EN ☀️
×

Follow Us

ধর্ম

মহালয়া থেকে বিজয়া দশমী: দুর্গাপূজার শাস্ত্রীয় আচার ও ধর্মীয় তাৎপর্য

অভিজিৎ কর্মকার

অভিজিৎ কর্মকার

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৪১ পিএম

মহালয়া থেকে বিজয়া দশমী: দুর্গাপূজার শাস্ত্রীয় আচার ও ধর্মীয় তাৎপর্য
অ অ

মহালয়ার তর্পণ ও চণ্ডীপাঠ থেকে ষষ্ঠীর বোধন, সপ্তমীর নবপত্রিকা, অষ্টমীর সন্ধিপূজা, নবমীর হোম এবং দশমীর বিসর্জন দুর্গাপূজার প্রতিটি পর্বের রয়েছে স্বতন্ত্র ধর্মীয় তাৎপর্য। শরতের আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, ভোরের শিউলি আর ঢাকের আওয়াজ দুর্গাপূজার আগমনী বার্তা নিয়ে আসে। কিন্তু এই উৎসব কেবল আনন্দ, নতুন পোশাক কিংবা মণ্ডপে মণ্ডপে প্রতিমা দর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হিন্দুধর্মের শাক্ত ঐতিহ্যে (সনাতন হিন্দুধর্মের একটি প্রধান ধারা) দুর্গাপূজা হলো দেবীশক্তির আরাধনা, অশুভের বিরুদ্ধে শুভের বিজয় এবং মানুষের অন্তরের শক্তিকে জাগিয়ে তোলার এক গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উপলক্ষ।

বাংলার প্রচলিত শারদীয় দুর্গাপূজা মহালয়া থেকে শুরু করে বিজয়া দশমী পর্যন্ত এক ধারাবাহিক ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পর্বের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে। তবে মহালয়া মূলত পূর্বপুরুষদের স্মরণ ও দেবীপক্ষের সূচনার সঙ্গে যুক্ত; মূল আনুষ্ঠানিক দুর্গাপূজা সাধারণত ষষ্ঠীর বোধন থেকে শুরু হয়। এই সময়ের প্রতিটি আচার একদিকে যেমন পুরাণ ও পূজাপদ্ধতির সঙ্গে সম্পর্কিত, অন্যদিকে তেমনই বহু শতাব্দীর আঞ্চলিক ঐতিহ্য বহন করে।

মহালয়া: পিতৃপুরুষের স্মরণ ও দেবীপক্ষের সূচনা

মহালয়া আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের শেষ তিথি, অর্থাৎ অমাবস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রচলিত হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসে এই দিন পিতৃপক্ষের অবসান ঘটে এবং দেবীপক্ষের সূচনা হয়। ফলে দিনটি একদিকে পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের, অন্যদিকে দেবী দুর্গার আগমনের প্রতীক্ষা শুরু হওয়ার সময়।

তর্পণ ও পিতৃস্মরণ

মহালয়ার অন্যতম প্রধান আচার হলো পিতৃতর্পণ। হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুসারে, পরিবারের প্রয়াত পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে জল (পানি) নিবেদন করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে তিল, কুশ ও অন্যান্য উপকরণও ব্যবহৃত হয়। নদী, পুকুর বা নির্দিষ্ট জলাশয়ের তীরে পুরোহিতের নির্দেশনা অনুসরণ করে অনেকে এই আচার পালন করেন; পারিবারিক ও আঞ্চলিক প্রথা অনুযায়ী পদ্ধতিতে পার্থক্য থাকতে পারে।

তর্পণের মূল ভাবনা হলো কৃতজ্ঞতা ও স্মরণ। পূর্বপুরুষদের অবদান স্বীকার করা এবং তাদের আত্মার শান্তি কামনা করা এই আচারের ধর্মীয় তাৎপর্যের অংশ। তবে মহালয়ায় তর্পণ করতেই হবে এমন একক নিয়ম সব সম্প্রদায় বা পরিবারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

