অধিক তাসবিহ পাঠে মিলবে আল্লাহর সন্তুষ্টি
মুফতি ওমর বিন নাছির
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪০ এএম
ছবি: সংগৃহীত
মানুষের জীবনে নানা চিন্তা, দুশ্চিন্তা ও ব্যস্ততা লেগেই থাকে। সম্পদ, পরিবার, ভবিষ্যৎ কিংবা জীবনের অনিশ্চয়তা অনেক সময় মনকে অস্থির করে তোলে। এ অস্থিরতা দূর করে অন্তরে প্রশান্তি আনতে ইসলামে সহজ একটি আমলের কথা বলা হয়েছে। তা হলো, আল্লাহর জিকির ও তাসবিহ পাঠ।
তাসবিহ পাঠের জন্য বিশেষ কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই। ওজু বা নির্দিষ্ট স্থানের বাধ্যবাধকতাও নেই। কাজের ফাঁকে, চলার পথে কিংবা অবসর সময়ে যেকোনো অবস্থায় আল্লাহর স্মরণে জিহ্বাকে ব্যস্ত রাখা যায়।
তসবিহ অর্থ আল্লাহকে সব ধরনের ত্রুটি ও অপূর্ণতা থেকে পবিত্র ঘোষণা করা। ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি’, ‘সুবহানাল্লাহিল আজিম’—এ ধরনের ছোট বাক্য উচ্চারণ করা সহজ হলেও আল্লাহর কাছে এর মর্যাদা অনেক বেশি।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো এবং সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করো।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৪১–৪২)
এ আয়াতে মুমিনদের শুধু আল্লাহর জিকির করার নির্দেশই দেওয়া হয়নি, বরং ‘জিকরান কাছিরা’—অর্থাৎ অধিক পরিমাণে জিকির করার কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, একজন মুমিনের জীবনে আল্লাহর স্মরণ নিয়মিত থাকা প্রয়োজন।
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৫২)
একজন বান্দার জন্য এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে—সে তার রবকে স্মরণ করছে, আর মহান আল্লাহও তাকে স্মরণ করছেন! তাই প্রতিদিনের জীবনে আল্লাহর জিকির ও তাসবিহের অভ্যাস গড়ে তোলার গুরুত্ব অনেক।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দুটি বাক্য রয়েছে, যা জিহ্বায় উচ্চারণ করা অত্যন্ত সহজ, আমলের পাল্লায় অত্যন্ত ভারী এবং পরম দয়ালু আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়। সেই দুটি বাক্য হলো,
سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ، سُبْحَانَ اللَّهِ الْعَظِيمِ
উচ্চারণ : সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, সুবহানাল্লাহিল আজিম।
অর্থ : ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, সুবহানাল্লাহিল আজিম। ’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪০৬)
এই হাদিসে তাসবিহের তিনটি বিশেষ দিক তুলে ধরা হয়েছে। তা হলো, জিহ্বায় সহজ, আমলের পাল্লায় ভারী এবং আল্লাহর কাছে প্রিয়। অর্থাৎ অল্প সময় ও সামান্য চেষ্টায়ও এমন আমল করা সম্ভব, যার প্রতিদান অনেক বড়।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি দিনে একশবার ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি’ পাঠ করে, তার গুনাহসমূহ মুছে দেওয়া হয়—যদিও তা সমুদ্রের ফেনার মতো বিপুল হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪০৫)
তবে জিকিরের প্রকৃত সৌন্দর্য প্রকাশ পায় তখনই, যখন জিহ্বার সঙ্গে হৃদয়ও আল্লাহর স্মরণে যুক্ত থাকে। মুখে ‘সুবহানাল্লাহ’ উচ্চারণের পাশাপাশি অন্তরে এ বিশ্বাস রাখা প্রয়োজন যে, আল্লাহ সব ধরনের ত্রুটি ও অপূর্ণতা থেকে পবিত্র। তিনি সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ এবং মানুষের সব অবস্থার খবর রাখেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘জেনে রেখো, আল্লাহর জিকিরেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ২৮)
দিনের ব্যস্ততার মধ্যেও তাসবিহ পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলা যায়। হাঁটার সময়, যানবাহনে বসে, কাজের ফাঁকে কিংবা অবসর সময়ে আল্লাহর জিকির করা সম্ভব। এর জন্য আলাদা করে দীর্ঘ সময় বের করার প্রয়োজন হয় না। নিয়মিত জিকির মানুষকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং তাঁর প্রতি বিশ্বাস ও নির্ভরতা দৃঢ় করতে সহায়তা করে।
জীবনের নানা ব্যস্ততা ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও একজন মুমিনের জিহ্বা যেন আল্লাহর স্মরণ থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়। তাসবিহের প্রতিটি উচ্চারণের মধ্য দিয়ে মানুষ তার মহান রবের পবিত্রতা ও মহিমা স্মরণ করে।
আল্লাহ আমাদের জিহ্বাকে তাঁর জিকিরে সিক্ত রাখুন, অন্তরকে তাঁর স্মরণে প্রশান্ত করুন এবং আমাদের তসবিহ ও সব নেক আমল কবুল করুন। আমিন।


