক্ষেত্রেও ধরে রাখতে পারেন কি না— আসন্ন সময়ে সেটিই হবে তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

আরও পড়ুন