চণ্ডীপাঠ ও মহিষাসুরমর্দিনীর কাহিনি

মহালয়ার ভোরে চণ্ডীপাঠ শোনা বাংলার এক সুপরিচিত ঐতিহ্য। দেবীমাহাত্ম্য বা দুর্গাসপ্তশতী, যা মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত, দেবীর মাহাত্ম্য ও অসুরবিনাশের কাহিনি তুলে ধরে। মহিষাসুরের বিরুদ্ধে দেবী দুর্গার যুদ্ধ এবং তার বিজয়ের বর্ণনা দুর্গাপূজার ধর্মীয় তাৎপর্যের কেন্দ্রে রয়েছে।

মহালয়ার সঙ্গে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শোনার যে আবেগ জড়িয়ে আছে, তা মূলত বাংলার আধুনিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। এটি শাস্ত্রের কোনো বাধ্যতামূলক বিধান নয়; বরং চণ্ডীপাঠ, স্তোত্র (সংস্কৃত ভাষার সাহিত্যধারা), সংগীত ও বাচিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এক জনপ্রিয় ঐতিহ্য।

ষষ্ঠী: কল্পারম্ভ, বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস

ষষ্ঠী থেকে দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিক পর্ব শুরু হয়। প্রচলিত শাস্ত্রীয় পূজাপদ্ধতিতে এই দিনের সঙ্গে কল্পারম্ভ, বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের সম্পর্ক রয়েছে। তবে পূজার সময়সূচি ও আচারগুলোর বিন্যাস পরিবার, মন্দির এবং পুরোহিতের অনুসৃত পদ্ধতি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।

কল্পারম্ভ

কল্পারম্ভ হলো পূজার আনুষ্ঠানিক সূচনা। পুরোহিত নির্ধারিত বিধি অনুসারে পূজার সংকল্প করেন এবং পূজার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন। জলপূর্ণ ঘট স্থাপন, মন্ত্রপাঠ ও অন্যান্য প্রাথমিক আচার এই পর্বের অংশ হতে পারে।

বোধন: দেবীকে জাগ্রত করার আচার

শারদীয় দুর্গাপূজার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আচার হলো বোধন। শাক্ত ঐতিহ্যে শরৎকালের পূজাকে ‘অকালবোধন’ বলা হয়, কারণ প্রচলিত কাহিনিতে শ্রীরামচন্দ্র শরৎকালে দেবী দুর্গার আরাধনা করে তাকে জাগ্রত করেছিলেন বলে বর্ণনা পাওয়া যায়।

রামায়ণের বিভিন্ন সংস্করণ ও পরবর্তী ধর্মীয় সাহিত্যে এই কাহিনির বিবরণে পার্থক্য রয়েছে। বাংলার দুর্গাপূজার প্রচলিত ব্যাখ্যায় বোধন দেবীর আগমন ও আরাধনার সূচনাকে প্রতীকীভাবে প্রকাশ করে।

আমন্ত্রণ ও অধিবাস

আমন্ত্রণের মাধ্যমে দেবীকে পূজায় উপস্থিত থাকার জন্য আহ্বান জানানো হয়। অধিবাস হলো পূজাস্থান ও সংশ্লিষ্ট উপকরণকে ধর্মীয় আচার অনুযায়ী পবিত্র করে নেওয়ার প্রক্রিয়া। অনেক পূজায় বেলগাছের কাছে দেবীর বোধন ও আমন্ত্রণের আচার পালিত হয়।

এই আচারগুলোর তাৎপর্য শুধু প্রতিমার সামনে প্রদীপ জ্বালানো নয়; বরং পূজাস্থানকে প্রস্তুত করা, ভক্তিভরে দেবীকে আহ্বান জানানো এবং পরবর্তী পূজার জন্য ধর্মীয় পরিবেশ সৃষ্টি করা।

সপ্তমী: নবপত্রিকা স্নান ও মহাসপ্তমীর পূজা

মহাসপ্তমীর ভোরে নবপত্রিকা স্নান বাংলার দুর্গাপূজার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। নয়টি উদ্ভিদকে একত্র করে নবপত্রিকা তৈরি করা হয়। এর সঙ্গে কলাগাছ যুক্ত থাকায় সাধারণভাবে এটি ‘কলাবউ’ নামেও পরিচিত।

নবপত্রিকা কী?

প্রচলিত রীতিতে নবপত্রিকার উপাদান হিসেবে কলাগাছ, কচুগাছ, হলুদগাছ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু ও ধানগাছ ব্যবহৃত হয়। স্থানীয় নাম ও উদ্ভিদ শনাক্তকরণে কিছু পার্থক্য দেখা যেতে পারে। এসব উদ্ভিদকে দেবীশক্তির বিভিন্ন দিক, প্রকৃতির প্রাচুর্য এবং কৃষিনির্ভর জীবনের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।

নবপত্রিকাকে স্নান করিয়ে নতুন বস্ত্রে আবৃত করা হয় এবং পূজামণ্ডপে স্থাপন করা হয়। অনেক পূজায় কলাবউকে গণেশের পাশে রাখা হয়। তবে কলাবউকে গণেশের স্ত্রী হিসেবে দেখার জনপ্রিয় ধারণাটি সর্বজনীন শাস্ত্রীয় বিধান নয়; নবপত্রিকা মূলত একটি পৃথক ধর্মীয় প্রতীক।

সপ্তমীর পূজা ও অঞ্জলি

নবপত্রিকা স্থাপনের পর দেবী দুর্গার সপ্তমী পূজা অনুষ্ঠিত হয়। মন্ত্রপাঠ, উপাচার নিবেদন, ধূপ-দীপ, নৈবেদ্য এবং পুষ্পাঞ্জলি এই দিনের পূজার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভক্তরা ফুল হাতে মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে দেবীর কাছে প্রার্থনা করেন।

নবপত্রিকা পূজার মধ্য দিয়ে প্রকৃতি, উদ্ভিদ ও মানুষের জীবনযাত্রার পারস্পরিক সম্পর্কও স্মরণ করা যায়। কৃষিনির্ভর বাংলায় শস্য ও উদ্ভিদের এই প্রতীকী উপস্থিতি দুর্গোৎসবকে স্থানীয় জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করেছে।

মহাষ্টমী: পুষ্পাঞ্জলি, কুমারী পূজা ও সন্ধিপূজা

মহাষ্টমী দুর্গাপূজার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর একটি। এদিন দেবীর শক্তির আরাধনা বিশেষ গুরুত্ব পায়। সকালবেলার পূজা, পুষ্পাঞ্জলি এবং অনেক স্থানে কুমারী পূজা এই দিনের পরিচিত আচার।

মহাষ্টমীর পুষ্পাঞ্জলি

পুষ্পাঞ্জলিতে ভক্তরা পুরোহিতের নির্দেশে মন্ত্র উচ্চারণ করে দেবীর উদ্দেশে ফুল নিবেদন করেন। অনেকে উপবাস বা সংযম পালন করে অঞ্জলি দেন, যদিও উপবাস সবার জন্য বাধ্যতামূলক নয়। ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য, পারিবারিক রীতি ও স্থানীয় পূজাপদ্ধতি অনুযায়ী এ বিষয়ে পার্থক্য থাকে।

অঞ্জলির ধর্মীয় তাৎপর্য হলো নিজের প্রার্থনা, কৃতজ্ঞতা ও আত্মসমর্পণ দেবীর সামনে নিবেদন করা। বাহ্যিক আচার ছাড়াও ভক্তি ও মানসিক একাগ্রতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

কুমারী পূজা

কুমারী পূজায় একজন অল্পবয়সী মেয়েকে দেবীশক্তির প্রতীক হিসেবে সম্মান জানানো হয়। শাক্ত ঐতিহ্যের এই আচারে নারীর মধ্যে দেবীশক্তির উপস্থিতিকে শ্রদ্ধা করা হয়। অনেক স্থানে মহাষ্টমীতে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হলেও কিছু মন্দির বা পরিবার অন্য দিনও তা পালন করে।

কুমারী পূজার মাধ্যমে নারীত্ব, পবিত্রতা ও সৃষ্টিশক্তির প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করা হয়। তবে এর নির্দিষ্ট নিয়ম, বয়স নির্বাচন ও আনুষ্ঠানিকতা সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় পদ্ধতি অনুসারে পরিবর্তিত হয়।

সন্ধিপূজা: অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণ

অষ্টমী তিথির শেষ ২৪ মিনিট এবং নবমী তিথির প্রথম ২৪ মিনিট মিলিয়ে মোট ৪৮ মিনিটের সন্ধিক্ষণকে সন্ধিকাল বলা হয়। এই সময় অনুষ্ঠিত বিশেষ পূজাই সন্ধিপূজা। এর সঠিক সময় প্রতি বছর পঞ্জিকা অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।

দেবীমাহাত্ম্য-এর কাহিনিতে চণ্ড ও মুণ্ডকে বধ করার পর্বের সঙ্গে সন্ধিপূজার সম্পর্ক স্থাপন করা হয়। দেবীর চামুণ্ডা রূপের আরাধনার মাধ্যমে অশুভ শক্তির বিনাশ স্মরণ করা হয়।

প্রচলিত সন্ধিপূজায় ১০৮টি প্রদীপ জ্বালানো এবং ১০৮টি পদ্ম নিবেদনের রীতি রয়েছে। তবে সব পূজায় সব উপকরণ পাওয়া বা ব্যবহারের নিয়ম এক নয়। কিছু ঐতিহ্যে বলির রীতি রয়েছে, আবার অনেক স্থানে প্রতীকী নিবেদন বা নিরামিষ আচার অনুসরণ করা হয়।

মহানবমী: নবমী পূজা, চণ্ডীপাঠ ও হোম

মহানবমী হলো দুর্গাপূজার পূর্ণাঙ্গ আরাধনার শেষ প্রধান দিন। এই দিনে দেবী দুর্গার পূজা, নৈবেদ্য নিবেদন এবং অনেক স্থানে হোম বা যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়।

নবমী পূজা

পুরোহিত নির্ধারিত পূজাপদ্ধতি অনুসারে দেবীর উদ্দেশে মন্ত্র, ফুল, ধূপ, দীপ ও নৈবেদ্য নিবেদন করেন। চণ্ডীপাঠ বা দেবীমাহাত্ম্যের পাঠ অনেক পূজায় এই দিনেও চলতে থাকে। ভক্তরা দেবীর আশীর্বাদ কামনা করেন এবং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভের বিজয় স্মরণ করেন।

হোম বা যজ্ঞ

হোম হলো অগ্নিকে সাক্ষী রেখে মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে আহুতি নিবেদনের ধর্মীয় আচার। ঘি, সমিধ ও নির্দিষ্ট উপকরণ ব্যবহারের বিধান পূজাপদ্ধতি অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। হোমের মধ্য দিয়ে দেবীর প্রতি প্রার্থনা, কৃতজ্ঞতা ও মঙ্গলকামনা প্রকাশ করা হয়।

কিছু পূজায় নবমীর হোম বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ; আবার কোথাও নবমী ও দশমীর আচার তিথি এবং স্থানীয় নিয়ম অনুসারে বিন্যস্ত হয়। তাই সব মণ্ডপে একই সময়ে একই পদ্ধতিতে হোম হয় এমন ধারণা ঠিক নয়।

বিজয়া দশমী: দেবীবরণ, সিঁদুরখেলা ও বিসর্জন

দশমী দুর্গোৎসবের সমাপ্তি ও দেবীকে বিদায় জানানোর দিন। বাঙালি হিন্দু সমাজে এই দিন ধর্মীয় আবেগের পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে।

দশমীর পূজা ও দর্পণ বিসর্জন

দশমীর সকালে দেবীর পূজা ও প্রার্থনা করা হয়। অনেক পূজায় দর্পণ বিসর্জনের রীতি রয়েছে। প্রতিমার সামনে রাখা আয়নায় দেবীর প্রতিবিম্বের মাধ্যমে প্রতীকী বিসর্জনের আচার সম্পন্ন করা হয়। এরপর প্রতিমা বিসর্জনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়।

দেবীবরণ ও সিঁদুরখেলা

বাংলার বহু অঞ্চলে বিবাহিত নারীরা দেবীকে সিঁদুর, মিষ্টি ও অন্যান্য উপকরণ নিবেদন করে বরণ করেন। এরপর একে অপরকে সিঁদুর পরিয়ে দেওয়ার প্রথা ‘সিঁদুরখেলা’ নামে পরিচিত। এটি বাংলার জনপ্রিয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য; একে সব হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য বাধ্যতামূলক শাস্ত্রীয় বিধান হিসেবে দেখা উচিত নয়।

দেবীবরণের মধ্য দিয়ে দেবীকে কন্যা বা পরিবারের প্রিয়জনের মতো বিদায় জানানোর আবেগ প্রকাশ পায়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে আগামী বছর আবার দেবীর আগমনের প্রত্যাশা।

প্রতিমা বিসর্জন ও বিজয়ার শুভেচ্ছা

প্রতিমা শোভাযাত্রার মাধ্যমে নদী, পুকুর বা নির্দিষ্ট জলাশয়ে নিয়ে গিয়ে বিসর্জন দেওয়া হয়। বর্তমানে পরিবেশ রক্ষার কথা বিবেচনা করে অনেক জায়গায় নিয়ন্ত্রিত বা বিকল্প বিসর্জনব্যবস্থা অনুসরণ করা হয়।

বিসর্জনের পর আত্মীয়স্বজন, বন্ধু ও প্রতিবেশীদের মধ্যে বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময় করা হয়। প্রণাম, কোলাকুলি, মিষ্টিমুখ এবং বড়দের আশীর্বাদ নেওয়া এই সামাজিক পর্বের পরিচিত অংশ। এভাবেই দেবীকে বিদায় জানানোর মধ্য দিয়ে উৎসব শেষ হলেও মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্পর্কের বন্ধন আরও দৃঢ় হয়।

শাস্ত্র, বিশ্বাস ও বাংলার ঐতিহ্যের মিলন

মহালয়া থেকে দশমী পর্যন্ত দুর্গাপূজার আচারগুলোর দিকে তাকালে তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয়। প্রথমত, দেবীমাহাত্ম্য বা দুর্গাসপ্তশতী-এর মতো ধর্মীয় গ্রন্থ দেবী দুর্গার মাহাত্ম্য ও অসুরবিনাশের কাহিনির ভিত্তি তৈরি করেছে। দ্বিতীয়ত, বোধন, নবপত্রিকা, সন্ধিপূজা ও হোমের মতো আচার নির্দিষ্ট পূজাপদ্ধতির মাধ্যমে পালিত হয়। তৃতীয়ত, সিঁদুরখেলা, মহালয়ার বেতার অনুষ্ঠান এবং বিজয়ার সামাজিক রীতির মতো অনেক ঐতিহ্য বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে বিশেষভাবে বিকশিত হয়েছে।

তাই দুর্গাপূজার প্রতিটি রীতিকে একই ধরনের শাস্ত্রীয় বিধান হিসেবে ব্যাখ্যা করার পরিবর্তে তার ধর্মীয় উৎস, আঞ্চলিক প্রচলন এবং প্রতীকী অর্থ আলাদা করে বোঝা জরুরি। দেবী দুর্গার আরাধনার মূল বার্তা শক্তির জাগরণ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের মধ্যে মঙ্গলবোধের বিকাশ এই সব আচারকে এক সূত্রে বেঁধে রাখে।

মহালয়ার তর্পণ থেকে দশমীর বিসর্জন এই দীর্ঘ যাত্রা তাই শুধু একটি ধর্মীয় উৎসবের সময়সূচি নয়; এটি স্মৃতি, বিশ্বাস, প্রকৃতি, পরিবার এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক সম্মিলিত প্রকাশ।


আরও পড়ুন